বায়ুচাপের নিরুপায় উপায়

প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

সৌর শাইন

মঞ্চে বসা বিখ্যাত লেখক আজাদ মোহনের উপস্থিতি পুরো অনুষ্ঠানের প্রাণ। অনেকেই তার অটোগ্রাফ ও ফটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য চারপাশে ভিড় জমিয়েছেন। আনিকা সে ভিড়ের ভেতর ঢুকে লেখকের কাছে পৌঁছানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করল, শেষ অবধি ফিরে এলো খালি হাতে। তারপর ওরা আশাই ছেড়ে দিল। মিতা বলল, লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎ, অটোগ্রাফ, ফটোগ্রাফ ওসব আমাদের ভাগ্যে জুটবে না।

সারদা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। বারবার সে ঠিক করে নিচ্ছিল আনাড়ি হাতে পরা শাড়ি। ঠিক তখনই পুরুষ জোন থেকে বেরোচ্ছেন লেখক, দরোজার পাশে সরাসরি দেখা। সারদা কি বলবে বুঝতে পারছিল না। লেখকই প্রথম বিনয়ী হয়ে কথা বললেন, সরি, আরেকটু হলে ধাক্কা লাগত।

বুকের ওপর আঁচল টেনে অন্যপ্রান্তে নিক্ষেপ করে সারদা হাসল। আর লজ্জা ঝেড়ে বলল, ঠিক আছে, ধাক্কা

তো লাগেনি।

লেখকের ঠোঁট কোণে স্মিত হাসি। টিস্যুপেপারে হাত মুছতে মুছতে এগোচ্ছেন।

সারদা বলল, স্যার, আপনার একটা বই পড়েছিলাম।

লেখক দাঁড়ালেন ও আগ্রহ নিয়ে বললেন, কোন বইটা?

-ওই যে ‘পদ্মার পায়রা দ্বীপ’ বইটা।

-ও আচ্ছা, ওটা তো বন্যাকবলিত মানুষদের নিয়ে লেখা।

লেখক ঠোঁট কোণে রাখা স্মিত হাসি বজায় রেখে চলে যাচ্ছিলেন, কারণ ড্রাইভার অপেক্ষায় আছে। অনুষ্ঠান শেষে খাবারের আয়োজন গেল, এখন তো ঘরে ফেরার পালা। লেখকের ঘরে ফেরার ভাবনায় যে আজ একটু ছেদ ঘটবে, তা তিনি জানতেন না। চলে যাওয়ার মুহূর্তে একটা তৃতীয়পক্ষের বাক্য এসে কানে লাগে।

হ্যাঁ, সারদার পাশে এসে দাঁড়ানো আনিকা চট করে বলে ওঠে, একটা অটোগ্রাফের জন্য জীবন প্রায় বরবাদ করে ফেলেছি...। প্লিজ...

লেখককে আনিকা থামিয়ে দিতে পেরেছে। দুই কদম বাড়িয়ে দাঁড়ালেন। আনিকার দিকে তাকিয়ে রুমালে চশমা মুছে হেসে বললেন, ও আচ্চা। দিন, অটোগ্রাফটাই দিয়ে নিই, তবে আমি খুব সামান্য লেখক।

আনিকাকে লেখক অটোগ্রাফ দিল। ঠিক তখনই মিতা সেখানে এসে হাজির।

-তোদের কত জায়গায় খুঁজে বেড়ালাম, আর তোরা এখানে?

লেখককে দেখে মিতা গদগদ হয়ে বলল, স্যার আমি আপনার নাটকের অনেক ভক্ত! ভীষণ ভালো লাগে আপনার নাটক। ওই যে ‘চিত্রা বনের মৌয়াল’ এই নাটকের সবগুলো পর্ব দেখেছি। বত্রিশে বত্রিশটাই।

লেখক স্বভাবসুলভ হেসে বললেন, শুধু নাটকই দেখেছেন, কোনো বই পড়েননি?

এবার মিতা বলল, না স্যার। তবে আপনার ‘দিন-দুপুরের রাত’ বইটা আমার মিতুল ভাইয়া প্রায়ই পড়ত।

কথাটা শোনে লেখক থমকে গেলেন। মনে হলো, তিনি মিতার কথা শুনে লজ্জায় আড়ষ্ট হলেন। মুখে হালকা হাসি বজায় রেখে বললেন, ওটা আমার কাঁচা বয়সের লেখা, আর ওই বইটার ম্যাক্সিমাম পাঠকও কাঁচা বয়সের।

মিতা বলল, হ্যাঁ, ভাইয়াও কাঁচা বয়সেই ওটা পড়ত। এখন অবশ্য ভাইয়া জার্মানিতে থাকে।

-কাঁচা বয়স পেরোলে বইটারও রস পাল্টে যায়! মধু বেশি দিন ঘরে রাখলে যা হয়!

