নাচঘরে ছড়িয়ে পড়ছে সুরের আরক

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

জোবায়ের মিলন

কবিতা যার সঙ্গ, সুপাঠ্য কবিতা তার বন্ধু। বারবার দেখা তো হতেই পারে। কবি তুষার কবিরের কবিতায় সেই বন্ধুতার সৎচরিত্র উপস্থিত। ভাষার সদাচার পরিলক্ষিত। বক্তব্যের সারল্য মেশানো। উক্তির মিষ্টতা মাখা। উপমা, উৎপ্রেক্ষার অযাচিত উৎপীড়ন নেই কোথাও।

বিচ্ছিন্নভাবে কবি তুষার কবিরের কবিতা পাঠের সুযোগ হয়েছে বারবার। দৈনিকের পাতায়, লিটলম্যাগে পড়েছি তার ছোট ছোট তবে ছোট নয়, এমন কবিতা। আঁচ যা পাবার তা পেয়েছি ওখানেই। তার কবিতার বই ‘তাঁবুকাব্য’ পাঠ করি দৈনিকের পাতায়, চেনা কবিতার বিভা লোভেই। বইয়ের প্রথম কবিতা ‘জঙ্গলে’ থেকে শেষ পাতার কবিতা ‘সমুদ্র ও সরাইখানা’ পর্যন্ত পাঠে পাঠে আমার কাছে যে কথাগুলো ব্যক্ত করার ইচ্ছা হয়েছে তা যেন এই তাঁবুকাব্যের প্রচ্ছদ শিল্পী নির্ঝর নৈঃশব্দই বলে দিয়েছেন দ্বিতীয় মলাটেÑ মুখোবন্ধে। একটু বদলিয়ে বললে বলা যায় এভাবেÑ তুষার কবিরের কবিতা এ সময়ের বাঙলা কবিতার এক সক্রিয় ও স্বতন্ত্র স্বর। অভিনব তার শব্দঅভিধা। অনবদ্য তার চিত্রকল্প। প্রথাগত আবেগকাতরতা, রুগ্ণ-ভাবালুতা থারোথরো প্রেমময়তা পরিহার করে তুষার কবির সৃষ্টি করেছেন শিল্পঋব্ধ কবিতা। চিত্রকল্পের জ্যোার্তিময় আলোকছটা ছড়িয়ে তুষার কবির তার কবিতায় পাঠক হিসেবে আমাকে নিয়ে গেছেন বাগদেবীর কুহক আশ্রমে! ভিন্ন স্বরে, ভিন্ন এক লিখনভঙ্গিমায়, বহুরৈখিক বিষয়প্রকরণে প্রতিটি কবিতা সাজিয়ে তুলেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন ভাষায়।

বৈশ্বিক আবহে তুষার কবির মনোলগের কথা ও বাস্তবিক টানাপোড়েনের মধ্যে কাব্যানুষঙ্গের ভেতর দিয়ে এক অভাবিত যোগসূত্র স্থাপন করেছেন তার মেধাদীপ্ত রূপক মেধায়। কিছু শব্দ ঘুরে ফিরে কয়েকটি কবিতায় ব্যবহৃত হলেও শব্দগুলো আরোপিত মনে হয়নি কোথাও; মনে হয়নি শব্দাভাবই কারণ। ব্যবহৃত শব্দগুলোকে কবির নিজের শব্দ বলে মনে হয়েছে কোথাও কোথাও। ‘গলি ঘুপচি’ শব্দ দুটি কারো ব্যক্তিগত শব্দ নয়। কিন্তু জ্যেষ্ঠজন কবি শামসুর রাহমান এই শব্দ দুটিসহ কিছু শব্দ এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে, শব্দগুলো সে কবির নিজস্ব বলে একসময় পাঠকের কাছে মনে হয়েছে। ‘কোরক, মনোলগ, দ্রাক্ষা, লগবুকসহ আরো কিছু শব্দ তুষার কবিরের নিজস্বতা বলে ঠাওর হয়েছে বারবার। এখানেই হয়তো তার সার্থকতা।

