শামসুর রাহমানকে একটি খোলা চিঠির ছাপচিত্র

প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

ফকির ইলিয়াস

প্রিয় রাহমান

আপনি লোকান্তরিত হওয়ার ১৩ বছর পেরিয়ে গেছে। আপনি জানতেন, মৃত্যু মানেই নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নয়। না, আপনার সংশয় ছিল না কোনো। আপনি জানতেন, আপনি পঠিত হবেন। কোথাও না কোথাও। কেউ না কেউ, সপ্তাহে-সপ্তাহান্তে পড়বে আপনার পঙ্ক্তি। আপনি উচ্চারিত হবেন! আপনি আন্দোলিত হবেন প্রজন্মের মননে।

আপনার বিশ্বাস ছিল। তার পরও আপনি জানতেন। আপনার জীবদ্দশায়ই কেউ কেউ আপনাকে খারিজ করে দিয়েছিল। বলেছিল, ওঁর কোনো কবিতা হয় না! ওঁ কি কবি!

শ্রদ্ধেয় কবি

আমি আপনার হাতে ছুঁঁয়ে হাডসন নদীর তীর দিয়ে হেঁটেছিলাম। দালাম হাওয়ায় উড়ছিল আপনার চুল। আপনি কবিতা পড়ছিলেন বেঞ্চে বসে। সেই কবিতায় আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম আবারও আমাদের চেতনা। আপনি পড়ছিলেনÑ

বৃষ্টিভেজা গোধূলিতে তোমার শোকমিছিলে/এসে মনে হলো, কেন আমরা/এমন বিহ্বল শোকে? কেন আমাদের চোখের পাতা/ভিজে উঠছে বারবার?/তুমি দুঃসহ যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়েও/মৃত্যুর নিষ্ঠুরতার কথা ভাবোনি,/নিস্তব্ধ কণ্ঠে জীবনের স্তব/রচনা করেছ তন্দ্রাচ্ছন্নতায়।/জীবন এবং মৃত্যুর বিবাদে তুমি বিপন্ন এই বদ্বীপে/ফুল ফোটানো আর/সুর জাগানোর উদ্যোগ নিয়েছ,/প্রাণের স্বদেশ/তোমার চৈতন্যের কুয়াশাময় প্রবাহে/দীপের মতো ভেসেছে সারাক্ষণ।

এই কবিতাটির শিরোনাম ‘শহীদ জননীকে নিবেদিত পঙ্ক্তিমালা’। আপনার কি সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে? একজন শহীদ জননী মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। দেশ থেকে দেশান্তরে। বলছেন, যারা একাত্তরে আমার সন্তান হত্যা করেছে, আমি তাদের বিচার চাই। যারা আমার কন্যাকে বেআব্রু করেছেÑ আমি তাদের বিচার চাই।

রাষ্ট্র তার আবেদন শোনেনি। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। তিনি ‘গণ-আদালত’ গঠন করেছিলেন। আপনি তার পাশে পাশে হেঁটেছিলেন। মিছিলে, জনসভায়, পথে, প্রান্তরে।

আপনি জেনে খুশি হবেন, সেই ঘাতক দালালদের বোচার বাংলার মাটিতে হয়েছে, হচ্ছে। শহীদ জননী দেখে যেতে পারেননি। আপনিও দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু ওই যে আপনি লিখেছিলেনÑ

তোমার দিগন্ত-কাঁপানো আন্দোলনের গাথা/বাঙ্ময় হয় প্রতিটি নদীর উৎসমুখে,/পাহাড়ি কুটিরের বিষণœতায়,/বিপন্ন মানুষের আর্তিতে।/তোমার নাম আমাদের হৃৎস্পন্দন,/আমাদের আক্রান্ত অতীতের/ইতিহাস, আমাদের আহত গৌরবের/সোনালি দুপুর,/আমাদের মৈত্রীর পূর্ণিমা-রাত।/যে মর্কটেরা তোমার নাম/কাদায় ফেলে কলুষিত করে,/ওরা এই বাংলার কেউ নয়।/বাংলার নিসর্গ ধিক্কারের ঝংকারে/ওদের অশ্লীলতাকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে,/ওদের কুৎসিত মুখে/চুনকালি মেখে দিচ্ছে প্রগতির নতুন ইতিহাস,/যার বুনিয়াদ নির্মিত তোমারই হাতে,/আমরাও হাত লাগিয়েছি সেই কাজে।/এই তিমিরাবৃত প্রহরে দেখতে পেলাম/তোমার উত্তোলিত হাতে/নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে ফেরারি বসন্ত/আর আমাদের ভবিষ্যৎ। (শেষাংশ/শহীদ জননীকে নিবেদিত পঙ্ক্তিমালা)

