ভ্রমণ

গিলোটিন

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০

হাফিজ উদ্দীন আহমদ

ঢেউ টিন, কেরোসিন টিন, কর আদায়ের টিন কত রকমের টিনই না আছে। কিন্তু এখন যা দেখলাম তা কোনো দিন ভুলব না।

সকাল সাড়ে ১০টায় লন্ডনের গ্রিনউইচ এলাকায় ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়ামে ঢুকে অসংখ্য জাহাজের মডেল, ফিগারহেড, সেকালের জাহাজের যন্ত্রপাতি ইত্যাদি দেখে দেখে এখন যেখানে এসেছি, সেখানে একটি উঁচু কাঠের ফ্রেম। মাঝখানে চকচক করছে ধারালো স্টিলের ভারী ব্লেড। পাশে ইংরেজিতে পরিচিতি লেখা : গিলোটিন ব্লেড। ফ্রেঞ্চ। অনুমান ১৭৯০।

শিরñেদ করার যন্ত্র! শিউরে উঠলাম। আল্লাহ জানেন কতজনের মাথা দেহ থেকে আলাদা করার পর এটা জাদুঘরে স্থান পেয়েছে।

দিনের আলোতে ঝকমক করছে ব্লেড। নীরব ভাষায় জানাচ্ছে তার গায়ে লাগা রক্তের ইতিহাস। নামটা ফরাসি। যিনি আবিষ্কার করেছিলেন তার নামেই নামকরণ হয়েছিল। ফরাসি চিকিৎসক ডা. জোসেফ ইগনেস গিলোটিন (১৭৩৮-১৮১৪) ও তারিখটা ছিল ১০ অক্টোবর ১৭৮৯। নকশা বানিয়েছিলেন অবশ্য আরেকজন চিকিৎসক ডা. এন্টোনি লুইস। ডা. জোসেফ মৃত্যুদ-াদেশপ্রাপ্ত আসামিদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এ যন্ত্র বানিয়েছিলেন। সেকালে তাদের শিরñেদ করা হতো ধারালো অস্ত্র দিয়ে ঘষে ঘষে পশু জবাইয়ের মতো অনেক কষ্ট দিয়ে। সে অমানুষিক যন্ত্রণা লাঘব করতেই তিনি এটা বানান। পরবর্তীতে ডিনামাইট বানিয়ে আলফ্রেড নোবেল যেমনি অনুতপ্ত হয়েছিলেন, তেমনি তিনিও এ জন্য সারা জীবন মনোকষ্ট পেয়েছেন। এমনকি তার নামে যন্ত্রটির নামকরণ হোক তাও চাননি।

এই যন্ত্রে ১৪ ফুট উঁচু বার’র ফ্রেম থাকে। বার দুটোর ভেতর দিক খাঁজ কাটা ও তৈলাক্ত করে পিচ্ছিল অবস্থায় রাখা থাকে। স্টিলের কুড়ালের ধারালো পাতের সঙ্গে ভারী ওজন যুক্ত করে ওপরে ঝুলিয়ে একটি কপিকলের মাধ্যমে লম্বা দড়ি দিয়ে আটকানো থাকে। আসামিকে ফ্রেমটির নিম্নাংশে একটি কাষ্ঠ খন্ডের ফোকরে গলা ঢুকিয়ে উপুড় করে শুইয়ে রাখা হয়। এমনকি গলা কাটার সুবিধার জন্য তার চুল ছেঁটে ছোট করে দেওয়া হয় প্রয়োজনে। তারপর যথাসময়ে দড়িটি ঢিলা করে দিলেই ধারালো পাতটি প্রচন্ড বেগে নেমে এসে মাথাকে দেহ থেকে আলাদা করে ফেলে।