কবিতার পাঠক বলে অতিরঞ্জিত বলছি না, কবিতার এই দুঃসময়ে তুষার কবিরের কবিতা জ্যৈষ্ঠের তপ্ত গরমে এক গ্লাস হালকা ঠান্ডা জলের মতো অথবা মাঘের কনকনে শীতের রাতে কয়েক টুকরো খরপোড়া আগুনের ওমের মতো শান্তিদায়ক। এই সময়ে কবিতা পড়তে চেয়েও বারবার ফিরে ফিরে কবিতাকে অভিসম্পাত ছাড়া কোনো উপহারই যখন পাঠকের পক্ষ্য থেকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তখন তুষার কবিরের কবিতা পাঠককে একটানা টেবিলে বসিয়ে রাখার সক্ষমতা রাখে বলে মনে হয়েছে। বাজারে বিক্রির কথা নয়, এই কবির কবিতা, পাঠকের ভাবনার কথা বলতে পেরেছে সরল উক্তির সমষ্টিতে। বলতে পেরেছে কবিতার কাছে পাঠকের চিরআকাঙ্খিত স্বপ্নের কথা, চিন্তার কথা, আবেগ ও আবিরের কথা। এও বলবো না, তাঁবুকাব্য বইয়ের সবগুলো কবিতা ভালোলাগাকে স্পর্শ করেছে; কোনো কাব্যগ্রন্থের সবগুলো কাব্যই তা পারে না অধিক ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রে তুষার কবিরও একই। তবে অধিকাংশ কবিতা এই নগণ্য পাঠকের মনকে জয় করতে পেরেছে। মনে হয়েছে, সত্যি কিছু কবিতা পাঠ করলাম, যা অনেকদিন আশানুরূপ পাওয়া যায়নি অনেক গ্রন্থের মলাট ভেতরে।

কবিতার নামে এখন যে অকবিতার চাষাবাদ চলছে স্বৈরাচারীভাবে, গ্রন্থের নামে কুগ্রন্থের যে বীজ বপন চলছে অর্থালোভে, প্রকাশের মোহে যেভাবে চলছে হযবরল সে পরিস্থিতিতে পাঠক দ্বিধাগ্রস্ত হবারই কথা, পাঠক ভয়ে হাত-পা গুটিয়ে রাখারই কথা। পাঠকের মনে ভয় ধরে যাবারই কথা। পাঠকের তাই দোষ দেই না কোনোখানে। তুষার কবিরের তাঁবুকাব্য সত্যি একটি ভালো কাব্যগ্রন্থ। এর মধ্যস্থÑ ‘জঙ্গলে বেড়াতে এলে আমি আসলে তোমার শরীরেই/নিঃশব্দে ভ্রমণ করি!/জঙ্গলেরই বুকঝিম্ পথে হেঁটে গিয়ে/আমি খুঁজে পাই দূরের ছড়ানো ভাঁটফুল/ পাতাঝরা আলকীবনÑ/কোথাও যেনবা ভেসে আসে তিতিরের ডাক/ঝোপ থেকে উঠে আসে ময়ূরীর মনোলগ/আর জলডাহুকীর গানÑ/জঙ্গলে বেড়াতে এসে তোমার শরীরজুড়ে লেখা হতে থাকে/আরণ্যিক নোটবুক!... (জঙ্গলে বেড়াতে এলে)।

‘এই ঝাড়বাতিঅলা নাচঘরে, জানি তুমি হারিয়ে ফেলেছ সেই নৈশমুদ্রাÑ/যার পলাতক ভাঁজে ভাঁজে জড়ো হয় আঁধার রাত্রির স্বরগ্রাম!/কামিনী ফুলের ঘ্রাণে যে নর্তকীরা জেগে ওঠে সরাইখানার কুঠুরিতে;/ তাদের কণ্ঠের ফাঁক গলে কেবলি বেরিয়ে আসে ঘোড়ার খুরের ধ্বনি/তাদের কাঁচুলি চিরে জেগে ওঠে মোহ, মায়া, মদ, দ্রাক্ষা, পাপ আর প্রহেলিকা।/ নর্তক তোমার নাচে আজ গড়িয়ে পড়ছে শুধু ঘুঙুরের দানা/নাচঘরে ছড়িয়ে পড়ছে দ্যাখো সুরের আরকÑ/দৃপ্ত হাতে বেজে যাওয়া এসরাজে ভেসে যাচ্ছে ভেজা ভেজা রক্তের

কোরক।’ (নর্তক)

গ্রন্থের কবিতাগুলো পাঠের পর পাঠকের মন কবি তুষার কবির, তার কবিতা ও তাঁবুকাব্য সম্পর্কে উপর্যুক্ত কথাগুলোর সঙ্গে সহমতের হবেন বলে বিশ্বাস। ভালো কবিতা পাঠকের পাঠদ্বারে পৌঁছুক সে প্রত্যাশায় তাঁবুকাব্যের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।

 

 

"