পাশে দাঁড়ানো সারদা ও আনিকা নিজেদের মতো করে লেখকের পাশে পোজ দিয়ে সেলফিতে মগ্ন। আর এদিকে চলছে মিতা ও লেখকের আলাপ।

মিতা বলল, ওই বইটা পড় তো বলে, মা ভাইয়ার ওপর ভীষণ রাগ করত।

লেখক এবার কপালে রেখা এঁকে জিজ্ঞাসার ঝুলি থেকে কিছু একটা বের করে ঘটনার গভীরে পা বাড়াতে চাচ্ছেন।

তখনই মিতা বলল, এক দিন তো মা ভাইয়ার ওপর রাগ করে বইটা পুড়িয়ে দিলেন।

বই পুড়িয়ে দেওয়ার কথা শুনে লেখকের মুখ শুকিয়ে গেল।

কেন? বই পুড়িয়ে দিল কেন? দুঃখ-অভিমান-প্রশ্ন মিশ্রিত প্রশ্নদ্বয়।

মিতা সামান্য সংকুচিত হয়ে বলল, ওই সময় ছোট ছিলাম, তাই বিষয়টা বুঝতে পারিনি। তবে এখন বুঝতে পারছি!

লেখক এবারও জিজ্ঞাসু চোখে মিতার দিকে অপেক্ষমাণ।

-আসলে ভাইয়া ওই বইটা পড়ে কেমন যেন করত!

-মানে?

-কখনো একা থাকলেই অনেক কাতরাত। মা বলত, এটা ওই বই পড়ার দোষ!

-সেকি মানসিক বা শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিল?

-না না... ভাইয়া তো সুস্থই ছিল।

-তুমি কী বলতে চাচ্ছো, বইটার গল্প বা ঘটনার কারণে তোমার ভাইয়ার মধ্যে এই পরিবর্তন হয়েছিল?

-তা ঠিক জানি না।

-বইটাতে তো কোনো ভূত-প্রেত বা পিশাচ এরূপ ভয়ংকর বিষয় নিয়ে লেখা নয়। তুমি কি শিওর এই বইটা পড়ার ফলেই এমন হতো? নাকি অন্য কোনো বই।

-হ্যাঁ, এই বইটা পড়েই ভাইয়া... একা একা ভয়ানক হয়ে যেত। বাড়িতে কেউ না থাকলে বাথরুমে গিয়েও কেমন চিৎকার-চেঁচামেচি-শ্বাসকষ্টের মতো কান্না করত। বাথরুমের ভেতর নারকেল তেল ও ভ্যাসলিনের কৌটা লুকিয়ে রাখত। একবার তো ডাক্তারের পরামর্শে ঘরে সিসি ক্যামেরা লাগানো হলো ভাইয়ার পাগলামি বোঝার জন্য! আমরা সবাই বাইরে চলে গেলাম। কয়েক ঘণ্টা পর ফিরে ভিডিও দেখা হয়। ক্যামেরায় ধরা পড়ল আপনার বই...। ভাইয়া নাচতে থাকে, ঘেমে অস্থির, গায়ের কাপড়-চোপড় খু...

লেখক মিতাকে থামিয়ে বিরক্তির সঙ্গে বললেন, বুঝতে পেরেছি।

মিতা মুচকি হেসে বলল, স্যার, আমিও এখন বুঝতে পেরেছি কিছুটা। ছেলেদের ব্যাপার তো তাই প্রথমে একদম বুঝিনি! আর মা তো ক্লিয়ার করে বলতে চাননি।

বুঝতে না পারার দলে অমনোযোগী আনিকা ও সারদা। শুকনো মুখ দেখে মনে হচ্ছে ওরা গুরুতর কিছু মিস করছে।

লেখক ভ্রু কুঁচকে কিছু ভাবলেন। হয়তো ভাবছেন, এমন বই তিনি লিখতে গেলেন কেন? যে বইয়ের প্রতি বর্তমানে এসে নিজেরই সাংঘাতিক বিরক্তি ধরে। অথবা ভাবছেন, এই মেয়েগুলোর সঙ্গে কথা না বাড়ালেই ভালো হতো, তাতে অন্তত এই টপিকে আলোচনায় আসার চান্সই পেত না। অথবা ভাবছেন, এ মুহূর্তে তার করণীয় কী? তাড়া দেখিয়ে পিছু হটবেন, না কি কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করাবেন? স্বপক্ষে যুক্তি কি হতে পারে?