পশ্চিম জার্মানিতে ১৯৪৯ সালে, পূর্ব জার্মানিতে ১৯৮৭ সালে এবং ফ্রান্সে ১৯৮১ সালে এই ভয়ংকর প্রথা রহিত করা হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নাজিরা সাধারণত এ পদ্ধতিতেই যুদ্ধবন্দিদের শাস্তি দিত। ১৭৯২ সালে প্রথম গিলোটিন ব্যবহার করা হয়। আমি যেটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি তার গায়ে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বড় বড় করে লিখে রেখেছে : এই গিলোটিন ব্যবহার করে ফরাসি বিপ্লবের সময় ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের গুডলুপ (এঁফবষড়ঁঢ়ব)-এর ৫০ জন রাজকীয় ব্যক্তির প্রাণদ- দেওয়া হয়। এ সময় এত বেশি শিরñেদ হয় গিলোটিন দিয়ে যে, তা জনপ্রিয় হয়ে উঠে বিপ্লবীদের কাছে। এর অসংখ্য খেলনা মডেল বাজারে বের হয়ও বাবারা তা কিনে বাচ্চাদের দিত। শিশুরা এটা দিয়ে পুতুল বা ইঁদুরের মাথা কেটে গিলোটিন গিলোটিন খেলত। এত বেশি মাথা কাটা হয়েছিল এ সময় যে, দু-একটা মাথা কোনো কোনো গবেষণাধর্মী চিকিৎসক সংগ্রহ করে তাতে রক্ত সঞ্চালন করে পরীক্ষা চালিয়ে দেখতেন তরতাজা কাটা কল্লাটা কথা বলতে পারে কি না। কী ভয়ানক! এই সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। রাজাদের অন্যায়, অত্যাচার, অপশাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল জনগণ এবং শেষ পর্যন্ত রাজতন্ত্রের অবসান হয়।

এই ৫০ জনের মধ্যে কারা ছিলেন তাদের নাম নেই। কে জানে রাজা ষোড়শ লুইস অগাস্ট (খড়ঁরং-অঁমঁংঃব) কি এই তালিকায় ছিলেন? তিনি ছিলেন ফ্রান্সের শেষ রাজা। আমার মনে চলচিত্রের মতো ভেসে উঠছে তখনকার দৃশ্য।

সেদিন ২১ জানুয়ারি ১৭৯৩।

আগের দিন দেশের জাতীয় পর্ষদ অর্থাৎ ন্যাশনাল কনভেনশন রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে রাজার বিচার করে প্রাণদ- দিয়েছে এবং পরদিনই তা কার্যকর হবে জানিয়েছে। অথচ তিনি ভূমিকর, শ্রমকর উঠিয়ে দিয়েছিলেন। সামরিক বাহিনী থেকে পালিয়ে গেলে আগে মৃত্যুদ- হতো, সেটাও রদ করেছিলেন। কিন্তু ভালো ফসল উৎপাদন না হওয়ায় খাবারের অভাব দেখা দিল। দেশের ৫০ শতাংশ লোক বেকার হয়ে পড়ল। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা ক্ষেপে গেল তার ওপর। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গের পতনের পর জনপ্রিয়তা আরো হারালেন। রানির বাড়ি ছিল অস্ট্রিয়া। রাজা বিদেশিনীকে বিয়ে করেছেন, এটাও ছিল তার বিরুদ্ধে রাগের একটি কারণ। তিনি ১৭৯১ সালের ২০-২১ জুন রাতে ভারেননেসে (ঠধৎবহহবং) রানি ম্যারি এন্টোনিটে ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ পালিয়ে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। ধরা পড়ার পর বিদেশি শক্তির সাহায্যে প্রতি বিপ্লব ঘটাবার চেষ্টা করেছিলেনÑ এ রকম অভিযোগ এনে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করল দেশের জাতীয় পর্ষদ। এ পর্ষদ ফরাসি বিপ্লবীরাই গঠন করে রাজাকে বাধ্য করেছিল তার অনুমোদন দিতে। এক প্রহসনের বিচারে মৃত্যুদ- দেওয়া হলো তাকে। আসলে একটি ভুল দেশে ভুল সময়ে রাজত্ব করছিলেন তিনি।

