শেকড় সন্ধানী সুলতান

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

আবদুর রাজ্জাক

একজন চিত্রকর জীবনের মূর্ত ও বিমূর্ত অনুভূতিকে সাদা ফ্রেমে রঙের ছাপে মূর্তরূপে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। শিল্পীদের মধ্যেও যারা নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের মধ্যে এস এম সুলতান অন্যতম। তিনি জীবন ও জগৎকে বিভিন্ন সমারোহে সাজিয়ে তুলেছেন তার ক্যানভাসে। তিনি চিত্রকলার আধুনিকতার একটি নিজস্ব সংজ্ঞা গ্রহণ করেছিলেন। তাই তার চিত্রকর্ম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিল। সুলতানের চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু গ্রামীণ জীবন, কৃষি ও কৃষক, নারী, সাধারণ মানুষের জীবনবোধ এবং মৃত্তিকাসংলগ্ন মানুষ। এসব অনুষঙ্গে ভর করে সুলতান এঁকে গেছেন আজীবন।

মধ্য পঞ্চাশে ঢাকায় আধুনিক চিত্রকলা নিয়ে প্রচুর উৎসাহ ও আগ্রহ নিয়ে শিল্পীরা যখন শৈলী, ফর্ম, মিডিয়া নিয়ে নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন; ঠিক তখনই সবার দৃষ্টির অন্তরালে রয়ে গেলেন এস এম সুলতান। শেকড়ের সন্ধানে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ সাধক। তার জীবনের মূল সুরটি বাঁধা ছিল গ্রামীণ জীবন, কৃষিকাজের ছন্দের সঙ্গে। শিল্পে তিনি উজ্জ্বল করেন বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বাঙালির জীবনের প্রধান উৎস কেন্দ্রটি। বাঙালির দ্রোহ ও প্রতিবাদ, বিপ্লব ও সংগ্রাম এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কীভাবে টিকে থাকা যায়Ñ সেই বিষয় তার চিত্রকর্মে অন্যতম বিষয়-আশয় হয়ে উঠেছে। গ্রামের কৃষকদের জীর্ণশীর্ণ শারীরিক অবস্থা, শোষণ এবং সাধারণ মানুষের স্ব-অবস্থান থেকে উত্তরণ চেষ্টা তার শিল্পকর্মে প্রাণ প্রাচুর্য এনেছে। তার সব সৃষ্টিকর্মে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সমাবেশ ঘটেছে। তাই তিনি কৃষক পুরুষের শরীরকে করেছেন পেশিবহুল এবং বলশীল। কৃষক রমণীর শরীরকে করেছে সুডৌল ও সুঠাম গড়নের। নারীর প্রতিকৃতিতে দিয়েছেন যুগপথ লাবণ্য ও শক্তি। সুলতান প্রত্যক্ষ করেছেন ম্রিয়মাণ কৃষকদের জীবন। তিনি তাদের শেকড়ের সন্ধান করেছেন। তার চিত্রকর্মে শ্রেণি দ্বন্দ্ব, গ্রামীণ অর্থনীতির সামগ্রিক বাস্তবতা বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাই তাকে চিত্রকলায় নিম্নবর্গীয় মানুষের প্রতিনিধি এবং তাদের নন্দনচিন্তার একজন রূপকার হিসেবেও উপস্থাপন করা যায়। এ বিষয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘এস এম সুলতানের শিল্প সাধনায় অবয়ব ধর্মিতাই প্রধান। তিনি আধুনিক, বিমূর্ত শিল্পের চর্চা করার চেষ্টা করেননি। তার আধুনিকতার মানে ছিল জীবনের শাশ্বত বোধ ও শেকড়ের শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ফর্মের নিরীক্ষাকে গুরুত্ব দেননি, মানুষের ভেতরের শক্তির উত্থানই তার কাজে প্রাধ্যান্য পেয়েছে। ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং ঔপনিবেশিকোত্তর সংগ্রামের নানা প্রকাশে তিনি সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তার শিল্পকর্মের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। এটাই ছিল তার নিজস্ব আধুনিকতা অর্থাৎ তিনি ইউরোকেন্দ্রিক, নগরনির্ভর, যান্ত্রিকতা আবদ্ধ, আধুনিকতার পরিবর্তে অন্বেষণ করেছেন অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁর শিল্পীদের মতন মানবের কর্মবিশ্বকে।’

