কাজী ইমদাদুল হকের সাংবাদিকতা

পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে কাজী ইমদাদুল হক সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছিলেন। তিনি পেশায় ছিলেন শিক্ষক, নেশায় লেখক। নেশা আর পেশা দুটিকেই এক বিন্দুতে মিলিয়ে শুরু করেছিলেন সাংবাদিকতা

প্রকাশ | ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

সৌমিত্র দেব

কালজয়ী কথাশিল্পী কাজী ইমদাদুল হক লেখক হিসেবে যশস্বী হয়েছিলেন। শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন কর্মবীর। তবে তিনি যে একজন সাংবাদিক ছিলেন, যুক্ত ছিলেন সাময়িকী সম্পাদনা ও প্রকাশনার কাজে; সে বিষয়টি কিছুটা কম আলোচিত। এই লেখায় সেই বিষয়েই সামান্য আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তার জীবনীকার মোহাম্মদ আবদুল কাইউম বলেছেন, ‘কাজী ইমদাদুল হক মুসলমানদের মধ্যে প্রথম শিক্ষক ও শিক্ষাবিষয়ক পত্রিকা প্রকাশের গৌরব অর্জন করেন। শিক্ষক পত্রিকা সম্পাদনা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন, সমাজ ও সাহিত্যের সেবায় সংবাদপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম।’

বাংলা ১৩২৭ সালের বৈশাখ (ইংরেজি ১৯২০ সালের এপ্রিল) প্রথম প্রকাশিত হয় শিক্ষক পত্রিকাটি। মাসিক এই পত্রিকা চলেছে তিন বছর। সম্পাদক হিসেবে তিনি তাতে তার নিজের যেসব রচনা পত্রস্থ করেন তাতে রয়েছে শিক্ষা বিকিরণ বিষয়ে তার ঔৎসুক্য ও উদ্ভাবনার সুনিপুণ পরিচয়। পত্রিকাটি সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনার আগে জেনে নিই সাংবাদিকতা কী। সব সাময়িকীর সম্পাদককেই সাংবাদিক বলা যায় কি না। এমনিতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মানবীয় যোগাযোগকেই সাধারণত সাংবাদিকতা বলা হয়। অক্সফোর্ড অভিধানে বলা হয়েছে, একটি সরকারি সাময়িকী সম্পাদনা ও লেখার মাধ্যমে যিনি জীবিকা নির্বাহ করেন, তিনিই সাংবাদিক। আক্ষরিক অর্থে এ কথা মেনে নিলে কাজী ইমদাদুল হককে সাংবাদিক বলা যায় না। কারণ তিনি সরকারি সাময়িকী সম্পাদনা করেননি। অথবা সম্পাদনা বা লেখার মাধ্যমে তিনি জীবিকা নির্বাহও করতেন না। তবে ইংরেজি জার্নাল শব্দের মানে কোনো কিছু প্রকাশ করা। এর অর্থ দিনপঞ্জি। আর ইজম অর্থ অনুশীলন বা চর্চা। এ অর্থে জার্নালিজম বা সাংবাদিকতা বলতে বোঝায় দিনপঞ্জি অনুশীলন। সেক্ষেত্রে কাজী ইমদাদুল হককে হতে হয় স্বাধীন এবং স্বাধীনচেতা। সেই গুণটি তার ছিল। নিরপেক্ষতা সাংবাদিকতার আদর্শ। তিনি সেই গুণটিও রপ্ত করে নিতে পেরেছিলেন। সমাজই সংবাদ ক্ষেত্রকে সমর্থন জুগিয়ে থাকে। সেজন্য সমাজের প্রতি সংবাদপত্রের দায়িত্ব রয়েছে। পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে কাজী ইমদাদুল হক সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছিলেন। কাজী ইমদাদুল হক পেশায় ছিলেন শিক্ষক, নেশায় লেখক। নেশা আর পেশা দুটিকেই এক বিন্দুতে মিলিয়ে শুরু করেছিলেন সাংবাদিকতা। সে কারণে তার সাংবাদিকতা বুঝতে হলে শিক্ষা দর্শনকেও বুঝতে হবে।

কর্মজীবনে তিনি শুধু শিক্ষক ছিলেন না। শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কলেজের অধ্যাপক, স্কুল পরিদর্শক, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে সে সময়কার শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাবোধের আলোকে এবং নবীন প্রজন্মের প্রতি মমত্ব বোধের প্রভাবে তিনি শিক্ষাদান কার্যক্রমে বেশ কিছু অসংগতি ও ত্রুটি লক্ষ করেছিলেন। ১৯১৯ সালে ঢাকায় বোর্ড অব ইন্টারমিডিয়েট অ্যান্ড সেকেন্ডারি এডুকেশন স্থাপিত হলে কাজী ইমদাদুল হক এর প্রথম সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। সেসময় তিনি যে কটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তার মধ্যে দুটোর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তিনিসহ সে সময়কার শিক্ষাবিদদের একাংশ মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অন্য অংশ এর বিরোধিতা করেন। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল শিক্ষার মাধ্যম বাংলা হলে শিক্ষার মান ক্ষুণœ হবে। এই বিরোধিতার ফলে সব উদ্দেশ্য প- হয়ে যেতে পারে ভেবে তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বনের পরামর্শ দেন। প্রাথমিক অবস্থায় ইতিহাস, ভূগোল এই বিষয়গুলোর উত্তর বাংলায় লেখার ব্যাপারে শিক্ষার্থীকে পছন্দ করার অধিকার দেওয়ার কথা বলেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গৃহীত হয় এবং তার জ্যেষ্ঠপুত্র কাজী আনোয়ারুল হক ১৯২৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ইতিহাস বিষয়টির উত্তর বাংলায় লেখার সুযোগ পান।

