রবীন্দ্রনাথের মানবসত্তা

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

মামুন মুস্তাফা

আমাদের বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান যেমন চিরসত্য, প্রকৃত তেমনি তাঁর বিপুল কাব্যভান্ডারের অনেক ক্ষেত্রভূমি তার ভেতরের সার নির্যাস আজও পাঠকের কাছে অনাবিষ্কৃত। আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন, ‘জটিলতম পরিচ্ছেদ’। কিন্তু শত দুরূহ তার ভেতরেও রবীন্দ্রনাথের কবিতা আমার কাছে একাধারে চিরবিস্ময় ও আদরণীয়। রবীন্দ্রনাথ যে তাঁর সকল সাহিত্য সাধনার ভেতর দিয়ে সকলের হয়ে উঠতে পেরেছিলেন, সেক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয় তাঁর ধর্ম-দর্শন একটি বিরাট ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল। যেখানে মানবিকতাই অন্যতম।

সুতরাং রবীন্দ্রনাথের কাব্যকৃতির সৌন্দর্যলোকে গণতান্ত্রিক মানুষের মানবিকতার জয়ধ্বনি আমরা লক্ষ করি। বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীময় যে ভাঙাগড়ার ইতিহাস, তা থেকে মুক্ত নয় এই ভারতবর্ষও। তাইতো কবি ‘বলাকা’ কাব্যের প্রতিটি ছত্রে নতুন যুগের সংঘাতময় পরিস্থিতি মোকাবিলার কথা বর্ণনা করেছেন। আবার এ কাব্যেই যুদ্ধমত্ত পৃথিবীর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কবি দিকনির্দেশনা দিতে ভুল করেননি। বলাকা কবিতায় তিনি বলেন, ‘দুঃখেরে দেখেছি নিত্য, পাপেরে দেখেছি নানা ছলে;/...মৃত্যু করে লুকোচুরি/সমস্ত পৃথিবী জুড়ি।/...আজ দেখো তাহাদের অভ্রভেদী বিরাট স্বরূপ।/তার পরে দাঁড়াও সম্মুখে,/বলো অকম্পিত বুকেÑ/‘তোরে নাহি করি ভয়,/এ সংসারে প্রতিদিন তোরে করিয়াছি জয়।/তোর চেয়ে আমি সত্য, এ বিশ্বাসে প্রাণ দিব, দেখ।/শান্তি সত্য, শিব সত্য, সত্য সেই চিরন্তন এক।’ এভাবেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমগ্র জীবনসাধনার মধ্যে শান্তি ও সত্যের চিরায়ত সৌন্দর্যকে

ঘোষণা করেছেন।

আমরা এও জানি, যুগে যুগে পৃথিবীতে অনেক মনীষী ছিলেন মানবতার প্রবক্তা। আবার দেশে দেশে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রচারকদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল মানবতাবাদের প্রতিষ্ঠা করা। এ প্রসঙ্গে মানবসভ্যতার সর্বশেষ প্রধান ধর্ম ইসলামের কথা বলা চলে। যেখানে শুদ্ধতমভাবে একশ্বেরবাদী নিরাকার স্রষ্টার আরাধনার কথা বলা হয়েছে। আর এখন বর্তমানে কিছু বিভ্রান্ত ‘বিশ্বাসী’র অত্যুৎসাহ বাড়াবাড়ি এবং ধর্মের অপব্যাখ্যা সাধারণ মুসলমানের নিগ্রহ শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে পীড়া দেয়। বিংশ শতাব্দীর শেষ অধ্যায় পর্যন্ত বেঁচে থাকলে রবীন্দ্রনাথ নিজেই মর্মাহত হতেন। কেননা তিনি ছিলেন সামঞ্জস্য, ঐক্য এবং মিলনের অক্লান্ত প্রচারক। কবি মানুষের ধর্ম বলতে বুঝেছেন মানবতা ও শান্তির ধর্ম।

অথচ শুভ ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীতে যে মানবতার বাণী যুগে যুগে প্রচারিত হয়েছে, তাকে ব্যর্থ করে পৃথিবীর মানুষ মারণাস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত। সুতরাং মানুষের ইতিহাস কখনো নিরবচ্ছিন্ন শান্তির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়নি। ফলে রবীন্দ্রনাথের শান্তিবাদী চেতনা গভীরভাবে নাড়া খেয়েছিল। আর তাই মানবপ্রেমের বার্তাই বারবার উচ্চারিত হতে দেখি রবীন্দ্রনাথের সকল লেখাতে। তাইতো শান্তির এই অগ্রদূত ধ্বংসের মাঝেও সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখেছেন।

