অনন্য মানুষ আহমদ রফিক

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

শামসুজ্জামান খান

পূর্ব বাংলায় ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলন আমাদের এ ভূখন্ডে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ ঘটনার আগে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক বিকাশধারা ছিল শ্লথগতির; কারণ আর্থসামাজিক ও উৎপাদন ব্যবস্থার এশীয় ধরনের দুর্বলতার জন্য কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ও মৌলিক পরিবর্তন এ অঞ্চলে ঘটেনি। আর তা না ঘটায় এখানকার ইতিহাস অগ্রগতির ধারায় বিন্যস্ত হয়নি। ফলে এই প্রায় অপরিবর্তনশীল উৎপাদন প্রক্রিয়ার সমাজব্যবস্থায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা খুব সহজেই ভারতবর্ষ দখল করে নিতে সক্ষম হয়। প্রায় পৌনে ২০০ বছর ধরে পরাধীন ভারতে উপনিবেশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে এক ধরনের চাঞ্চল্য ও নবচেতনার সৃষ্টি হয়। বহু মানুষ বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চেতনাগত দিক থেকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু এ ঘটনা ইতিহাসের মূলগত অগ্রগতির ধারা ও পরিবর্তনশীলতাকে তাৎপর্যময় মৌলিকতায় উন্নীত করতে পারেনি, কারণ মানুষের ধর্মীয় বিভাজন সেখানে সৃজ্যমান স্বাধীন রাষ্ট্র চেতনাকে বহুলাংশে কলুষিত করেছে।

তবে ভারত উপমহাদেশের পূর্বপ্রান্তের এক কোণে পড়ে থাকা সাবেক হিন্টারল্যান্ড পূর্ব বাংলা ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ধর্মপ্রবণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হলেও এ অঞ্চলের মানুষের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ও সমন্বয়বাদী ইতিহাসের ধারা ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে জনগণের মধ্যে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয় চেতনার সৃষ্টি করে। পাকিস্তানের পূর্ব অংশ ভৌগোলিকভাবে পশ্চিম অংশের সঙ্গে বিযুক্ত হওয়ায় এ অঞ্চলে বাঙালি জাতিসত্তা এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক চেতনা বিকশিত হয়ে প্রবল জনসম্পৃক্ততা লাভ করে। পাকিস্তানের দুই অংশ ভৌগোলিকভাবে পরস্পর সংলগ্ন হলে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং ধর্মপ্রবণ সামরিক বাহিনীর সহায়তায় পূর্ব বাংলার ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার বিকাশ সম্ভব হতো না। উদাহরণ হিসেবে বেলুচিস্তানের কথা

বলা যায়। পাকিস্তান সরকার সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে সেখানকার জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলন নির্মমভাবে দমন করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ মাতৃভাষায় ভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে তরুণ প্রাণের আত্মাহুতির ধারায় বাঙালি জাতিসত্তা গঠন এবং শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত করে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এ আন্দোলনে পূর্ব বাংলার তরুণ ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যারা এ আন্দোলনে বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে এ কালের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, চিন্তাশীল লেখক, রবীন্দ্রজীবনীকার আহমদ রফিক অন্যতম।