আচ্ছা, এর জন্যই কি ওদের এতো ক্ষোভ? যারা বলে, আপনি তলিয়ে গেছেন, হারিয়ে গেছেন, আপনাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! ইত্যাদি।

ওরা একটি সংঘবদ্ধ চক্র। আমরা ওদের চিনি। ওদের রোষানলের নেপথ্য কথা আমরা জানি। আপনি এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বিজয়, গণ-আন্দোলন, মানুষের অধিকারের সংগ্রাম, অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করেছেন মনেপ্রাণে। মাঠে নেমেছেন। ওরাই আপনাকে খুন করতে চেয়েছিল! আজ যারা নব্য খোলসে আপনার কবিত্বকে চ্যালেঞ্জ করে, ওরা তো নতুন নয়।

সুহৃদ স্বজন

আপনি চলে যাওয়ার পর এই পৃথিবীতে আজব একটি বস্তু ঝাঁকিয়ে বসেছে মানুষের ঘাড়ে ঘাড়ে। এর নাম ‘ফেসবুক’। এই সামাজিক মিডিয়াটি অনেককেই ‘কবি’ বানিয়েছে রাতারাতি। এরা দাপট দেখায় যত্রতত্র। এরা অমুককে ‘সাহিত্য মোড়ল’ বানায়। তমুককে ‘মাইনাস’ করে সাহিত্য থেকে। কী আজব এদের চরাচর!

অথচ এই কবিতাগুলো তো আপনারই লেখা। ওরা কি আপনার সবগুলো, না ভুল বললামÑ কয়েকটি উজ্জ্বল কবিতা পড়েছে? আমি ওদের আপনার এই কবিতাগুলো পড়তে বলিÑ

[ক]

তোমাকে বলি, যদি তুমি একটি সাদা পাতার ঠোঁটে/কলমের ওষ্ঠ স্থাপন করো, তাহলে/একটি দোয়েল, কতিপয় প্রজাপতি/শূন্য পাতাটিকে ঘিরে উড়ে বেড়াবে,/কিছু কনকচাঁপা/বাড়িয়ে দেবে হাত। ওদের সমবায়ী সহযোগিতায়/তোমার প্রয়াসে প্রস্ফূটিত হবে ভালোবাসার/হৃৎকমল, শুভেচ্ছার অপরূপ পরিভাষা।/আমি তোমার মৃদু হাসি অনুভব করি/আমার সত্তার তন্তুজালে। আমার উপলব্ধিতে/তরঙ্গ তুলে তোমার জন্মদিন/আমার জন্মদিনকে সোনালি বনহংসীর মতো/অনুসরণ করে মানস সরোবরে,/যেখানে আমাদের অবিনশ্বর মিলনোৎসব। (২৩ অক্টোবর, ১৯৯৪)

[খ]

কনকনে ঠান্ডা হাওয়া আর মুয়াজ্জিনের সুরেলা আজান/ছুঁঁয়ে যাচ্ছে সুবে সাদিকের ঘুমন্ত শহরকে/নিদ্রাতুর শহরের ঠোঁট ঈষৎ খুলে যায়/দুটি ফুল ফোটার মতো। এখন তুমি ঘুমিয়ে আছো।/কখন তোমার শরীর থেকে ঘুমের পাপড়িগুলো/খসে পড়বে, জানি না। ভোরবেলার/ঘুমভাঙা মুহূর্তেই কি তোমার মনে পড়বে/এই আমাকে, যে এখন বসে আছে লেখার টেবিলে,/যে তোমার নিদ্রাকে অনুভব করতে চাইছে/শিরায় শিরায়, যে তোমার শরীরের প্রতিটি ভঙ্গি/আবৃত্তি করছে এই মুহূর্তে, যার মগজে/গুনগুনিয়ে উঠছে নাÑ লেখা কবিতার সোনালি ভ্রমর। (যদি তোমার পাশে থাকতাম)

প্রিয় শব্দমহাজন

১৯৮৯ সালের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে আপনার! আটলান্টিকের পাড়ে কবিতা সন্ধ্যার কথা! কবিতাকে ভালোবেসে আপনি শুধুই ঘুরছিলেন এক দেশ থেকে অন্য দেশে। তা আপনি লিখেছেনও পরবর্তী সময়ে।

