জীবনানন্দের আলো-আঁধার

প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

বীরেন মুখার্জী

ইতিহাসচেতনা বা কালচেতনা জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৪) কবিতাকে করেছে ঐশ্বর্যমি ত। তার কবিতার প্রতিটি শব্দে কালচেতনার বহুমাত্রিক অভিঘাত সুস্পষ্ট। অন্ধকারের প্রতি দুর্মর আকর্ষণ অনুভব করায় তিনি ‘অন্ধকারের যোনির ভেতরে সৃষ্টির অপার সম্ভাবনাকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন’ আর প্রকৃতি ও চেতনার অন্তর্গত বিষাদ খুঁড়ে সংগ্রহ করেছিলেন কবিতার মণি-মুক্তো, কৈবল্যের উড়ন্ত পত্রালি। কবিতার চঞ্চলা হরিণী ধরা দিয়েছিল কবির কাছে কোনো এক পৌষ-সন্ধ্যায়; তিনি বুঝেছিলেন ‘সে যেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়।’ বলা অসংগত নয় যে, বাংলা ভাষার অলৌকিক-অপার্থিব শব্দসম্ভার, নির্জনতম শব্দেরাÑ ব্যক্তিগত জীবনে চূড়ান্ত অসুখী, সমালোচকদের আক্রমণে ধ্বস্ত এই কবিকে মাধ্যম করেই পেয়েছিল নিজস্ব বিস্তার! কিন্তু কোথা থেকে জীবনানন্দ পেয়েছিলেন এই শব্দ সংকেত, অনন্ত শব্দস্নাত স্পর্শÑ সে এক যুগান্তকারী প্রশ্ন বটে। ‘জীবনানন্দ দাশ জীবন-মৃত্যু, প্রেম-অপ্রেম, শীত-হেমন্তের স্বাদেশিক ও বৈশ্বিক চেতনার কবি হয়েও একান্তভাবে মানবিক বোধের সুস্থ সমাজ ও তেমনি সুস্থ মানব-মানবীর সহযাত্রী’ হয়েছেন, তার পরও কবির বিপুল শব্দ-ঐশ্বর্যের ভেতর এক বিশাল রহস্যময়তা নিয়ে দুল্যমান ‘আলো-আঁধার’। জীবনানন্দের কবিতার ভুবনে ওতপ্রোত এই সম্ভ্রান্ত ‘আলো-আঁধার’ খুঁজতে গিয়ে ক্ষুদ্র এ নিবন্ধের অবতারণা।

জীবনানন্দ দাশের কবিতা পাঠে তাকে একজন সংশয়ী কবি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সংশয়ী মন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নশীল। আর প্রশ্নশীল কবিহৃদয়ে ফুটে ওঠে মানবমনের গুমরে ওঠা বেদনাবোধ, যে বেদনাবোধ আঁধার প্রত্যাশী। তবে এ আঁধার কোনোভাবেই দিনরাত্রির বিশেষ অবস্থান কিংবা আলোহীন পরিবেশ নয়। এ আঁধার প্রকৃত পক্ষে মানবমনের একটি নির্ভার অধিষ্ঠান। একজন প্রকৃত কবির কাছে এই ‘আঁধার’ কাক্সিক্ষত হলেও মর্মমূলে দীর্ঘ আলোকের প্রস্তাবনা জেগে থাকে। জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেনÑ ‘সিন্ধুর ঢেউয়ের তলে অন্ধকার রাতের মতন/হৃদয় উঠিতে আছে কোলাহলে কেঁপে বারবার!/কোথায় রয়েছে আলো জেনেছে তা, বুঝেছে তা মনÑ/চারিদিকে ঘিরে তারে রহিয়াছে যদিও আঁধার!’ [অনেক আকাশ/ধূসর পা ুলিপি]