আহমদ রফিক ছিলেন চল্লিশের দশকের শেষ দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। সেসময় মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ছিলেন খুবই রাজনীতি সচেতন। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবও তখন মেডিকেল ছাত্রদের ওপর বিশেষভাবে ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের মধ্যে জ্ঞান চক্রবর্তী, বারীন দত্ত, রমেন মিত্র, অনিল মুখার্জি, শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখ মেডিকেল ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাদের রাজনৈতিক চেতনাকে প্রখর করে তোলেন। মেডিকেল কলেজের অন্য অনেক ছাত্রের মতো আহমদ রফিকও এ প্রগতিবাদী আন্দোলনের প্রভাববলয়ের মধ্যে ছিলেন। ফলে ভাষা-আন্দোলনে তার অংশগ্রহণ ছিল প্রত্যক্ষ। বস্তুত তিনি রাজনীতি-সচেতন কর্মী থেকে নিজেকে ভাষাসংগ্রামী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ভাষা-আন্দোলনের নানা বিষয় তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ পথ চলতে যা দেখেছিতে যেমন বর্ণনা করেছেন, তেমনি তার অপর গ্রন্থ ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপর্য (১৯৯১) এবং আরো অনেক পরে একুশের মুহূর্তগুলো শীর্ষক ছোট একটি বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন ভাষা-আন্দোলনের কথা। এ ছাড়াও ভাষা-আন্দোলন-সংক্রান্ত বিষয়ে তার নানা সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ায় এ বিষয়ে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও তা সহায়ক হয়েছে বলে আমরা মনে করি।

ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক নিজেকে শুধু ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসচর্চার মধ্যেই আবদ্ধ রাখেননি। তিনি গভীর নিষ্ঠায় রবীন্দ্রজীবন অধ্যয়ন এবং তার জীবন-সংক্রান্ত ইতিহাস রচনায়ও নিজেকে যুক্ত করেছেন। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত রবীন্দ্রজীবনীর পাঁচটি খন্ডের প্রথম দুটি খন্ড রচনা করেছেন আবদুশ শাকুর। পরবর্তী তিনটি খন্ড রচনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আহমদ রফিক। ইতোমধ্যে রবীন্দ্রজীবনীর তিনি তৃতীয় এবং চতুর্থ খন্ডটি সম্পন্ন করেছেন। আহমদ রফিকের রবীন্দ্রচর্চা শুধু বাংলাদেশে নয়, বাংলা অঞ্চলেই বিশিষ্টতা অর্জন করেছে। বিশেষ করে তার নানা আলোয় রবীন্দ্রনাথ শীর্ষক প্রায় দেড় হাজার পৃষ্ঠার দুটি বিশাল খন্ড আমাদের মুগ্ধ, অভিভূত এবং বিস্মিত করে।

যে প্রবল নিবিষ্টতায় তিনি এই কাজ সম্পন্ন করেছেন, তা তার মানসিক

উচ্চতা, বোধের গভীরতা এবং গবেষণা দক্ষতার পরিচায়ক।

শুধু ভাষা-আন্দোলন বা রবীন্দ্রচর্চার মধ্যই তিনি নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। একজন প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী হিসেবে যেকোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব প্রদান আমাদের সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রাকে প্রবহমান ও সমৃদ্ধ করেছে। তার লেখালেখির জগৎও বিচিত্র

এবং বহুমাত্রিক। ১৯৫৮ সালের লেখা শিল্প সংস্কৃতি জীবন প্রবন্ধগ্রন্থ নিয়ে

তার সাহিত্য জগতে প্রবেশ। পরে পর্যায়ক্রমে লিখেছেন আরেক কালান্তরে, জাতিসত্তার আত্ম-অন্বেষা, বাংলাদেশ : জাতীয়তা ও জাতি রাষ্ট্রের সমস্যা (২০০০), রবীন্দ্রভুবন পতিসর, রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প। এ ছাড়া আজীবন গবেষক এবং বিশিষ্ট ভাবুক এই অসামান্য মানুষটি কবিতাও রচনা করেছে

কম নয়। শ্রেষ্ঠ কবিতাসহ সাতখানি কবিতাগ্রন্থ তাকে ভিন্ন রকম অবস্থানে স্থিত করেছে। তার সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে লিখতে গেলে পুরো একটি বই লিখতে হবে। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়। তাই আমরা সামান্যভাবে তার ওপর কিছু আলোকপাত করলাম মাত্র। কলকাতার টেগর রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে তাকে যে রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য উপাধি দেওয়া হয়েছে, তা তার জন্য খুবই উপযোগী।

শ্রদ্ধেয় আহমদ রফিকের ৯১তম বর্ষে পদার্পণে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন।

 

 

"