মনে পড়ে দূরে ফেলে আসা গলি, মিনি/সুপার মার্কেট অতি সাধারণ, বাসার কাছেই/খুর্বুটে দোকানদার, যার টকটকে লাল দু’টো/চোখ সিগন্যাল বাতি, হাসি আন্তরিক; প্রেমে-পড়া ঘুর ঘুর/তরুণ কুকুর মহল্লার, বাতিজলা রাতের কলোনি আর/পথিকের আসা-যাওয়া, যুগল কবর,/টিএসসি সড়কদ্বীপ, মুখর কবিতা পরিষদ।/ছায়াচ্ছন্ন সিঁড়ি, টুকরো কথা, হাসি মনে পড়ে, মনে পড়ে।/শামসুর রাহমান সঙ্গেই আছেন সর্বক্ষণ; চুপচাপ/প্রায়শঃই, মাঝে-মধ্যে গল্প, কখনো মাতেন তর্কে, গানে,/থিয়েটারে সিনেমায় যান,/ব্রিটিশ মিউজিয়ামে পড়েন ঈষৎ ঝুঁঁকে ক্ষীণায়ু কীটস-এর/উজ্জ্বল চিরায়ু পা ুলিপি,/হেঁটে যান মিসরীয় যুগে, অতীতের সামগ্রীতে/বেজে ওঠে শব্দহীন কলবর, শনেন কাব্যিক/অনুভবে।/ছিঁড়ে খান খান করি অমোঘ স্মৃতির তন্তুজাল। (সে এক পরবাসে)

আপনাকে একটি গল্প বলি, কবি। আপনার কাব্যবন্ধু কবি শহীদ কাদরী ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’র আয়োজন করতেন তার চিরবিদায়ের কয়েক বছর আগে থেকে। সেখানে তিনি বিভিন্ন সময়েই আপনার কবিতা পড়াতেন, আবৃত্তি করাতেন।

তাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমাদের সময়ের প্রধানতম কবি কে? তার উত্তর ছিলÑ শামসুর রাহমান। আমি বলিÑ আর ইউ শিওর? তিনি বলেনÑ শামসুর রাহমান। উপস্থিত সবাই তার মুখের দিকে তাকান। তিনি আপনার কবিতা পড়তে সবাইকে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, শামসুর রাহমানের কবিতা মানেই বাংলাদেশ। ওঁর কবিতা ছাড়া আমাদের অনেক কিছুই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। একজন কবিকে খুব বেশি লিখতে হবে কেন! যোগ করেন শহীদ কাদরী। শামসুর রাহমানের কবিতা বাংলা ভাষাভাষীরা প্রতি সপ্তাহেই পড়বেনÑ সবাইকে সেদিন নিশ্চিন্ত করেছিলেন তিনি।

প্রিয় শামসুর রাহমান

আপনি বেঁচে আছেন কবিতায়। আপনি বেঁচে আছেন আপনার আদর্শে। আছেন প্রজন্মের মননে, মনীষায়। থাকবেনও। যারা আপনাকে জীবদ্দশায় হেনস্তা করতে চেয়েছিলÑ তারা আজও তা চাইছে। কিন্তু তাতে কি আপনার শব্দসম্ভার মøান হবে সামান্যই! না, হবে না।

আপনার মৃত্যুর কিছুদিন আগে লেখা একটি কবিতা আমি আজও পড়ি। ভাবি, কত সহজভাবেই আপনি সাজিয়েছেন আপনার পঙ্ক্তির সংসার।

যতই কলমটিকে লুকিয়ে রাখতে চাই চোখের/আড়ালে টেবিলের ড্রয়ারে, কিছু/বইপত্রের নিচে কবর দিয়ে তত বেশি লাফিয়ে/ওঠে সে আমার হাতে। মুচকি হাসে যেন বেজায়/পেয়েছে মজা। কলমের কা দেখে হাসব/নাকি কাঁদব ঠিক করা মুশকিল ভীষণ। মনে হলো,/অদূরে গাছের ডালে এক হলদে পাখি আমার/দিকে তাকিয়ে যেন হাসছে কৌতুকী হাসি।/পাখিটি কি ভাবছে ভ্যাবাচ্যাকা-খাওয়া লোকটা/জীবনের প্রায় শেষ সীমানায় পৌঁছে ভীষণ/হাবুডুবু খাচ্ছে? গাছতলায় এসে গলায়/দেবে কি দড়ি? কে জানে? আবার আনন্দের/কত মেলা বসে নানা দিকেÑ আলোর ফোয়ারা ফোটে।/এই তো আরও আচানক দিগি¦দিক যুবক, যুবতী/জ্বলজ্বলে নিশান কাঁধে নিয়ে হতাশার তিমির/তাড়িয়ে বালক, বালিকা, বৃদ্ধ, বৃদ্ধার মুখে ফোটায় হাসি। (অন্ধকার থেকে আলোয়)

মানুষ আলোর দিকেই হাঁটতে চায়। আঁধার অতিক্রমের জন্য মোমবাতি জ্বালায়। আমরাও দেশলাইয়ের কাঠি টুকছি প্রতিদিন। পৃথিবী আলোকিত হোক চাইছি মনে প্রাণে। একজন মানুষ মারির কাছে এর চেয়ে বেশি আর কি চাইতে পারে!

"