এস এম সুলতানের মতো কেউ আধুনিকতার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেনি। তার নিজস্ব স্টাইলের ক্ষেত্রে তিনি অননুকরণীয়, তার কোনো অনুসারী অথবা স্কুল ছিল না। তার মতো মৃত্তিকাসমর্পিত জীবন তার সমসাময়িককালে কেউ যাপন করেননি। সুলতান তেলরঙ ও জলরঙের ছবি এঁকেছেন। ছবি আঁকতে ব্যবহার করেছেন সাধারণ কাগজ, সাধারণ রঙ এবং চটের ক্যানভাস। এসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে তিনি তার একাগ্র সাধনায় ব্যতিক্রম প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। প্রখ্যাত এ চিত্রকর চেতনায় ছিলেন স্বাধীন এবং প্রকৃতগতভাবে ভবঘুরে ও ছন্নছাড়া, যা তার শিল্পকর্মকে প্রভাবিত করে। তিনি রোমান্টিক কবির আবেগ দিয়ে ভালোবেসেছেন। তার শিল্পকর্মের পরতে পরতে দেশপ্রেম, সাধারণ মানুষকে নিয়ে তার অহংকার, ভালোবাসা, মমত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে। সমাজের নানা অসংগতি অন্যায়ের প্রতি প্রচন্ড প্রতিবাদ, ক্ষোভ এবং মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন তার তুলির পরশে বিশাল ক্যানভাসে রূপায়িত হয়ে উঠেছে। মাঠে জমি কর্ষণরত চাষি, রাখালের বাঁশির সুরে মগ্ন, মাছ ধরায় ব্যস্ত জেলেÑ এসব ধরা পড়েছে তার তুলির মহিমায়। গৃহস্থালির কাজে মনোযোগী পল্লীবালা, মাছ কোটা, ধান বোনায় ব্যক্ত সুখী পরিবার এসব বিষয় হয়ে উঠেছে চিত্রকর্মে। দুপুরবেলায় দূরে কোথাও মেঠোপথে ধুলো উড়িয়ে পল্লীবধূর বাবার বাড়ি যাওয়ার দৃশ্য তার শৈল্পিক চোখ এড়ায়নি। তেমনি এড়ায়নি সারি সারি তাল, নারিকেল গাছ, বনজঙ্গল, নদীতে পালতোলা নৌকা, মাঝি-মাল্লার ভাটিয়ালির সুর, জাল দিয়ে মাছ ধরা, গুণ টানায় ব্যস্ত মাল্লা, কলসিতে জল আনতে যাওয়া গ্রাম্যবধূর চাহনীর গভীরতা।

এস এম সুলতান কৃষকদের জীবন ব্যবস্থার ওপর ছবি এঁকেছেন। তাই তার কল্পনা ও মননে ছিল সেই রুগ্ণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের উন্নতি, কৃষকদের নিয়ে তার অআকা ছবিগুলোতে কৃষকের দৈহিকভাবে বলিষ্ঠ করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এ প্রসঙ্গে শিল্পীর অভিমত, ‘আমাদের দেশের মানুষ তো অনেক রুগ্ণ, কৃষ্ণকায়, একেবারেই কৃষক সেও রোগা, তার গরু দুটো রোগা, বলদ দুটো সেটাও রোগা। তাদের বলিষ্ঠ হওয়াটা আমার মনের ব্যাপার। মন থেকে ওদের যেমনভাবে ভালোবাসি, সেভাবেই তাদের তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমাদের দেশের এই কৃষক সম্প্রদায় একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়েছিল, দেশের অর্থবিত্ত তারাই জোগান, আমার অতিকায় ছবিগুলো কৃষকের অতিকায় দেহটা এই প্রশ্ন জাগায় যে, ওরা রুগ্ণ কেন? কৃষ্ণ কেন? যারা আমাদের অন্ন জোগায়, ফসল জোগায় ওদের বলিষ্ঠ হওয়া উচিত।’