জীবনানন্দ দাশ শুরু থেকেই ‘আসিতেছে’ ‘যাইতেছে’ ‘ছড়াতেছে’ ‘হাঁটিতেছি’ ‘লড়িয়াছে’ ‘উড়িতেছে’ ‘ডাকিতেছে’ ইত্যাদি ক্রিয়াপদ ব্যবহারের মাধ্যমে আধুনিকতার গায়ে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে মনোযোগী পাঠককে ভাবতে বাধ্য করেছেন। অনেক বোদ্ধা ক্রিয়াপদের এরূপ ব্যবহারকে নেতিবাচক অর্থে দেখেছেন, তবু তার কবিতার এই প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্য পৃথকত্বই দাবি করে। হতে পারে তিনি নতুন প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্য ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলা কবিতার প্রচলিত সংস্কার ভেঙে সচেতনভাবে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। তবে জীবনানন্দের নিজস্বতা এবং তার কাব্যের অন্তর্নিহিত সংগীতময়তা যে বৈচিত্র্য-বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে, তা একান্তভাবেই জীবনানন্দীয়। অনুরূপভাবে সত্য এই যে, তার কবিতা সার্বিকভাবে পাঠকের অস্তিত্বের অন্তর্তল এমনভাবে স্পর্শ করে, যেন তা হয়ে ওঠে মানব-অস্তিত্বেরই অনিবার্য পাঠ। শিবনারায়ণ রায় যেমন বলেন, ‘জীবনানন্দ খাঁটি কবি ছিলেন; তাকে আমি দু-একবার মাত্র দেখেছি; কিন্তু তার রচনা পড়ে আমার মনে হয়েছে যেন তিনি এক নক্ষত্রবিম্বিত জলাশয়, যেখানে গভীর অন্ধকারের স্তরে স্তরে নানা অনুভব ও ভাবনার ওঠাপড়া আছে।’ সত্যিকার অর্থে জীবনানন্দের এই অন্ধকারের স্তরে স্তরে সাজানো অনুভবের মধ্যেই কবিতার সুনিবিড় আড়াল লুক্কায়িত, যাকে তিনি ‘রাহসিকতা’ আখ্যা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তার ‘বোধ’ কবিতাটির পাঠ নেওয়া যেতে পারে। ‘আলো-অন্ধকারে যাইÑ মাথার ভিতরে/স্বপ্ন নয়, কোনো এক বোধ কাজ করে।’

কবিতাটির প্রবেশকেই তিনি ‘আলো-অন্ধকার’ পরিভ্রমণের কথা বলেছেন। আলো ও অন্ধকারকে যুগপৎ সৃষ্টি ও ধ্বংসের পরস্পরবিরোধী দুটি প্রতীক হিসেবে ধরে নিয়েও বলা যায়, জীবনানন্দের ‘আলো-আঁধার’ রহস্যময় মানবজীবনের দুর্লঙ্ঘ এক প্রতীকী রূপায়ণ। আবার একই কবিতায় দ্বিতীয় পর্বে এসে তিনি বলেছেনÑ ‘সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।/কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে।’

অর্থাৎ, আলো এবং আঁধারÑ বিপরীত বৈশিষ্ট্যের এ দুটি প্রপঞ্চের মিলিত রূপ হিসেবে তিনি জীবনকে অবলোকন করেছেন ‘ধূসর জীবন’ হিসেবে। জীবনানন্দ সৃষ্ট এই জীবন কি আলো-কালোর অবিমিশ্র রূপ? সচেতন পাঠকের এমন প্রশ্ন সংগত কারণে অবান্তর মনে হয় না। তবে জীবনানন্দের জীবনী পাঠে এটা স্পষ্ট হয় যে, প্রাগ্রসর অভিজ্ঞানের পথে কবির যাত্রা ছিল নিরন্তর। অস্তিত্ববাদী জীবনের প্রশ্নে কবি রূঢ় বাস্তবতায় পর্যুদস্ত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু শুদ্ধ অনুভব উৎসারণে, পবিত্র চেতনা লালন এবং সত্য ও সৌন্দর্যের চর্চায় অবিশ্রান্ত আলো প্রজ্বালিত করেই তিনি জীবনের পাদটীকায় মিলিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কবির উপলব্ধি এবং বোধ যাপিতজীবনের গভীরতম প্রদেশ থেকেই উৎসারিত। তিনি বলেছেনÑ ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,/যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;/যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই/পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।’

‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতার এই ‘আঁধার’ কবির কাছে ধরা দিয়েছে উদ্যতরূপে। তিনি উপলব্ধি করেছেন, ধাবমান সময়ের কাছে মানবকুলের অসহায়ত্ব। আবার অন্যত্র আলোর মাঝে আঁধারের উপস্থিতি কবি ব্যক্ত করেছেন এভাবেÑ ‘মৃত্যু আর মাছরাঙা ঝিলমিল পৃথিবীর বুকের ভিতরে/চারিদিকে রক্তঋণ গ্লানি ধ্বংস কীট নড়েচড়ে।/তবুও শিশির সূর্য নক্ষত্র নিবিড় ঘাস নদী নারী আছে; মৃত্যু আর মাছরাঙা আঁধারের প্রতীক।’ এভাবে আঁধার রূপকে তিনি অশুভের কথা বলেছেন। আবার এটাও হতে পারে, ‘আঁধার’কে জীবনের রুক্ষতা, রুগ্ণতা, শূন্যতা, অপ্রাপ্তি, বেদনা এবং দহনের সঙ্গে প্রতি তুলনা করেছেন। যে আঁধার হয়তোবা অনন্তকাল ধরে বয়ে চলেছে তার অনাস্বাদিত অনুভবে; তরঙ্গায়িত অপরূপ এক অনাদী অনন্ত চেতনাপ্রবাহে! যার সঙ্গে প্রতিদিনের জীবনের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক গড়ে না উঠলেও রয়ে গেছে অন্তর্লীন সুপ্ত বিষণœ এক আবেগের সতেজ অনুভূতি! তিনি বলেনÑ ‘অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থাকতে চেয়েছি’; ফলে বলাবাহুল্য নয় যে, কবির অবচেতন মনের সবটুকু বাসনা অভিব্যক্ত হয়েছে যাপিতজীবনের চরম বেদনার অনুষঙ্গে। আবার, ‘একটি নক্ষত্র আসে’ কবিতায় তিনি বলেনÑ ‘একটি নক্ষত্র আসে; তারপর একা পায়ে চলে/ঝাউয়ের কিনার ঘেঁষে হেমন্তের তারাভরা রাতে/সে আসবে মনে হয়;Ñ আমার দুয়ার অন্ধকারে/কখন খুলেছে তার সপ্রতিভ হাতে!’

কিংবা, ‘এই পৃথিবীতে আমি অবসর নিয়ে শুধু আসিয়াছি’ কবিতায়Ñ ‘এই পৃথিবীতে আমি অবসর নিয়ে শুধু আসিয়াছিÑ আমি হৃষ্ট কবি/আমি এক;Ñ ধুয়েছি আমার দেহ অন্ধকারে একা একা সমুদ্রের জলে।’

জীবনের অশেষ অপ্রেম ও গ্লানির ভেতর আবর্তিত হতে হতে আলোর ভেতরেও কবির মহাজিজ্ঞাসা জাগ্রত থাকে। জীবনকে নিরীক্ষণ করে প্রকৃতির আদিমতা এবং সবুজের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ অস্তিত্বের সন্ধান করেছেন; জীবনের ব্যাকরণ মেলাতে চেষ্টা করেছেন আলো-আঁধারের বিরোধাভাসে। স্বীকার করতে হয় যে, ‘মৃত্যুচিন্তা’ আধুনিক কবিতার অন্যতম এক বৈশিষ্ট্য। জীবনানন্দ দাশের এই মৃত্যুচিন্তা প্রগাঢ়। ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতায় তিনি ‘আমরা দেখেছি যারা অন্ধকারে আকন্দ ধুন্দুল’, ‘আমরা বেসেছি যারা; অন্ধকারে দীর্ঘ শীত রাত্রিটিরে ভালো’, ‘অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো’, ‘অঘ্রাণের অন্ধকারে’, ‘অন্ধকারে নদীদের কথা’Ñ এভাবে অন্ধকারের নানান রূপ বর্ণনা করেছেন। তবে সার্বিক অর্থে এই মৃত্যুচেতনা কবির জীবনচেতনারই একটি অংশ হিসেবে প্রতিভাত হয়। তিনি চেয়েছিলেনÑ ‘জীবনের চেয়ে সুস্থ মানুষের নিভৃত মরণ।’ অথবা, ‘সব ভালোবাসা যার বোঝা হলো দেখুক সে-মৃত্যু ভালোবেসে’। এই মৃত্যুচিন্তার সঙ্গে তার জীবনবাদী চেতনাও স্থিতধী হতে দেখা যায় পুনরুজ্জীবনবাদী চেতনায়। সনাতন ধর্মমিথ অনুযায়ী, জীবনানন্দ দাশও সর্বান্তঃকরণে পুনরুজ্জীবনবাদী চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন।

