ভ্রমণ: পর্ব ১

মেঘ-পাহাড়ের সাজেক ভ্যালি

প্রকাশ | ৩১ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০

অপর্ণা খান

আমরা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সাজেক ভ্যালি ঘুরতে গিয়েছিলাম। টিমে ছিল ৯ জন। প্রায় সবাই রমনা পার্কের হাঁটার বন্ধু। হেনা ও তার বর, পারু, নীরু, রীনা, পারুল, আমি এবং আরো দুজন। আমাদের যাওয়া যেদিন, সেদিনই সারা দেশে বুলবুলের সতর্কতা। খুব দোটানায় পড়ে গিয়েছিলাম। আমাদের ছিল প্যাকেজ ট্যুর। ওদের ফোন করলাম, বলল অসুবিধা হবে না, ওদিকে খুব একটা আঘাত করবে না। যাহোক, শেষ পর্যন্ত যাব সিদ্ধান্ত নিলাম। ছেলের যাওয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষা থাকায় যেতে পারল না। আমাদের আরো এক বন্ধু নীলু আপা ব্যাক পেইন বেড়ে যাওয়ায় ভ্রমণ স্থগিত করল। সব মিলিয়ে মনটা খারাপ ছিল।

সাজেক রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি ইউনিয়নে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট ওপরে এই জায়গা পর্যটকদের বেশ আকর্ষণীয়। আর আমার তো পাহাড় ডাকলেই ছুটে যেতে ইচ্ছা করে। রাঙামাটির সর্ব উত্তরে মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত সাজেকের অপূর্ব সৌন্দর্য চোখে না দেখলে যেন চলছিল না। তাই বুলবুল ময়না টিয়া উপেক্ষা করে সাজেকের পথে রাত ১১টার দিকে আরামবাগ থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজের গাড়িতে রওনা দিলাম। সহযাত্রীরা বুলবুল নিয়ে চিন্তিত। তখনো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল।

আমার বাসায় যে মেয়েটি কাজ করে, ওর বাড়ি খাগড়াছড়ি। খুব বলে, খালাম্মা একবার সাজেক যান, এত সুন্দর। সব মিলিয়ে অনেক দিনের প্রেম সাজেক ভ্যালির সঙ্গে। এসব কিছু ভেবে মনে মনে একটা ছবি এঁকে নিচ্ছিলাম, যেটা প্রতিবার ভ্রমণের সময় করি। আমাদের গাড়ি তখন চলতে শুরু করছে। আর শুরু হয়েছে আমাদের হাহা হিহি।

গাড়িতে বেশ জমে উঠেছিল আড্ডা। অনেক রাত, ঠিক কটা মনে নেই, জান্নাত নামে একটা রেস্টুরেন্টে থামাল গাড়িটা। আমরা নেমে শুধু চা খেলাম। আবার শুরু হলো পথচলা। তখনো ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছিল। খুব ভোরে ৫টা বা ৬টার দিকে পৌঁছে গেলাম চেংরি ব্রিজ। ওখানেই নামলাম। ভাবছিলাম নামার সময় বৃষ্টি হলে বিপদ, কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন, বৃষ্টি নেই তবে আকাশ মেঘলা। পর্যটনের বেশ সুন্দর একটা মোটেল। একটু উঁচুতে বাঁধানো রাস্তা ধরে ওপরে উঠতেই চোখে পড়ল লেকের মতো। কী সুন্দর শান বাঁধানো ঘাট। হুম কিছু ফটোসেশন না করে পারা গেল না। রাস্তার দুধারে সুবিস্তৃত ফুলের গাছ। নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। সাজসকালে মন মাতালো তারা।

আমরা হোটেলে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে ওখানে সকালের নাশতা করলাম। গাইড শাকিল বলল, ঠিক ৯টা ৩০ মিনিটে চান্দের গাড়ি আসবে। আমরা ওই গাড়িতে রওনা দেব সাজেকের উদ্দেশে। নাশতা সেরে একটু হাঁটতে বের হলাম। আমি হেনা আপা ও তার বর চেংরি ব্রিজ পর্যন্ত হেঁটে কিছু ছবি তুললাম। ফিরে এসে দেখলাম, গাড়ি রেডি। বেশ উঁচু গাড়ি। ঝটপট উঠে পড়লাম। এমন গাড়িতে জীবনে এই প্রথম। নতুন অভিজ্ঞতা। ভালোই লাগছিল। সিটগুলো ভালো হলে আর একটু ভালো লাগত। পাহাড়ি রাস্তা বেশ আঁকাবাঁকা, তবে ভাঙাচোরা নয়। কখনো ওপরে উঠে যাচ্ছে কখনো নিচে। ওখানে বিজিবির ক্যাম্প রয়েছে। বিজিবি সদস্যরা একসঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে গাড়িগুলো ঢোকার পারমিশন দেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

