অহনা

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ইভান অনিরুদ্ধ

এটা অহনাদের বাসা না? আমার এই প্রশ্নে মধ্যবয়সি মহিলা কিছুটা বিরক্ত হলেন। তার মুখ দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি কোন অহনার কথা বলছেন? ভদ্র মহিলার গলায় কিছুটা ঝাঁজ ঝরে পড়ল। আমি মিনমিন করে উত্তর দিলাম, ফর্সা মতন, বাঁ গালে তিল আছে। এইবার মহিলা একটা মুচকি হাসি দিলেন। আমি থতমত খেয়ে বললাম, আপনি কি চেনেন অহনাকে? ভদ্র মহিলা ঘাড় নেড়ে বললেন, না, আমি এই নামে কাউকে চিনি না। তবে আমার মেয়ের নামও অহনা। আমি ভদ্রতা করে বললাম, খুব সুন্দর নাম আপনার মেয়ের। তারপর একটু দম নিয়ে আবার বললাম, এই বাসায় অহনারা থাকত। এই কোনার ঘরটা ছিল অহনার। তা আপনারা কত দিন হলো আছেন এই বাসায়?

ভদ্র মহিলা এইবার তার হাতের ইশারায় আমাকে ঘরে যেতে বললেন। আমি ইতস্তত করছি দেখে তিনি আচমকা হাত টেনে ভেতরে নিয়ে গেলেন। খুব অবাক হলাম। প্রথম দেখায় কেউ কাউকে এভাবে হাত ধরে! জুতা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকলাম। ভদ্র মহিলা ফুল স্পিডে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বললেন, ১১ বছর হলো এই বাসায় আছি। আমি বুকের ভেতরে জমিয়ে রাখা কষ্টটা এমনভাবে ছাড়লাম, যাতে ফ্যানের বাতাসে তা ছড়িয়ে অহনার সেই কোনার ঘর অবধি যায়। ভদ্র মহিলা জল খাবার আনতে ভেতরে গেলেন। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল অহনার ঘরটা ঘুরে দেখতে। কিন্তু পরক্ষণেই ইচ্ছেটাকে মেরে ফেললাম।

ট্রে ভর্তি পাকা আম আর শরবত এনে মহিলা আমার সামনে রাখলেন। তিনি শরবতের গেলাসটা বাড়িয়ে বললেন, মনে হচ্ছে আপনাদের বিষয়টা অনেক বছর আগের, তাই না? আমি নীরবে মাথা নাড়লাম। ভদ্র মহিলা শাড়ির আঁচলে মুখটা মুছে ধীর গলায় আরেকবার বললেন, আসলে এত বছর কেউ কারো জন্য অপেক্ষা করে না। আমি এক টুকরা আম মুখে দিয়ে বললাম, আপনি ঠিকই বলেছেন। এত বছর কেউ অপেক্ষায় থাকে না, থাকা সম্ভবও নয়। নিজেকে একটা মিথ্যা প্রবোধ দেওয়ার জন্য মনে মনে বললাম, এত বছর কেউ থাকে নাকি? ভদ্র মহিলা পাশের সোফায় বসলেন। তিনি খুব আগ্রহ নিয়ে বারবার আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। খুব অস্বস্তি লাগছে। নিজেকে সহজ করার জন্য বললাম, বাসায় আর কে কে আছেন? তিনি মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, আমি, আমার একমাত্র মেয়ে আর বৃদ্ধা মা। আপনার হাজবেন্ড? আমি আরেক টুকরা আম হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি মাথা নিচু করে রইলেন। তারপর আমার দিকে চেয়ে বললেন, তিন বছর আগে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন। আর আমি এখানকার একটা প্রাইমারি স্কুলে টিচার হিসাবে আছি। আমি কী বলব বুঝতে পারছি না। তবু বললাম, সরি, আপনাকে এভাবে বিব্রত করার জন্য। এতটুকু বলে চুপচাপ বসে রইলাম।

এইবার তিনি কিছুটা সহজ হয়ে বললেন, আপনাকে একটা কথা বলি। কিছু মনে করবেন না। আপনার চেহারার সঙ্গে অহনার বাবার চেহারার দারুণ মিল। আর এটাই আপনার প্রতি আমাকে আগ্রহী করেছে। হাত ধরে সরাসরি ঘরের ভেতর এনে বসিয়েছি। আবার অন্যকিছু ভেবে বসবেন না যেন! তাৎক্ষণিক বললাম, অন্যকিছু ভাবতে যাব কেন? এই পৃথিবীতে কত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে! আমার সঙ্গে আপনার পরিচয়টাও এ রকম অদ্ভুত ঘটনা। কথা শেষ হতেই তিনি আমার কাছ থেকে খানিক সময় চেয়ে ভেতরের ঘরে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন, মাকে গোসলের পানি দিয়ে এলাম। আজ আমি স্কুলে যাইনি। মেয়ের শরীরটা ভালো না। এই গরমে-ঘামে কিছুটা কাশি হয়েছে। আমি তার কথায় বললাম, ডাক্তার দেখিয়েছেন? আর দু-একদিন দেখে তারপর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবোÑ তিনি আমার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন।