লেখক না বুঝতে পারার দলে থাকা বালিকাদ্বয়ের দিকে তাকালেন, আগের সেই স্মিত হাসি এঁকে বললেন, এতে আসলে ওই বইটার তেমন গুরুতর কোনো ভূমিকা নেই। ওটা সামান্য অবলম্বন মাত্র! সামান্য আশ্রয় মাত্র! বৃষ্টি এলে দেখা যায়, মানুষ নানাভাবে জলের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করে। কেউ ছাতা, মাতলা, বড় কচুপাতা, রেইনকোট, পলিথিনের ছই নানা কিছু ব্যবহার করে, ওসব ব্যক্তিভেদে আশ্রয় অবলম্বন! যে বইটার প্রসঙ্গ এলো, ওটাতে তো ঘটনার বর্ণনা, আর ঘটনা তো এই সমাজ-পরিবার-শহর-নগর-রাষ্ট্র-জীবন থেকেই জন্মায়। ঘটনা অনেকটা তরল পদার্থের মতো, তরল যখন যে পাত্রে রাখা হয়, তখন সে পাত্রের আকার ধারণ করে। আমাদের জীবনে প্রতিটি মুহূর্ত এক একটি তরল ঘটনায় আচ্ছন্ন। ওই বইটা একটা বিশেষ মুহূর্তকে প্রতিনিধিত্ব করছে মাত্র! আর এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে অস্বীকার করার উপায় আমাদের নেই।

লেখক মিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার ভাইয়ার কাছে ‘দিন-দুপুরের রাত’ বইটা ছিল ওই মুহূর্তকে অনুভব করার একটা বিকল্প মাধ্যম! ইন্টারনেটের যুগেও যে কেউ বইকে এরূপ মাধ্যম হিসেবে নেয়, তা তো আমার কাছেও অবিশ্বাস্য ঠেকছে। বর্তমানে এ ধরনের কেউ যদি থেকে থাকে তাহলে বলতে হয়, ওটা খুবই আনকমন। তোমরা পাঠ শেষে হয়তো বইটার দোষ হিসেবে বলবে, ওই বইতে আবেদনময় গল্প ছিল। কিন্তু তোমার ভাইয়ার হাতে ওই সময়ে এই বইটা না থাকলে, ভিন্ন কোনো উপায় ঠিকই তৈরি হয়ে যেত। মানুষ ক্ষুধার্ত হলে যা হয়, ভাতের বিকল্প চিড়ে-গুড়-মুড়ি যা হাতের কাছে মেলে, তাই দিয়ে ক্ষুধা মেটায়। বৈধ উপায়ে বা নিজের সামর্থ্যে খাদ্য জোগাড় করতে না পারলে, খাবার ধার করে, হাত-পাতে কারোর কাছে। তাও সম্ভব না হলে অবৈধ পথে পা বাড়ায়, খাদ্য সে চুরি-ছিনতাই পর্যন্ত করতে পিছু পা হবে না। ক্ষুধা মেটাতে না পারলে সে মারা যাবে, তাই এতটা বেপরোয়া অবস্থায় পৌঁছাতে সক্ষম যে কেউ। ক্ষুধা যেহেতু অন্যতম মৌলিক অধিকার! জীবনকেন্দ্রিক ক্ষুধার রূপরেখা বিচিত্র হয়ে থাকে।

তিনজনই মন্ত্রমুগ্ধের মতো লেখকের কথা শুনছে। দাঁড়িয়ে থেকে লেখক কিছুটা ক্লান্তিবোধ করেন, কিছুটা পিছিয়ে বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে একটানা বলতে থাকেন। সারদা ও আনিকা সেই আগের মতো না বোঝার মতোই দন্ডায়মান। মাঝ নদীতে হাবুডুবু খাচ্ছে, তবে এটা ওরা বুঝতে পেরেছে মূল আলোচনাটা লেখকের বই পড়া থেকে। তবু অজস্র প্রশ্ন ওদের মনের ভেতর চোখের পাতায় উড়ে বেড়াচ্ছে। ওদের কথা ভেবেই মিতা বলল, বই পড়ে আসলে ভাইয়া কষ্ট পেত!

এবার লেখক বললেন, এই কষ্ট অবধারিত আনন্দের পূর্বশর্ত! কষ্ট শূন্যতার প্রকাশ্য প্রতীক! কাঁচা সময়টা শূন্যতাকে দীক্ষিত করে, আর পূর্ণতার উপায় অন্বেষণকে ত্বরান্বিত করে। স্রোত থেকে তীরে পৌঁছার সাঁতার শেখায় জীবন চক্র!

