পৃথিবী অবলোকনের জানালা

প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০

রনি রেজা

বাংলা একাডেমি কি প্রাতিষ্ঠানিক একটি নামমাত্র? না। এই নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দেশের ইতিহাস অতীতের অযুত নর-নারীর যৌথ কণ্ঠস্বররূপে দুদ্দাড় আমার কানে আছড়ে পড়ে। এই প্রতিষ্ঠান পৃথিবী অবলোকনের জানালা। ১৯৮৬ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ভাষণে কথাটি বলেছিলেন কথাশিল্পী শওকত ওসমান। যেকোনো দেশ, জাতি, সমাজ কিংবা সম্প্রদায়ের বৈশ্বিক যোগাযোগ ও জানা-জানানোর অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ধরা হয় ভাষাকে। আর বাংলা একাডেমির যাত্রাও শুরু হয়েছে দেশের ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, গবেষণা ও প্রচারের লক্ষ্যে। স্বভাবতই প্রতিষ্ঠানটিকে পৃথিবী অবলোকনের জানালা বলা যায়। শুধু বাংলাদেশে নয়, ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধন ও প্রসারের জন্য প্রায় সব দেশেই সাহিত্য একাডেমি রয়েছে।

ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়, বিশ্বের প্রথম একাডেমি স্থাপিত হয় ১৬৩৫ সালে ফরাসিতে। নাম দেওয়া হয় ফরাসি একাডেমি। মূলত একদল প্রথিতযশা ফরাসি লেখকের আড্ডা থেকে একাডেমি করার ধারণাটি জন্ম নেয়। ১৬২০ সাল থেকে শুরু হওয়া লেখকদের আড্ডাই ১৫ বছর পর ১৬৩৫ সালে এসে একাডেমি সৃষ্টি করে। এরপর এই একাডেমির আদলে সুইডেনের রাজা গুসতাফ তৃতীয় ১৭৮৬ সালে সুইডিশ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। একাডেমির বহমাত্রিক কাজ প্রচলন করে সুইডিশ একাডেমি। যার উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর অন্যতম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান। এরপর ১৯৫৪ সালে দিল্লিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় সাহিত্য একাডেমি। যার প্রথম সভাপতি ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী প-িত জওহরলাল নেহরু। এটাও অনেকটা ফরাসি একাডেমির আদলেই করা হয়। ক্রমে একাডেমি প্রতিষ্ঠার এই চিন্তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। নানা দেশে স্থাপন হতে থাকে সাহিত্য একাডেমি। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৫৫ সালে আমাদের দেশেও প্রতিষ্ঠা পায় ‘বাংলা একাডেমি’। এটার পেছনেও ফরাসি একাডেমির ভূমিকা রয়েছে ব্যাপক। ধারণা করা হয়, বাংলা একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ফরাসি দেশে সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন ফরাসি একাডেমি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা লাভ করেছিলেন। তখন থেকেই তিনি আমাদের দেশে এ রকম একটি একাডেমির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। যার প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৯৪৮ সালে। সে বছর ৩১ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সর্বপ্রথম ভাষা সংক্রান্ত একটি একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন। তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে ১৯৫২ সালের ২৯ এপ্রিল দৈনিক আজাদ পত্রিকা বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সেসময় বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠায় জনমত গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে পত্রিকাটি। এ ছাড়া ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একাডেমি গঠনের পক্ষে জোরালো একটা ক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়। শুরু থেকেই নানা সীমাবদ্ধতা নিয়েই বহুমাত্রিক কাজ শুরু করে। যার ফলে আজ পর্যন্ত একাডেমির অর্জন, তাৎপর্য ও ভূমিকা ব্যাপকভাবে সমাদৃত। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় সাড়ে ছয় দশকের বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রায় বৈচিত্র্যপূর্ণ কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অভিধান প্রণয়ন, গ্রন্থ প্রকাশ, পত্রিকা প্রকাশ, সভা সেমিনার, সম্মেলন, সাহিত্য পুরস্কার প্রদান এবং বইমেলা আয়োজনসহ আজ বাংলা একাডেমির কাজের পরিধি ব্যাপক।