এ দেশের কৃষি ও কৃষকদের জীবনবোধের মধ্যে তার জীবনের মূল সুর ও ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন। আবহমান বাংলার খেটে খাওয়া কৃষিজীবী, মেহনতি মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ, প্রতিবাদ এবং প্রতিকূলতায় টিকে থাকার ইতিহাস তার শিল্পকর্মকে দিয়েছে শ্রেষ্ঠত্ব। গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণ প্রাচুর্য্যরে পাশাপাশি শ্রেণি দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সংগ্রামী রূপ ফুটে উঠেছে আপন মহিমা ও স্বকীয়তায়। তার চিত্রকর্ম বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা সূচারুরূপে চিত্রায়িত হয়েছে। যার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে আমাদের গ্রাম বাংলার কৃষক, কৃষি আর গ্রামীণ জীবন। কৃষি এবং গ্রামীণ জীবন তাকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, শেষ জীবনে এসে তার জীবনের পরিপূর্ণতা নিয়ে এভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সুখী, আমার কোনো অভাব নেই। সব দিক দিয়েই আমি প্রশান্তির মধ্যে দিন কাটাই। আমার সব অভাবেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছে।

সুলতান নারী সুঠাম দেহের গড়ন উপস্থাপন করেছেন। তিনি নারীর চিরাচরিত রূপ-লাবণ্যের শক্তির সম্মিলিত প্রকাশ ঘটিয়ে নারীকে সমাজের মূল স্রোতধারার উপলক্ষ হিসেবে দেখেছেন। তার যেসব চিত্রকর্ম দেশ-বিদেশে বিখ্যাত হয়েছে সেগুলো হলোÑ জমি কর্ষণ-১, জমি কর্ষণ-২, হত্যাযজ্ঞ, মাছ কাটা, জমি কর্ষণের যাত্রা-১ এবং ২, যাত্রা, ধান মাড়াই, গাঁতায় কৃষক, প্রথম বৃক্ষরোপণ, চর দখল, পৃথিবীর মানচিত্র ইত্যাদি। তিনি দেশ-বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৮২ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার সুলতানকে ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট সম্মাননা প্রদান করে। গুণী এই চিত্রকর পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ শিল্প একাডেমি তাকে আর্টিস ইন রেসিডেন্স ঘোষণা করে। এই বিখ্যাত শিল্পীর জীবন ও কর্ম নিয়ে ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ৭ বছর ধরে নির্মাণ করা হয় আদম সুরত প্রামাণ্যচিত্র।

১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর সুলতান এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। রেখে যান এক ইতিহাস, এক আদর্শ, যে আদর্শ যুগ যুগ ধরে অনাগত শিল্পীদের শেখাবে কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে শিল্পীদের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে হয়, কীভাবে জীবনকে অনেক কাছ থেকে দেখতে হয়। তাকে নিয়ে যথার্থই লিখেছেন আহমদ ছফা- ‘কোনো মানুষ জন্মায়, জন্মের সীমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না। অথচ যাদের সবাইকে ক্ষণজন্মও বলা যাবে না। এ রকম অদ্ভুত প্রকৃতির শিশু অনেক জন্মগ্রহণ করে জগতে, জন্মের বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যাদের রয়েছে এক স্বাভাবিক আকুতি। শেখ মুহাম্মদ সুলতান সেই সৌভাগ্যের বরে ভাগ্যবান, আবার সে দুঃর্ভাগ্যের বরে অভিশপ্তও।’

 

"