আপনার পরিচয়টা জানা হলো না এখনোÑ ভদ্র মহিলা মুচকি হেসে বললেন। আমার জড়তা পুরোপুরি কেটে গেছে। সহজ ভঙ্গিতে বললাম, আমি আবির। এই শহরেই আমার ছেলেবেলা, কলেজজীবন পার করেছি। বাবা পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন। মা-বাবা দুজনেই গত হয়েছেন। এক ছোট বোন ছিল, সেও গত বছর স্বামীর সংসারে অসুস্থতায় ভুগে মারা গেছে। বিয়েশাদি করিনি। একটা প্রাইভেট ব্যাংকের চাকরি নিয়ে স্মৃতির শহর নেত্রকোনায় ফিরে এলাম আবার। যদিও পুরাতন বন্ধুদের সঙ্গে আমার একেবারেই যোগাযোগ নেই। গত দুদিন হলো এখানে এসেছি। একটা রেস্ট হাউসে থেকে অফিস করছি। এই পর্যন্ত বলে থামলাম। দুপুর প্রায় গড়িয়ে যাচ্ছে, তবু কেন জানি এই ভদ্র মহিলার সামনে থেকে উঠে পড়ার তাড়া অনুভব করছি না। কেন জানি মনে হচ্ছে, ভদ্র মহিলার মনের অবস্থাও আমার মতো। আমি চুলায় ডাল বসিয়ে রেখেছিলামÑ এই বলে ভদ্র মহিলা এক দৌড়ে আবার ভেতরে চলে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, দুপুরের ভাত খেয়ে তারপর যাবেন। আপনার সঙ্গে যেহেতু একবার পরিচয় হয়েছে, তাই আশা করি আমাদের আরো যোগাযোগ থাকবে। আমার নাম রেবেকা। একজন বন্ধু ভাবতে পারেন। তার এই কথায় খুশি হলাম। হেসে বললাম, এ রকম উদার চিন্তার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

দুই

হাত-মুখ ধুয়ে রেবেকার বাসায় দুপুরের খাবার খাচ্ছি। টেবিলে তার মেয়ে অহনাও বসেছে। মেয়েটার চেহারা অবিকল মায়ের মতো, খুব মিষ্টি দেখতে। আমাকে প্রথম দেখাতেই খুব আপন করে নিয়েছে। সে বেশ কয়েক বার বলেছে, আংকেল, আংকেল, তুমি আমার মাছের কাঁটাগুলো বেছে দাও। আমি আর রেবেকা তার কথায় খুব মজা পেলাম। খাবার টেবিলে রেবেকা আমাকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, অহনার সঙ্গে আপনার একটা সম্পর্ক ছিল। সেটা কেমন ছিল? আমি এক গ্লাস পানি খেয়ে উত্তর দিলাম, পুরাতন প্রেম, মনে করে লাভ কী! তবু বলেন, খুব শুনতে ইচ্ছে করছে! রেবেকা এমন ভঙ্গিতে কথাটা বলল যে, আমি বলতে বাধ্য হলাম।

স্কুল থেকে অহনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। কলেজে উঠে সেই সম্পর্ক ভালোবাসায় পরিণত হয়। সে ছিল অন্য ধর্মের। যদিও তার ফ্যামিলিতে আমাকে অহনার ভালো বন্ধু আর সহপাঠী হিসেবেই জানত। কিন্তু আমরা গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তারপর এই প্রেম-ভালোবাসার কথা কলেজের ক্যাম্পাস থেকে ছড়িয়ে অহনার বাবা-মায়ের কানেও আসে। একটা মুসলমান ছেলের সঙ্গে হিন্দু মেয়ের ভালোবাসার কাহিনি এ রকম একটা গ্রাম্য মন-মানসিকতার মফস্বল শহরে কেউ ভালোভাবে নেয়নি। চারদিকে একটা ছি ছি পড়ে গেল। আমি অবশ্য যেকোনো মূল্যেই অহনাকে বিয়ে করতে রাজি ছিলাম। কিন্তু তার কাছে ধর্মের পরিচয়টা বড় হয়ে দেখা দিল। সে তার পরিবারের দিকে চেয়ে আমাকে প্রত্যাখ্যান করল। যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। কলেজে আসা ছেড়ে দিল। তারপর এক দিন শুনি অহনাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর কিছুদিন পর সেখানেই তার বিয়ে হয়। আমার কথায় রেবেকার ভাত খাওয়া বন্ধ হয়ে আছে, তা এতক্ষণ খেয়াল করিনি। সে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে ভাতের প্লেটে হাত ধুয়ে উঠে পড়েছে। এই অবস্থায় নিজেকে অপরাধী লাগছে। রেবেকা আমার পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর ধরা গলায় বলল, আপনিও ভুল মানুষকে ভালোবাসলেন, আমিও ভুল মানুষকে ভালোবাসলাম! যাকে ভালোবেসে ছিলাম তার সঙ্গে সংসার করতে পারলাম না।

দুপুর পার হয়ে বিকাল হয়ে গেছে। আমি রেবেকার কাছ থেকে বিদায় নিলাম চলে আসব বলে। নিজের কাছেই আজকের বিষয়টা খুব অবাক লাগছে। হারিয়ে যাওয়া অহনাকে খুঁজতে এসে ছয় বছরের এক মিষ্টি মেয়ে অহনার মায়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল। সেই রেবেকার ভেতরেও শূন্যতা, হাহাকার আর কিছু একটা না পাওয়ার অতৃপ্তি। জীবন কত অদ্ভুত তাই না! চলে আসবার সময় রেবেকা আমার হাত ধরে গাঢ় গলায় বলল, আবির, আমি তোমাকে আমার একাকিত্বের দুর্বিষহ জীবনযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে পাশে চাই। তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবে না তো?

আমি এক পলক রেবেকার চোখের দিকে চেয়ে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

"