বাংলা একাডেমিক ব্যাপক-বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনায় অন্যতম সংযোজন ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ প্রচলন। ১৯৬০ সাল থেকে শুরু করে যা আজও চলমান। ১৯৬০ সালের ২৬ জুলাই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর দি বেঙ্গলি একাডেমি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডিন্যান্স জারি করেন। এর মাধ্যমে একাডেমির কার্যক্রমে কিছু পরিবর্তন আসে। তাদের কার্যাবলি সংশোধিত হয়ে সাহিত্য পুরস্কার প্রদান এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তন এবং ফেলো, জীবন সদস্য ও সদস্যপদ প্রদান যোগ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬০ সাল থেকে বাংলা একাডেমি বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য পুরস্কার প্রদান করে আসছে। এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তনের ৬০ বছর অর্থাৎ হীরকজয়ন্তী বর্ষে পদার্পণ করেছে। এ পর্যন্ত ৩০৭ জন লেখক এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ক্রমেই এর পরিসর বাড়ছে। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন শাখায় বছরে ৯ জনকে এ পুরস্কার প্রদান করা হতো। ১৯৮৬ সাল থেকে বছরে ২ জনকে এ পুরস্কার প্রদানের নিয়ম করা হয়। ২০০৯ সাল থেকে চারটি শাখায় পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। ১৯৮৫, ১৯৯৭ এবং ২০০০ সালÑ এ তিনবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হয়নি।

২০১৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ১০ গুণীর নাম প্রকাশ করেছে। এ বছর পুরস্কারের মূল্যমানও বেড়েছে। শুরুতে প্রতিটি বিভাগে পুরস্কারের মূল্যমান ১ লাখ টাকা দেওয়া হতো। এ বছর থেকে তা ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি আরো কয়েকটি পুরস্কার দিয়ে থাকেÑ বাংলা একাডেমি চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার, সরদার জয়েন উদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার, জসীম উদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার, পলান সরকার স্মৃতি পুরস্কার, মযহারুল ইসলাম স্মৃতি পুরস্কার, সাদত হাসান মান্টো পুরস্কার ইত্যাদি। তবে বাংলা একাডেমি পুরস্কারকে বাংলা ভাষার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৯ সালে কবিতায় মাকিদ হায়দার, কথাসাহিত্যে ওয়াসি আহমেদ, প্রবন্ধ/গবেষণায় স্বরোচিষ সরকার, অনুবাদে খায়রুল আলম সবুজ, নাটকে রতন সিদ্দিকী, শিশুসাহিত্যে রহীম শাহ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞানে নাদিরা মজুমদার, আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা/ভ্রমণে ফারুক মঈনউদ্দীন এবং ফোকলোরে সাইমন জাকারিয়াকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি ও লেখকদের হাতে তিন লাখ টাকা, সনদপত্র ও স্মারক তুলে দেবেন।

পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী বলেছেন, ‘নির্ধারিত কোনো গ্রন্থের জন্য নয়, বরং লেখকের সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম বিবেচনা করে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। কোনো লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যার বিপুলতা এ পুরস্কারকে প্রভাবিত করে না। রচনাকর্মের স্বাতন্ত্র এবং অভিনবত্বের কারণে কম বয়সের কোনো লেখকও অনায়াসে এ পুরস্কার পেতে পারেন। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যথাসম্ভব স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়।’

মহাপরিচালকের এমন স্বচ্ছ বক্তব্যের পরও কেউ কেউ সমালোচনা করেছেন পুরস্কার প্রক্রিয়ার। পুরস্কারপ্রাপ্তদের নিয়েও বির্তক থাকে প্রতিবছরই। এ বছরও ব্যতিক্রম ঘটেনি। পুরস্কার নিয়ে সমালোচনা নতুন কিছু নয়। বিশে^র সেরা পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয় যে নোবেল পুরস্কারকে তা নিয়েও অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ আছে। সমালোচনা আছে। সমালোচনা যদি হয় গঠনমূলক এবং তাতে যদি ভালোর নির্দেশ থাকে তবে কোনো সমস্যা নেই। বরং এমন সমালোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ সমালোচনা হয় শুধুই সমালোচনার জন্য। সেখানে না থাকে কোনো ভালোর দিকনির্দেশনা, না থাকে যৌক্তিক বিষয়ভিত্তিক আলোচনা। এখনকার সমালোচনার ধরন দেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি কথা খুব মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘পরশ্রীকাতর বাঙালি। অন্যের ভালো দেখলে সে কাতর হয়। প্রতি পদে তার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি। আমরা ভালো কাজের স্বীকৃতি দিই না, বরং ঈর্ষা করি।’ বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়ে যে ধরনের সমালোচনা হয় তাকে ঈর্ষাকাতরতা বলাই যায়। এত সব সমালোচনা, পরশ্রীকাতরতা পেরিয়ে পুরস্কারটি যে দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে, তাতে একাডেমি কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। এর ব্যাপ্তি আরো বাড়–ক, আরো সমৃদ্ধ হোকÑ এই কামনা।

 

"