ঘনীভূত আঁধার

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

এখলাসুর রহমান

আইজ কাইল কইরা সাত সাতটা তারিখ করছ মিয়া। অহন টেহাডা ফালাইয়া তবে কথা কও! নইলে এই ঘরের পালার লগে তোমারে আইজ বাইন্ধা থুইমো। নূর হুসেন তালুকদার রাগে আগুন হয়ে আছেন। গেল চৈত্রমাসের টাকা। এখন আরেক চৈত্র মাস। সহ্যেরওতো একটা সীমা আছে। ২ হাজার টাকায় প্রতি মাসে ৪০০ টাকা করে সুদ দিয়ে যাওয়ার কথা, দুই মাস ধরে দিচ্ছে না। নূর হোসেন তালুকদার টাকাটা আর রাখবেন না। আসল শুদ্ধ উঠিয়ে নেবেন। এদিকে বরকত আলির এখন মহা দুর্দিন। এ পর্যন্ত টাকা দেওয়ার সাত সাতটি তারিখ মিস করেছে।

দিবেই কীভাবে? অবস্থাটা এমনই করুণ যে, তিন বেলার মাঝে এক বেলার ভাতই জুটাতে পারে না। সম্বল বলতে ছিল একটা গাভী। দেড় সের দুধ দিত। এত দিন ধরে এই দুধ বেচার টাকা থেকে কিছু কিছু জমিয়ে রেখে তালুকদারের সুদটা দিয়ে আসছে। সপ্তাহ খানেক আগে গাভীটা মরে যাওয়ায় সেই ব্যবস্থাটাও শেষ। এক বেলা আধ বেলা এক-পেট আধ পেট খেয়ে কোনো মতে দিন পাড় করতে হচ্ছে। তার ওপর ছেলেটার অসুখ। চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। স্ত্রীর পরনে শতছিন্ন তালিময় শাড়িটাতেও এখন আর তালি ধরে না। এখন ধান রোপণের মৌসুম। ডিপ টিউবওয়েলের শব্দে কান ঝাঁঝা। বরকত আলি আজগর হাজির বাড়িতে কামলা দিচ্ছে। হাজি জোতদার মানুষ। লাখ টাকা খরচ করে হজ করে এসেছেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। তবলিগে যান কয়েক দিন পর পর। প্রচুর সম্পত্তির মালিক। প্রতি বছরই কমপক্ষে এক হাজার মণ ধান পান। টাকা পয়সার এতটুকু টেনশনও নেই। সংসার চালানোর টানাটানি নেই। দুশ্চিন্তা নেই। পৈতৃক যে সম্পত্তি আছে, শুয়ে বসে খেলেও আরাম আয়েশে দিন চলে যাবে। পরবর্তী প্রজন্মেরও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আজগর আলি এখন পরলোকের পাথেয় অর্জনে ব্যস্ত। দুনিয়া ক’দিনের? আখেরাতের জীবন অনন্ত অসীম। তিনি বেনামাজিকে দুচক্ষে দেখতে পারেন না।

বরকত আলি নামাজ পড়ত না। কীভাবে নামাজ পড়তে হয় তা-ও জানে না। আজগর আলির কড়া ধমকÑ আমার বাড়িৎ কামলা দিতে অইলে নামাজ পড়ন লাগব মিয়া। না অইলে তোমারে কামলা লইতাম না। আল্লার কাম না করলে শান্তি পাইবা না মিয়া। তিন দিনের লাইগা বাইর অও। আল্লারে ডাহ মিয়া দুই দিন পরেই মইরা যাইবা, আখেরাতের কিছু কামাই কইরা যাও! আজগর আলির কথা শুনে বরকত আলির বুকের ভেতরটা ধড়াস করে ওঠে। হায় আল্লা! নামাজ রোজা কিছুই করে নাই না জানি পরকালে কী ভয়ংকর শাস্তি ভোগ করতে হয়। হাজি সাহেব বলে এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা করলে ২ কোটি ৮৮ লাখ বছর দোজখের আগুনে পুড়তে হবে। বরকত আলি কান্না গদোগদো হয়ে বলে, আমারে আপনি নামাজ পড়া শিখাইয়া দেইন চাচাজি। আমি অহন থাইক্যা নামাজ পড়াম। অনেক ভুল করছি জীবনে আর করতাম না। আজগর আলি বললেন, তাইলে পয়লা তোমারে তিন দিনের লাইগা তবলিগে যাইতে অইব। কাপড় চোপড় গুলান ধুইয়া রাখিস। সামনের বিস্যুদ বারে যাইতে অইব।

