হুমায়ূন আহমেদের চিঠি

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

সোহেল নওরোজ

গল্প, উপন্যাস, নাটক, চলচ্চিত্র, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, শিশুতোষ রচনা, ভ্রমণকাহিনি, মুক্তগদ্যÑহুমায়ূন আহমেদ হাত দেননি শিল্প-সাহিত্যের এমন শাখা পাওয়া দুষ্কর। যখন যা লিখেছেন, যা নির্মাণ করেছেন তা-ই পাঠক ও দর্শককে টেনেছে চুম্বকের মতো। তাঁর সাহিত্য মানেই আনন্দ-বেদনার এক অপূর্ব আখ্যান, জীবনকে দেখার আয়না। তিনি যেভাবে মানুষের জীবনকে দেখেছেন ও দেখিয়েছেন, তেমনি তাঁর জীবনকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন নানাভাবে। বিভিন্ন লেখায় হুমায়ূন আহমেদ নিজের জীবন আর অভিজ্ঞতার কথা বয়ান করেছেন। তেমনি তাঁর কিছু চিঠি আছে, যেগুলোতে মানুষ হুমায়ূনকে দেখতে পাওয়া যায় কখনো লেখক, কখনো পিতা, কখনো সুহৃদের ভূমিকায়। তাঁকে আরো খানিকটা জানতে এসব চিঠির শরণাপন্ন হতে হয়।

এমনিতেই কবি-সাহিত্যিকরা নানা উপলক্ষে চিঠি লিখে থাকেন। তাদের সেসব চিঠি কখনো সাহিত্যের মর্যাদা পায়, কখনো পায় না। মনের কথা অকপটে বলার জন্য চিঠির চেয়ে ভালো মাধ্যম নেই বলেই এর প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা কখনো ফুরোয় না। হুমায়ূন আহমেদ জীবদ্দশায় অনেক চিঠি লিখেছেন। সে চিঠিগুলোও তাঁর অন্যসব রচনার মতোই প্রাঞ্জল, রসবোধে ভরপুর। জীবনযাপনে খেয়ালি ছিলেন বলেই বোধহয় চিঠির বক্তব্য ও ভাষাতেও খেয়ালিভাব স্পষ্ট। তাঁর বড় মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। এটা ছিল মেয়ের বিয়েতে বাবার উপহার। কোনো লেখককে উপহার হিসেবে হাজির করা কেবল হুমায়ূন আহমেদের পক্ষেই সম্ভব। সুনীল ও তাঁর স্ত্রীকে তিনি লিখেছিলেন, ‘বিয়ের আসরে আমার মেয়ে আপনাদের দুজনকে দেখে খুশিতে ঝলমল করে উঠবেÑ এই দৃশ্য কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি। এবং আনন্দে আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে।’

১৯৮৪ সাল। হুমায়ূন আহমেদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক। কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক একটা বই পাঠিয়েছিলেন তাঁকে। বইটির প্রাপ্তিস্বীকারে তিনি উষ্মা প্রকাশ করে লিখেছিলেন, ‘লেখার জগৎ থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন কেন নিয়েছেন? আপনার অনুপস্থিতি খুব ফিল করি।... এত বড় মুক্তিযুদ্ধ গেল এবং সে যুদ্ধ আপনার মতো কথাশিল্পীকে স্পর্শ করল না, সেটা গ্রহণ করা যায় না।’ বলা বাহুল্য, মহান মুক্তিযুদ্ধ হুমায়ূন আহমেদকে ভালোভাবেই স্পর্শ করেছিল। তাঁর সৃষ্টির বড় একটা অংশজুড়ে রয়েছে একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ।

