স্রোতের বিপরীতে হেঁটে ইতিহাস

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

স্রোতের বিপরীতে সবাই হাঁটতে পারে না। অধিকাংশ মানুষ স্রোতের অনুকূলে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। হাতে গোনা বিরলপ্রজ কিছু মানুষ স্রোতের বিপরীতে হেঁটে ইতিহাস রচনা করে। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন কৃষ্ণবর্ণের বিখ্যাত আফ্রো-মার্কিন ঔপন্যাসিক টনি মরিসন। তিনি ছিলেন কৃষ্ণবর্ণের মানুষদের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা আদায়ের লড়াইয়ে একজন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। যখন গোটা আমেরিকা ও ইউরোপে বর্ণবাদের বিষবাষ্প, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যে জর্জরিত, তখন কলম হাতে তুলে নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাজ পরিবর্তনের সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে ছিলেন মরিসন। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও শ্বেতবর্ণের মানুষরা তখনও কৃষ্ণবর্ণের মানুষদের তাদের মতোই একজন মানুষ হিসেবে দেখতো না। তখনও কৃষ্ণাঙ্গদের ঘৃণার চোখে দেখা হতো। শুধু গায়ের রঙ ও শারীরিক আকৃতির পার্থক্যের জন্য শ্বেতবর্ণের আমেরিকানদের দৃষ্টিতে তারা ছিল নিকৃষ্ট বা নিচু প্রজাতির মানুষ। তাদের প্রতি ছিল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আকাশ পাতাল বৈষম্য। সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধেই ছিল টনি মরিসনের পথচলা।

তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে শিশু ও নারী নির্যাতন, বর্ণবাদ বিরোধিতা, আফ্রো-আমেরিকান কৃষ্ণবর্ণের মানুষদের প্রতি শ্বেতবর্ণের আমেরিকানদের অমানবিক অবিচার, নির্যাতন ও বৈষম্য। সাহিত্যকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। এটি-ই ছিল আফ্রিকান আমেরিকান হিসেবে সাহিত্যে সর্বপ্রথম নোবেলপ্রাপ্তি। টনি মরিসন ছিলেন একাধারে একজন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদিকা ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস। তাঁর উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য হলো মহাকাব্যিক রীতি, তীক্ষè

কথোপকথন এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ চরিত্রায়ন।

১৯৩১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়ে রাজ্যে এক আফ্রো-মার্কিন পরিবারে টনি মরিসন জন্ম নেন। তাঁর পরিবার প্রদত্ত নাম ছিল ক্লো আর্ডেলিয়া ওফর্ড। তাঁর পিতা জর্জ ওফর্ড ছিলেন জাহাজ কারখানায় ঢালাই শ্রমিক ও মা রামাহ উইলিস ওফর্ড ছিলেন একজন গৃহিণী। ১২ বছর বয়সে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করার সময়, নিজের নাম পাল্টে ‘অ্যান্টনি’ করে নেন ক্লো। সেই অ্যান্টনি থেকেই ‘টনি’র জন্ম। হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ১৯৫৮ সালে জামাইকান স্থপতি হ্যারল্ড মরিসনকে বিয়ে করেছিলেন। বছর কয়েক পরে ১৯৬৪ সালে দুজনের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে গেলেও, টনির নামে থেকে যায় তার প্রাক্তন স্বামীর ‘মরিসন’ পদবিটি। তাদের দাম্পত্য জীবনে পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখে তাদের দুই সন্তান হ্যারল্ড ফোর্ড ও সø্যাড কেভিন। কর্মজীবনে টনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। একই সঙ্গে প্রকাশনা সংস্থা র‌্যানডম হাউসের সম্পাদক ছিলেন। স্কুলে থাকতে এক শেতাঙ্গ সহপাঠী তাঁর চোখ দেখে বলেছিল, ‘তোমার চোখ আমাদের মতো নীল নয়। তুমি নিশ্চয়ই চাও, তোমার চোখও এ রকম সুন্দর, নীল হোক?’ এই কথাটি মরিসনের মনে গভীরভাবে দাগ কেটে ছিল। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বিশ বছর পরও সেই নীল চোখের স্বপ্ন তাড়া করে বেড়াতো কালো চোখের কালো মেয়েটিকে। নীল চোখ, সোনালি চুল, সাদা চামড়ার বাইরেও যে একটা জগৎ আছে, নির্মম কিন্তু অপরূপ, শেকলে বাঁধা কিন্তু ডানায় ভর দিয়ে উড়তে উন্মুখ, সেটাই

বারবার লিখেছি আমি।’

১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’। এই উপন্যাসে ‘পিকোলা’ নামক কৃষ্ণবর্ণের এক বালিকার নির্দয় ভাগ্য আর অভিশপ্ত জীবনের গল্প লিখেছেন। ছোট্ট পিকোলা নিজেকে চেনার আগে চিনেছে নিজের প্রতি ঘৃণাকে, চিনেছে বৈষম্য আর বিভেদকে, জেনেছে কেবল জন্ম আর বর্ণের ফেরে সে মানব সমাজে নেমে গেছে অনেক নিচে, হয়ে উঠেছে অবহেলা আর ঘৃণার পাত্র। এই পৃথিবীতে কালো রঙ, মোটা ঠোঁট ও বোচা নাকের কুৎসিত মানুষের কোনো মূল্য নেই। তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন, এমনকি তাদের হত্যা করা হলেও সেটা গুরুতর অপরাধ নয়। সে বুঝতে পারে, নীল রঙের চোখ ও

সোনালি চুলের পুতুলের মতো হতে পারলেই মানুষ তাকে আদর করবে। তাই সে ঈশ্বরের কাছে একজোড়া নীল রঙের চোখ প্রার্থনা করতো। নিজ মাতাল পিতা কর্তৃক ধর্ষিত হওয়ার পর সে অনুভব করে, এই প্রথম কেউ তাকে কাছে টেনে আদর করেছে। অকালে গর্ভবতী হওয়ার পর সমাজ তাকে তীব্র ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে এবং পুরোপুরি বিবর্জিত হয়। তখন পিকোলো ভাবতে থাকে, তার কালো রঙের চোখ সম্ভবত ঈশ্বর নীল রঙে পরিণত করেছে। তাই সবাই ভিন্ন দৃষ্টিতে অবাক বিস্ময়ে পিকোলোকে তাকিয়ে দেখছে। মূলত টনি মরিসন একজন কৃষ্ণবর্ণের প্রতিনিধি হিসেবে ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’ উপন্যাসের মাধ্যমে অত্যন্ত সুচারুরূপে বর্ণবাদ, শিশু নির্যাতন, কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি অমানবিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যগুলো উপস্থাপন করেছিলেন। যা পৃথিবীর বুকে আলোড়ন

সৃষ্টি করেছিল এবং পাঠক হৃদয় হয়েছিল দগ্ধ। ১৯৯৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান টনি মরিসন।

"