বরকত আলির কাপড় চোপড় বলতে একটা ময়লা ছেঁড়াফাড়া পাঞ্জাবি। এটা প্রতিবেশী আবদুল হাই মাস্টারের ছেলে ইফতেখারের দান। ওর এই পরিত্যক্ত পাঞ্জাবিটাই সে দুই বছর ধরে গায়ে দিচ্ছে। বাড়ি গিয়ে এটাকে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিল। স্ত্রীকে বলল, একটু নীল দিতে। কিন্তু স্ত্রী মনজুরা এতে চটে গেল। ভেংচি কেটে বলল, ইস্। সখে দেহি বাঁচে না। পাঞ্জাবিতে নীল লাগাইয়া এক্কেরে জামাই সাজব। নতুন বিয়া করতা না কিতা? স্ত্রীর কথা শুনে বরকত আলি রাগে আগুন, কী কী কইলি চুতমারানির হুরি। আমি তিন দিনের লাইগা আল্লার কামে যাইতাছি আর তুই তা লইয়া মশকারি করতাছস। হারামজাদি, আইজ তরে মাইরাই ফালামু। সে একটা মুগুর দিয়ে মনজুরাকে মারতে উদ্যত হয়। মনজুরা পালিয়ে বাঁচে। দূরে গিয়ে জোরে জোরে বলে, তুমি যে তবলিগে যাইবাগা, আমি ওই তিন দিন সংসার চালাইবাম কীবায়। ছেরিডারও অসুখ। ঘরে এক কেজি চাউল আছে। সহালেরডা অইব। এই চিন্তাডা কইরা যাও। স্ত্রীর কথায় বরকত আলি খিঁচিয়ে ওঠে, তুই যেবায় পারস্ এইবায় চল চুতমারানির হুরি! এই বলে রাগে গজ্গজ্ করতে করতে পুঁটলা পাটলা বেঁধে রওনা হয়ে গেল। আজগর হাজি খবর পাঠিয়েছে তাড়াতাড়ি যেতে। রোগা ছোট মেয়েটা তিড়িং বিড়িং করে কাছে এসে বলল, আমার লাইগ্যা একটা লজেন আইন্য বাবা। বরকত আলি ওর দিকে চেয়ে একটু শান্ত হয়। আঙ্গুরাকে কোলে নিয়ে মোটামুটি কোমল কণ্ঠে বলে, আইচ্ছা আনাম নে যা। তোর পেডের অসুখটা ভালা অইছে? আঙ্গুরা নেতিবাচক মাথা নাড়ে। বরকত আলি হাত দিয়ে দেখে পেটটা ফেঁপে ফুলে আছে। মনজুরা তখন আড়ালে গিয়ে অজানা আশঙ্কায় কাঁপছিল। কী করে এই তিনটা দিন নিজের ও ছেলেমেয়েদের পেটের ভাত জুটাবে। বরকত আলি ওকে কিছু না