তার বিশ্বাস ছিল ভাষা শিখতে হলে আনন্দঘন ও স্বচ্ছন্দ সাহিত্য পাঠের উপকরণ প্রয়োজন। সে কারণে মাধ্যমিক স্তরের বাংলা সাহিত্যের সংকলনে প্রকাশিত কবিতাগুলো তার কাছে ছাত্রদের জন্য সহায়ক মনে হয়নি। এর বদলে তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘কথা ও কাহিনী’ কাব্যগ্রন্থটি পাঠ্য করে নিয়েছিলেন। তার এই সৃজনশীল শিক্ষা দর্শনটিই ‘শিক্ষক’ পত্রিকা প্রকাশের পটভূমি রচনা করেছিল। শিক্ষক সাময়িকীর মধ্যে শিক্ষাবিষয়ক রচনার পাশাপাশি কিছু কিছু সংবাদও প্রকাশিত হতো। এর ঐতিহাসিক মূল্যও আছে। মুদ্রণ মাধ্যম বলতে আমরা সংবাদপত্র, বই-পুস্তক, লিফলেট প্রভৃতিকেই বুঝি। তবে সংবাদপত্রের সঙ্গে সমাজের যোগ খুবই নিবিড়। সংবাদপত্রের দর্পণেই প্রতিফলিত হয় সমাজচিত্র। একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দেশের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে গেলে ওই সময়ের সংবাদপত্রই আমাদের তুলে নিতে হয়।

সে আমলে সংবাদপত্র তো বটেই, মুসলমান সমাজে ভালো সাহিত্য পত্রিকারও অভাব ছিল। কাজী ইমদাদুল হক তার শিক্ষা দর্শন, সমাজচিন্তা এবং সাহিত্য সৃষ্টির জন্য অনেক দিন ধরেই একটা সাময়িকী প্রকাশের কথা ভাবছিলেন। তিনি জানতেন গণযোগাযোগের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা ও শিল্প সাহিত্যের গুরুত্ব অনেক। সে কারণে কয়েকজন তরুণ যখন ১৩১০ বাংলার বৈশাখ মাসে ‘নবনূর’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন, তখন কাজী ইমদাদুল হক তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসেন। এর প্রকাশক ছিলেন মোহাম্মদ আসাদ। তিনি পত্রিকাটির প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় কৃতজ্ঞতার সঙ্গে পত্রিকা প্রকাশে উৎসাহদাতা হিসেবে কাজী ইমদাদুল হকের নাম উল্লেখ করেন। নবনূরের সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ এমদাদ আলী। তিনি কাজী ইমদাদুল হক ও নবনূর প্রসঙ্গে বলেন, ‘নবনূর চারি বৎসর চলিয়াছিল। এই চারি বৎসর কাজী সাহেব নবনূরকে যে সাহায্য করিয়াছিলেন তাহার পরিমাণ করা যায় না। কেবল প্রবন্ধ দিয়া নহে, নবনূর যাহাতে বাংলার সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির মাসিকপত্রে পরিণত হইতে পারে, সব সম্ভাবিত উপায়ে তিনি তাহার জন্য চেষ্টা করিয়াছিলেন। নবনূরের নিয়মিত প্রচারের মূলে তাহার ব্যক্তিগত প্রভাব কম কাজ করে নাই।’

নবনূর প্রকাশে কাজী ইমদাদুল হকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুই রকম অবদানই ছিল। মূলত এমদাদ আলী নবনূর পত্রিকার সম্পাদক হলেও বেঙ্গল লাইব্রেরির তালিকায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বর্ষ ৮ম, ৯ম ও ১০ম সংখ্যার সম্পাদক হিসেবে ইমদাদুল হকের নাম রয়েছে। নবনূর পত্রিকার প্রথম ৩৩টি সংখ্যায় কাজী ইমদাদুল হকের ২৫টি রচনা প্রকাশিত হয়।

১৯১১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সমিতির উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছিলেন কাজী ইমদাদুল হক। সমিতির মুখপাত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা, ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ নামে। সেখানে কাজী ইমদাদুল হকের চারটি রচনা প্রকাশিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি প্রকাশ করেন ‘শিক্ষক’। শিক্ষাবিষয়ক এই মাসিক পত্রিকা তিন বছর প্রকাশিত হয়েছিল। ‘শিক্ষক’ এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৪০। দাম তিন টাকা।

 

"