হুমায়ূন আহমেদ সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখেছেন শাওনকে। সে চিঠিও ছিল বিচিত্র। কখনো কাগজে, কখনো পাতায়, কখনোবা সিগারেটের প্যাকেটে মনের কথা ব্যক্ত করতে সংকোচ করেননি। বেশির ভাগ সময়ই চিরকুটে লিখতেন মনের কথা। শাওনের ভাষায়Ñ আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। সামনে এসএসসি পরীক্ষা। আমার মা হুমায়ূন আহমেদকে অনুরোধ করেছিলেন শুটিংয়ের ফাঁকে আমাকে পড়াশোনার সময় এবং একটু আলাদা জায়গা দেওয়ার জন্য। হুমায়ূন আলাদা একটা রুমে টেবিল-চেয়ার দিয়ে দিলেন আমার নিরিবিলিতে পড়াশোনার জন্য। শুটিংয়ের বিরতিতে সবাই হয়তো আড্ডা দিচ্ছে আর আমি এক মনে পাশের ঘরে বসে অঙ্ক করে যাচ্ছি। প্রায়ই আমার জন্য এক কাপ চা নিয়ে পড়াশোনার খবর নিতে আসতেন হুমায়ূন। কিংবা কখনো কখনো প্রডাকশনের কারো হাতে চা পাঠাতেন। পিরিচে থাকত একটা ছোট্ট চিরকুট।

শাওনের গান খুব পছন্দ করতেন হুমায়ূন আহমেদ। একটা চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘তুমি কি জান তোমার গান আমার কত পছন্দ? এবং তোমাকে আমার কত পছন্দ? তুমি জান না, জানলে কখনো আমার সঙ্গে এত খারাপ ব্যবহার করতে না।... আমাদের একটাই জীবন। আমরা এই অদ্ভুত পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরে আসব না। কেন এই সত্যটা ভুলে যাও?’ কপট অভিমানের সঙ্গে গভীর ভালোবাসা জড়িয়ে থাকত সেসব চিঠিতে, চিরকুটে। থাকত অধিকারের সুর। এক চিরকুটে লিখে পাঠালেন, ‘ইদানীং ইচ্ছা হয় তুমি শুধু আমাকেই গান শোনাবে। আর কেউ তোমার গান শুনতে পারবে না।’ সুযোগ বুঝে মজা করতেও ছাড়তেন না হুমায়ূন। কোন দিন কী ড্রেস পরে শুটিং স্পটে গেল; সে খেয়ালও থাকত তাঁর। এক দিন শাওনের হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলেন, তাতে লেখা, ‘তোমার এই সাদা আলখাল্লা আমার খুব অপছন্দ। তার পরও আমাকে রাগাবার জন্য আলখাল্লা পরে আসো কেন?’ রাগের সময়ও তার ভরসা ছিল চিরকুট। একবার তিনি রাগের বশে লিখেছিলেন, ‘শাওন, তুমি গু খাও।’

শাওনকে প্রণয় প্রস্তাব জানিয়েছিলেন যে চিঠির মাধ্যমে তাতে হুমায়ূন আহমেদের একঘেয়েমি ও একাকিত্ব ফুটে উঠেছিল। তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন এভাবে, ‘অভিনয় করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। ভালো লাগছে না। কী করি বলতো? আবার কবে দেখা হবে? আমার মনটাও খুব খারাপ। তুমি সব ভালো করে দাও।’ শাওন তাঁর ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারেননি। প্রণয়টাকে পরিণতিতে রূপ দিয়েছিলেন ২০০৩ সালে।

হুমায়ূন আহমেদ তাঁর জীবনের শেষ চিঠিটি লিখেছিলেন বন্ধু ও প্রিয়জনদের কাছে। তখন তাঁর ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে। কয়েক দিনের জন্য দেশে এসেছিলেন। মুক্তি পেতে যাচ্ছে তাঁর শেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’। তিনি লিখেছিলেন, ‘হে বন্ধু হে প্রিয়, ডাক্তারের কঠিন নিষেধÑ বেশি মানুষের ভিড়ে যাওয়া যাবে না। তার পরও সবাইকে নিয়ে ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ দেখার লোভ সামলাতে পারছি না। ছবি দেখে সরাসরি আমাকে গালাগালি করার সুযোগ হেলায় হারাবেন না। আসুন আমার সঙ্গে ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ দেখুন।’ উল্লেখ্য, এ চিঠিটি ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ ছবি দেখার আমন্ত্রণপত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

"