জন্মদিনের ঋণ

ব্যতিক্রমী দীলতাজ

জীবনে জীবন ঘষে অফুরান আনন্দের উৎসদুয়ার খুলে দেওয়ার সক্ষমতা সব লেখকের লেখনীতে সম্ভব হয় না। দীলতাজ রহমান সেই সক্ষমতাকে ধারণ করেন

প্রকাশ | ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

মানুষ হিসেবে এই সুন্দর ধরাধামে আবির্ভাব নিঃসন্দেহে যুগপৎ বিস্ময়ের এবং আনন্দের। সৃষ্টিশীল মানুষ স্বীয় সৃজনকর্মের গুণে মূল্যবান মানবজীবন সার্থক করে তুলতে প্রয়াসী হন। এ কারণে তাদের জন্মবার্ষিকী আমরা উদযাপন করি। অর্থবহ করে তুলি স্মরণের বাতায়ন খুলে।

কবি ও গল্পকার দীলতাজ রহমানের জন্মদিন ছিল ১৭ সেপ্টেম্বর। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই লেখকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সনদ নেই। তবু অন্তর্গত প্রণোদনায় দীর্ঘদিন ধরে কবিতা ও গল্পলেখায় অগ্রসর। শৈশব থেকেই তার চৈতন্যে কবিতা ও গল্পের উদ্ভাস লক্ষণীয়। বর্তমান সনদনির্ভর এই সমাজে একজন দীলতাজ রহমান অনন্য এবং ব্যতিক্রম। কারণ, সৃজন-প্রতিভা প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সনদ লাভের মনোবেদনায় দীলতাজ রহমান থেমে যাননি। একজন বাঙালি নারীর জন্য এটাও একধরনের সংগ্রাম। ব্যক্তিজীবনে সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। একজন দায়িত্বশীল মা হিসেবে শিল্পের প্রতি তার দুর্নিবার আকর্ষণ এতটুকুও কমেনি। প্রসঙ্গক্রমে তার জবানিতে জানা যাক ব্যক্তিগত কথাবলি-

‘বাপের বাড়ি থেকে বিয়ের পর আমার সঙ্গে এনেছিলাম মাত্র নবম শ্রেণির এক সেট বই! সে বইয়ের কিছুই আমি পারতাম না। তাই এ রুম থেকে ও রুমে খালি ওই বই টানাটানিই সাড় ছিল। ৭৮ সালে যখন আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা, তখন ছেলের বয়স এক বছর। বাইশ বছর বয়সের ভেতর আমার চার ছেলেমেয়ে। তাদের পড়াতে পড়াতে মনে হতো, এরা বড় হয়ে গেলে আবার স্কুলে ভর্তি হব। এই আশা আমার দীর্ঘদিন ধরে। তবে একটা নেশা ছিল প্রবল। মানুষকে লেখাপড়া শেখানো। খেলাচ্ছলে আমার সমবয়সি অনেকেরও হাতেখড়ি আমার হাতে। সেই সুবাধে নিজের ছেলেমেয়েও একটু আগেই, মানে কথা ফোটার সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়া শিখেছে। তাদের চারজনকে একসঙ্গে লেখাপড়া করানোর অবস্থা যখন হলো, কেবল তখনই আমি নিজে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করার আশা ছেড়ে দিলাম। তখন মনে হলো, আমি টবের মাটি হয়ে বাচ্চাগুলোকে ফুলের মতো বিকশিত করি। তা না হলে তারা সেরাদের তালিকায় না উঠে, হয়ে যাবে গড়পড়তা!

মনে মনে আমার এই ব্রত সুফল যা এনে দিল, ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করাতে করাতে আর আমার মায়ের যে লবণের ঠোঙা থেকে ডাক্তারি বই পর্যন্ত পড়ার অভ্যাস ছিল, তার ছিটেফোঁটা আমি পেয়েছিলাম...। তো ছেলেমেয়ের লেখাপড়া করাতে আমার যে আকাক্সক্ষা মিশে থাকত, মনে হতো, আমি যা পারিনি, তার সব এদের জীবনে পাইয়ে দিতে হবে।

আর তারা যখন লেখাপড়া করতে শুরু করল, তখন আমি তাদের ফেলে দেওয়া কাগজে আঁকিবুঁকি করতে করতে বোধহয় নিজের স্বপ্নকে আঁকতে শুরু করলাম। লেখাপড়া আমাকে দিয়ে আর হবে না ভেবে, মনে হতো, আমার তো এমন কিছু করতে হবে, যেন মানুষ আমার নামেই আমাকে চেনে।