২০ জানুয়ারি রাতেই প্রাণপ্রিয় স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের কাজ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নিলেন রাজা। ভোর ৫টাতেই শয্যা ত্যাগ করে মনে মনে প্রস্তুতি নিলেন। তার সঙ্গে জেগে উঠল বিষণœ প্রকৃতি। কুয়াশা ঢাকা শীতল আদ্র সকাল। ধীরে ধীরে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে গেল। দেখতে দেখতে আটটা বাজল। ১২০০ অশ্বারোহী সেনা পরিবেষ্টিত হয়ে শকটে আরোহণ করলেন তিনি। তারই অনুরোধে যাজক হেনরি আসেক্স সঙ্গী হলেন তার। সঙ্গে আনা স্ত্রোত গ্রন্থটি রাজার হাতে দিয়ে তার করুণ ভাগ্যের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অংশ বের করে পড়তে দিলেন। ধীরে ধীরে পাঠ করলেন রাজা।

আগে থেকে তৈরি করে রাখা মঞ্চের দিকে এগিয়ে চলতে থাকল গাড়ি। রাজপথে সারিবদ্ধ শত সহস্র লাঠিসোটা বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রুদ্ধ জনতার মাঝ দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি এসে থামল একটি মাঠে। রাজা বললেন, মনে হচ্ছে আমরা নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছে গেছি। সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন যাজক।

একজন সেনা এসে দরজা খুলে দিল। আরো কয়েকজন এগিয়ে এলো তাকে নামিয়ে নিতে, কিন্তু তিনি তাদের সরিয়ে দিয়ে নিজেই নেমে এলেন। তার পোশাক খুলতে এগিয়ে এলো তিনজন সেনা। তাদের বাধা দিয়ে নিজেই খুললেন টাই, শার্ট ইত্যাদি। যাজকের হাত ধরে মঞ্চে উঠলেন তিনি ধীরস্থিরভাবে। জনতার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার সবগুলোতেই আমি নির্দোষ। আমার মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি, আজকে আপনারা যে রক্তপাত ঘটাবেন এ রকম রক্তপাত যেন ফ্রান্সে আর কখনো না ঘটে।’

তাকে আর কথা বলতে দেওয়া হলো না। তার হাত পিছমোড়া করে বাঁধতে চাইলে তিনি ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, ‘আমার হাত কখনোই তোমাদের বাঁধতে দেব না।’ কয়েকজন সৈনিক এসে তাকে উপুড় করে শুইয়ে গিলোটিনের কাঠের ফোকরে মাথা ঢুকিয়ে দিল। চারদিকে উৎকটভাবে বেজে উঠল ড্রাম। মুহূর্তে ওপর থেকে নেমে এলো ধারালো ইস্পাতের পাত। শরীর থেকে মাথা আলাদা হয়ে ছুটে বের হয়ে এলো। সৈনিকদের মাঝে সবচেয়ে তরুণ একজন, যার বয়স মাত্র ১৮, সে খ-িত মাথাটি দুই হাতে উঁচু করে মঞ্চের চারপাশে দৌড়াতে দৌড়াতে উপস্থিত জনতাকে দেখাতে লাগল। এক বীভৎস উৎসব শুরু হলো। জনতা কয়েক মিনিট ধরে গর্জন করে চলল : ভিভা রিপাবলিক। বেঁচে থাকুক প্রজাতন্ত্র। রাজতন্ত্রের অবসান হলো ফ্রান্সে। মাত্র ৩৮ বছর ৫ মাস বয়সে প্রাণ হারালেন রাজা। তিনিই একমাত্র হতভাগ্য ফ্রান্সের রাজা, যাকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। ১৬ অক্টোবর ১৭৯৩ সালে বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল বিচার করে রানি ম্যারিকেও গিলোটিনে মৃত্যুদ- দেয়, অথচ তিনি নম্র ভদ্র একজন ফ্যাশনেবল মহিলা বলে পরিচিত ছিলেন।

কবি, সাহিত্যিক ভিকটোর হুগো ফরাসি বিপ্লব নিয়ে লিখলেন তার অমর উপন্যাস ‘লা মিজারেবল’। গিলোটিন আজ ইতিহাসে পর্যবসিত হয়েছে, কিন্তু শিরñেদ প্রথা এখনো প্রচলিত আছে। সৌদি আরবে তা করা হয় তলোয়ারের কোপে। তাকিয়ে দেখলাম সামনে গিলোটিনের ধারালো পাত শুকনো খটখটে। আজ কোনো রক্ত নেই, কিন্তু আমার চোখের দুই কোণ কেন জানি অজান্তেই ভিজে উঠল।

 

"