মাঝ সমুদ্রে যখন বায়ুশূন্যতা দেখা দেয়, তখন সে শূন্যস্থান পূরণে চারদিকে বায়ু ছুটে আসে তীব্র চাপ নিয়ে। শূন্যতার ধর্মই এমন, যেকোনোভাবে প্রচন্ড বায়ুচাপে পূরণ হবেই, মহাভয়ংকর রূপে ঘুরতে ঘুরতে ঘূর্ণিঝড় ওঠবেই। তেমনি শূন্যতার মাঝে থাকা মানুষ, এ সময়ে জীবন চরকার প্রচন্ড চাপে অবলম্বন খোঁজে, বিকল্প পথ খোঁজে তীব্র গতিতে! মন প্রশান্তির বারান্দায় দাঁড়াতে চায়! শীতল মোলায়েম ছোঁয়া চায়। অন্তত নিঃশ্বাস ফেলার একটু ঠাঁই খোঁজে, নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য একটু রমণীয় অক্সিজেন প্রেম খোঁজে! তেমনি স্বমেহনও এক ধরনের প্রেম! হৃদয়ের গভীরে শূন্যতার ক্ষতে আঘাত করে তৈরি হয় আত্মকাম...। নিজের সঙ্গে চির-আপন অপশনাল প্রেম। বিকল্প কেবলই তৃষ্ণা নিবারণ, ক্ষুধার্ত দেহ-মনকে সাময়িক আনন্দ অন্ন দান।

তিন বান্ধবীই নিশ্চুপ তাকিয়ে আছে লেখকের দিকে। লেখক একটু থেমে মুঠোফোন বের করে গাড়ির ড্রাইভারকে কল করলেন।

-শোনো আমির, গাড়িটা বটতলার দিকেই রাখো। আমি কিছুক্ষণ পরেই আসছি।

লেখক মিতার দিকে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন।

-হ্যাঁ, যা বলছিলাম। যদি তোমার ভাইয়া, এই অ্যাডাল্ট বইটা হাতের কাছে না পেত, হয়তো সে নগ্ন প্রতিকৃতি বা ভিডিও দেখত, কোনো উপায় না পেলে কল্পনার রাজ্যে উলঙ্গ নারীর শরীর এঁকে আস্বাদন করত, হয়তো কখনো কখনো এমনটাও সে করেছে।

এবার লেখক কালিদাসের মেঘদূত রেফারেন্স টেনে আনলেন। বললেন, মেঘদূতে যক্ষ চরিত্রটি তোমাদের কাছে অদ্ভুত লাগবে, যদি তার বিরহ ব্যথা বুঝতে না পারো! বিরহকাতর যক্ষ আত্মবিলাপে মগ্ন হয়ে মেঘের মাধ্যমে প্রিয়ার কাছে সংবাদ প্রেরণ করে। মেঘের সঙ্গে কথোপকথনের সময়, যক্ষ প্রেমিকার দেহ বর্ণনার সঙ্গে প্রকৃতির সাদৃশ্য টেনে আপন কাম ক্ষুধার যন্ত্রণা প্রকাশ করেছিল। সে শুধু যন্ত্রণা প্রকাশই করেনি, এই প্রকাশের মাধ্যমে ক্ষুধার সে উপশমও ঘটিয়েছে। এক দুর্ভেদ্য পরাধীনতার যন্ত্রণা থেকে সে একটু মুক্তি পাওয়ার বিকল্প পথ খুঁজেছে। এ যন্ত্রণা নারী-পুরুষ উভয়ের রয়েছে। আমাদের পশ্চাৎপদ বাঙালি হিন্দু সমাজে বিধবা নারীর কষ্ট উপলব্ধি করেই বিধবা বিবাহ রীতি চালু করেন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর। প্রেম ও কামনার অধিকার সবারই মৌলিক অধিকার! আর ক্ষুধার্তমন নিরুপায় হয়েই কখনো কখনো বিকল্প পথে বা বিপথে ধাবিত হয়, এই বক্র পথে যাওয়াটা সর্বত্র সুখকর নয়।

লেখকের সুদীর্ঘ কথাবলা তিনজনকেই ঘোরে ফেলে দিয়েছিল।

বিদায় পালা শেষে আনিকা ও সারদা মিতাকে জিজ্ঞেস করল, সত্যি করে বলত, বই পড়ে মিতুল ভাই কী করত?

মিতা শুধু বলল, বইটা তোদেরও পড়তে দেব।

 

"