বিপন্নতা ও বিচ্ছিন্নতাকে অঙ্গীভূত করেই বাংলা কবিতায় জীবনানন্দের প্রতিষ্ঠা। তবে ‘সূচনালগ্নে যে-কবি ছিলেন বিচ্ছিন্নতা-পীড়িত, হতাশাদীর্ণ, আশারিক্ত, ভালোবাসা-শূন্য এবং মৃত্তিকা-বিচ্ছিন্ন; সে-কবিই পরিণতিতে হয়ে উঠলেন জীবনের জয়গানে মুখর, মানুষকে দেখতে পেলেন ইতিহাসের বিশাল প্রেক্ষাপটেÑ তাকে আশা-আনন্দ-সাহস ও ভরসা দিলেন বাংলার নারীগণÑ হয়ে উঠলেন তিনি অনিমেষ আলোর কবি।’ তবে আলো-পৃথিবীতে পৌঁছতে জীবনানন্দকে অন্তহীন প্রেরণা দিয়েছে সভ্যতার প্রবহমানতাবোধ ও ইতিহাসজ্ঞান। জীবনকে নতুন জিজ্ঞাসার আলোকে প্রতিস্থাপন করা সহজসাধ্য নয়। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ পেরেছেন। ইতিহাসের প্রবহমানতা খুঁজে তিনি পৌঁছে গেছেন মহাজীবনের স্রোতে। এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক-গবেষক বিশ্বজিৎ ঘোষের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্যÑ “তিনি প্রধানত তিনটি উৎসকে অঙ্গীভূত করে মনোজাগতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত হয়ে উপনীত হয়েছেন সদর্থক জীবনচেতনার আলোকিত পৃথিবীতে। বাংলার অবারিত প্রকৃতি, সদর্থক ইতিহাসজ্ঞান এবং শাশ^ত প্রেমভাবনা-ই মূলত জীবনানন্দকে শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে, আর এসব প্রপঞ্চ সঙ্গী করেই পাঠকদের তিনি পৌঁছে দিয়েছেন আলো-পৃথিবীর শাশ^ত কক্ষপথেÑ আর নিজে ‘নিরাশাকরোজ্জ্বল কবি’ থেকে হয়ে উঠেছেন ‘তিমিরবিনাশী কবি’।”

মৃত্যুর আগে জীবনানন্দের শেষ উক্তি ছিলÑ ‘ধূসর পা ুলিপির রং সারাটা আকাশজুড়ে।’ কবির এই অতলস্পর্শী অনুভব এবং কবিতায় প্রয়োগকৃত অনুভূতিমুখর ভাষা, উপমা, অনুপ্রাস, প্রতীকী ব্যঞ্জনা ও অনন্য সাধারণ অভিজ্ঞা পাঠকের চেতনাকে ক্রমশ টেনে নিয়ে যায় এক নিমগ্ন জগতে। ফলে জীবনানন্দের যাপিতজীবনের দুঃখ, বেদনা, বিষাদ আর বিরহ-ব্যথার অনুষঙ্গগুলোকে যদি আঁধারের প্রতিরূপ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে আজন্ম বিষণœতায় ডুবে থাকা কবির মানসলোকের চেতনা থেকে উৎসারিত সৌন্দর্যবোধ এবং মাননিক আহ্বানকে আলোর প্রতিরূপ হিসেবে বিবেচনা করাও অযৌক্তিক মনে হয় না।

"