দীলতাজ রহমান ব্যক্তি হিসেবে প্রাণোচ্ছল। কাছের মানুষদের নিয়ে একসঙ্গে আনন্দমুখর থাকতে ভালোবাসেন। এ ক্ষেত্রে তিনি সদা আনন্দময়ী। দুঃখবোধ হয়তো আছে। তবু সেসব ছাপিয়ে জীবনকে আনন্দ-সায়রে ভাসিয়ে দিতে ভেতর-উৎসাহী তিনি। দীলতাজ রহমান গল্প, কবিতা এবং শিশুতোষ গ্রন্থ মিলে প্রায় ২৪টি গ্রন্থ লিখেছেন। কবিতা দিয়ে সাহিত্যাসরে আত্মপ্রকাশ হলেও গল্পলেখায় তার শিল্পসুষমা পাঠকের মন ছুঁঁয়েছে। গল্পবয়ানে পাঠককে চৌম্বকীয় আকর্ষণে বেশ দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন। তার গল্পে নানা শ্রেণিপেশার মানুষের সম্মিলন লক্ষণীয়। জীবনের বিচিত্র গতিপথে দেখা অদেখা বিস্ময় লুকিয়ে। দীলতাজ রহমান সেই বিস্ময়ের অনুগামী গল্পকার।

২০১৯-এর একুশে বইমেলায় তার লেখা বই ‘নিঃসঙ্গ সৈকতে সোনার ময়ূরপঙ্খি নাও’ পাঠক মহলে বেশ সমাদৃত হয়েছে। ব্যক্তি বোধের নিক্তিতে গল্পের আবহে সম্পূর্ণ গ্রন্থে উঠে এসেছে নিকটজনদের অন্তরঙ্গ আনন্দ-বেদনার আখ্যান। মানুষের জীবন গল্পময়। ইচ্ছা অথবা অনিচ্ছায় নানারকম গল্পের জালে প্রতিনিয়ত আমরা জড়িয়ে যাই। জীবন এভাবেই পরিণতির দিকে ধাবিত হয়। দীলতাজ রহমানের ‘নিঃসঙ্গ সৈকতে সোনার ময়ূরপঙ্খি নাও’ তেমনই একটি গ্রন্থ। বাস্তব জীবনের বিচিত্র চরিত্রে ঠাসা, সরস গদ্যে লেখা একটি চমকপ্রদ গ্রন্থ। জীবনে জীবন ঘষে অফুরান আনন্দের উৎসদুয়ার খুলে দেওয়ার সক্ষমতা সব লেখকের লেখনীতে সম্ভব হয় না। দীলতাজ রহমান সেই সক্ষমতাকে ধারণ করেন।

দীলতাজ রহমানের জন্ম ১৯৬১ সালে, গোপালগঞ্জে। মা রাহিলা বেগম। বাবা সূফী ভূইয়া মোহাম্মদ জহুরুল হক। দীলতাজ আশিক, ফারহানা, ফারজানা ও আরিফ এই চার সন্তানের জননী। আর এদের বাবা এ কে ফজলুর রহমান ছিলেন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার।

দীলতাজ রহমানের উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থÑ ‘ধূসর আঁচলে চাবি’, ‘বহুকৌণিক আলোর সংঘাতে’, ‘বৃত্তভাঙার আয়তন’, ‘মেঘের মেয়েরা’, ‘ফেরার ঘর নেই’, ‘নীলকণ্ঠ নাগ’, ‘গহিন দূরত্ব’, ‘তারান্নুম’, ‘নিঃসঙ্গ সৈকতে সোনার ময়ূরপঙ্খি নাও’।

কাব্যগ্রন্থÑ ‘জনকের প্রতিচ্ছবি’, ‘আশ্চর্য সর্বনাশ’, ‘সবুজের সাথে সখ্য’, ‘এ গোলাপ তোমার জন্য’, ‘পারিজাত অপরাজিতা’, ‘রৌদ্রজলে মরীচিকা ঢেউ’, ‘বৃষ্টি এসে’, ‘ওই দুটি চোখ আমার সীমা লঙ্ঘনের ঠিকানা’, ‘রাতান্ধ বিড়াল’, ‘আমি কদমফুলের ঘ্রাণ চাই’, এবং ‘এ মাটি শেখ মুজিবের বুক’।

শিশুতোষ বই- ‘একটি পাখির ডাকে’, ‘সোনার মেয়ে করিমন’, ‘ভালো ভূত’, ‘মা আমার চোখের আলো’,

এবং ‘পটলের হারিয়ে যাওয়া’। জন্মদিনে এই গুণী লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা ও অফুরান ভালোবাসা।

আমৃত্যু আপনি শিল্পমুখর থাকুন।

* ফারুক সুমন

 

"