বলেই চলে গেল।

আজগর হাজির সঙ্গে তিন দিনের তবলিগ করে ফিরে এসে দেখে আঙ্গুরা ডায়রিয়ায় মারা গেছে। বরকত আলি অনেক লজেন্স নিয়ে এসেছিল। ওদিকে না খেতে খেতে হাবলুরও যায় যায় অবস্থা। হাড্ডি ভাসা শরীরে কুঁচকে যাওয়া বিশ্রী চামড়ার ফালি। চোখ দুটো কোটরাগত। স্বামীকে দেখেই মনজুরা চেঁচিয়ে ওঠে, আইচ। আল্লার কাম কইরা আইচ, হুম... ভালাই অইচে, এর ফলও পাইচ সঙ্গে সঙ্গেÑ এই যে তোমার আদরের মাইয়াডা মরল! মনজুরা কিছুক্ষণ দম ধরে থেকে হঠাৎ আরো উত্তেজিত হয়ে ওঠে, আল্লার কাম। কিয়ের আল্লার কাম। আল্লার কাম করার সময় অইচে তোমার? আগে যদি পারো চুরি চামারি কইরা ধনী অইয়া লও পরে পারবা। যেমনÑ আজগর হাজি পারতাছে। তবলিগে গেলে তোমার লাহান হের পরিবারের কেউতো না খায়া থাকত না। হে এ আল্লার কাম করুক, তোমার লাইগ্যা আল্লার কাম সাজে না। পারলে আগে মাইনষেরে মাইরা ধইরা ধনী অইয়া লও।

আজগর হাজি গত কালকের কামলার টাকা দেয় নাই। রাত ভর ধর্ম সভা শুনে এসে ঘুমুচ্ছে। বরকত আলি মেঘলা মুখ করে বাড়ি ফিরে এলো। এসেই নূর হুসেন তালুকদারের মুখোমুখি। তিনি ঘরের মধ্যে জল চৌকিতে বসে আছেন। বরকত আলিকে দেখেই খেকিয়ে ওঠেনÑ আইজ লইয়া সাত সাতটা তারিখ করছস শুয়োরের বাচ্চা। টেহাডা এই সাফ জায়গাডায় ফালা কইলাম। ফালাইয়া কথা ক কুত্তার বাচ্চার ঘরের কুত্তার বাচ্চা! আপনে বাপ তুইল্যা গাইল দেন কেরে। টেহা পাইবাইন টেহার কথা কইন। বরকত আলি একটু রেগে ওঠে। এতে নূর হুসেন তালুকদারের মেজাজ আরো চড়ে যায়। কিতা কইচস, কিতা কইচস কুত্তার বাচ্চার ঘরের কুত্তার বাচ্চা। আবার মুহে মুহে কথা, আরেকবার ক দেহি যদি ঘুষি মাইর‌্যা তোর মুখটা না ভাঙ্গি! নূর হুসেন তালুকদারের অগ্নিমূর্তি দেখে বরকত আলি স্তব্ধ হয়ে যায়। ওর ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। বহু কষ্টে অসহায় ক্ষোভকে চাপা দিয়ে রাখতে হচ্ছে।

নূর হুসেন তালুকদার আজকে টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা না করে যাবেই না। গালাগালি করে বরকত আলির বাপ দাদা চৌদ্দ গোষ্ঠীকে কবর থেকে টেনে হেঁচড়ে বের করে ছাড়ছে। অতঃপর ঘরের মাঝখানের কাপড় টাঙানোর রশিটা খুলে নিয়ে বরকত আলিকে বেঁধে ফেলল। দেখে মনজুরা হাবলুকে বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে বিলাপ করতে থাকে। হাবলুকে নিয়ে এখন সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার কথা ছিল। নূর হুসেন তালুকদারের তেজি ঘোষণা, আমি যতক্ষণ না আইচি ততক্ষণ ওরে কেউ ছাড়তে পারবা না কইলাম। আমি রহমান ভেন্ডাররে নিয়া আইতাচি। হাবলুকে বুকে জড়িয়ে ধরা মনজুরার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। সামনে শুধু এক দিঘল কালো ভূতুরে আঁধার। আঁধারটা ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। এই আঁধার অরণ্যে জ্বালাবে কি কেউ আলো? নাকি ওর চোখ হবে চিরতরে আঁধারে বিলীন।

"