বেলা ১১টার দিকে বিজিবি চেকপোস্টে পৌঁছলাম। ওখানে পারমিশনের ব্যাপার আছে। ছোট্ট একটা বাজার। আমি নেমে আখ খেলাম। সেই ছোটবেলায় আখ খেতাম, তারপর ভুলেই গেছি। ভালো লাগছিল, বেশ মিষ্টি। আমরা ডাব, কলা ইত্যাদি খেয়ে আবার রওনা হলাম। আশপাশে অনেক চান্দের গাড়ি। বোঝা যায়, সবাই ভ্রমণবিলাসী। দূর-দূরান্ত থেকে আসা এত মানুষ দেখে একদিকে যেমন ভাবছিলামÑ এত মানুষ আজকাল, বেশ ঘোরে, ভেরি গুড সাইড। আবার ভাবলাম, ধুর, যে কোলাহল থেকে পালাতে চাইছিলাম, তা আর হলো না। দুপাশের সবুজ বনভূমি দেখতে দেখতে এগোচ্ছিলাম। কখনো কখনো চোখে পড়ছিল দুই ধারে নানা রকম সবজি ফলমূলের বাজার। ওখানকার সবকিছুই আলাদা রকম সুস্বাদু। প্রথমত. মাটি, দ্বিতীয়ত. ফরমালিনমুক্ত। আমরা গাড়ির গতি একটু শ্লথ হলেই কিছু একটা কিনে মুখে দিচ্ছি। যতটা পারি ফরমালিনমুক্ত বাতাস ফল খেয়ে নেই। নীরু আপা পেঁপে খাওয়ার জন্য পাগল। পাকা পেঁপে পিস করে কেটে প্লেটে সাজিয়ে বিক্রি করছিল। কিন্তু পেঁপে খাওয়া হলো না। গাড়ির মধ্যেই আমাদের সুরে-বেসুরে সংগীতচর্চা শুরু হলো। পেছনে বসা একটা ুড়ঁহম পড়ঁঢ়ষব সেদিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না। তারা তখন মশগুল মহা-রোমান্সে। অনেকটা ইচ্ছা করেই কিছুটা সুবিধা পাওয়ার আশায় তারা পেছনে বসেছে।

আমাদের ড্রাইভার বেচারা বেরসিক, ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল, মনে হয়েছে সত্যি আমাদের চান্দে নিয়ে যাবে। মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো বাচ্চাদের চোখে পড়ছিল। গাড়ি দেখে হাত নাড়ছিল। পরে শুনলাম, চকোলেট পাওয়ার আশায় ওরা এমন দাঁড়িয়ে থাকে। পাহাড়ের উঁচু-নিচু রাস্তা ধরে চলতে চলতে শিলং এবং সিকিম ভ্রমণের কথা মনে পড়ছিল। চোখে পড়ল ছোট্ট নদী। নাম মাইনি। দেখলাম, দুদিকে দুটো শাখা চলে গেছে। ভারি সুন্দর এবং এ নদীর মাছ খুব সুস্বাদু।

সাজেক যখন পৌঁছলাম তখন বেলা দেড়টা। সাম্পারি বলে একটা হিল টপ রিসোর্টে আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। আমার জন্য ছিল একা একটা কটেজ। কষ্টের জার্নি করে যখন কটেজের ভেতরে ঢুকলাম, মন ভরে গেল। কটেজ লাগোয়া একটা ঝুলন্ত বারান্দা। কাঠের মেঝ। বাঁশের তৈরি ছোট্ট কটেজ আমাকে মুগ্ধ করল। চারদিকে জঙ্গল। বারান্দায় বের হলেই দূরে পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি। আহা, এমন একটা কটেজে থাকার ইচ্ছা বহু কালের। আমি মুগ্ধ কৃতজ্ঞচিত্তে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালাম।

 

"