এই যে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য একুশ শতকে এসেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে, তারও কারণ আধুনিক জীবনাচরণে তার প্রকাশ আছে বলে। যদিও আধুনিক শব্দটি পিচ্ছিল, পরিবর্তমান ও বিপজ্জনক। বিংশ শতকের বিভিন্ন সময়ে ‘আধুনিক সাহিত্য’ কখনো ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ নামে বিভিন্ন সংকলন প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু একমাত্র বুদ্ধদেব বসুর ‘অহ অপৎব ড়ভ এৎববহ এৎধংং’ নামে ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পর্যালোচনা’ এবং আবু সয়ীদ আইয়ুবের ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথকে আমরা বিশ্বসাহিত্যের তুলনামূলক বিচারে আধুনিক কবি হিসেবে পেয়েছি।

যদিও প্রচলিত অর্থে রবীন্দ্র উত্তর কালপর্বে তিরিশের ‘প্রগতি’, ‘কল্লোল’, ‘কালিকলম’, ‘কবিতা’, ‘পরিচয়’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যে নতুন একদল কবি-সাহিত্যিকের হাতে বাংলা কবিতা কিংবা গদ্যের পালাবদল ঘটেছিল, সেই নতুন সাহিত্যকে আধুনিক সাহিত্য হিসেবে নামাঙ্কিত করা হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সাম্প্রতিকতাকে উত্তীর্ণ করতে পেরেছে যে সাহিত্য, সেটিই প্রকৃত অর্থে আধুনিক। আর এ আধুনিকতার অন্তরালে ছিল বিশ্বকবির মানবচেতনা ও বোধ।

আর তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিপুল বিস্ময়াভিভূত দার্শনিকতা বাংলা কবিতাকে যে উচ্চ আসন দিয়েছে, সেখানে সমগ্র ভারতীয় চেতনার তুলনায় বাংলার সংস্কৃতির ঐতিহ্য বাঙালির ইতিহাসচেতনায় ঠাঁই করে নিয়েছিল ‘মানুষ’। রবীন্দ্রনাথের কবিতার কালবোধ বিশ্বব্যাপী শিল্প-সাহিত্যের রস আস্বাদনের মাধ্যমে ভারতবর্ষে প্রচলিত হিন্দু মিথ, মধ্যযুগের শিল্প-সাহিত্য, গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি, সমাজনিহিত আচার-প্রথা-কৃষ্টির ভেতরে বেড়ে উঠেছিল। ফলে একক সমগ্রতায় রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ইতিহাস বৈশ্বিক চেতনায় উদ্ভাসিত মনস্তত্ত্ব ও দার্শনিকতায় আক্রান্ত। আবার বাংলা কথাসাহিত্য বিশেষত ছোটগল্পের জাদুকর বললে রবীন্দ্রনাথকে খুব বেশি বলা হবে না। বলা যায়, উনিশ শতকে রবীন্দ্রনাথের হাতে বাংলা ছোটগল্পের সূচনা। বাংলা ছোটগল্পের নিয়তিবাদী ও অতিপ্রাকৃত গল্পের দুটি ধারা আমরা লক্ষ করে থাকি। এই অতিপ্রাকৃত গল্পের সূচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মানবমনের দ্বান্দ্বিক টানাপড়েনের মধ্যে যে স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, আশা-নিরাশার বিভ্রম, তারই আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রবীন্দ্রনাথ অতিপ্রাকৃত গল্পের জগৎ নির্মাণ করেন। একইভাবে রবীন্দ্রনাথের নিয়তিবাদী গল্পের আখ্যান রচিত হয়েছে নরনারীর মনস্তাত্ত্বিক জীবনবোধের সমগ্রতায়। সুতরাং বাংলা ছোটগল্পকে রবীন্দ্রনাথ দাঁড় করিয়েছেন ইতিহাসের কৃষ্ণ সময়ের অকৃত্রিম ভাষ্যরূপে। উনবিংশ শতাব্দীর রাজনীতি ও সমাজনীতির পাশা খেলায় তাঁর কথাসাহিত্যের পাত্র-পাত্রী সাধারণ মানুষের ভাগ্য ও ভবিতব্যকে পুঁজি করে হয়ে ওঠে অসাধারণ। সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্ব নাটকের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রূপকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার যেভাবে এই মর্ত্যে বিচরণকারী প্রতিটি নর-নারীর ভেতর-বাহির পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন, ঠিক তেমনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা কথাসাহিত্যে ভারতবর্ষের নর-নারীর এমন কোনো চরিত্র বাদ রাখেননি যাকে আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে দেখতে পাই না। সেই মানব-মনের খেলায় রবীন্দ্রনাথ মানুষেরই জয়গান করেছেন। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালির নিত্যদিনের সঙ্গী যেন। তাঁর গানে যেমন বাংলার প্রকৃতি বাঙালির উঠোনে ধরা পড়ে; তেমনি প্রেম ও পূজাবিষয়ক গান কীর্তন, বাউল ও লোকসংগীতের ধারায় হয়েছে উৎসারিত এবং বাঙালিকে করেছে আশ্বস্তÍ, শান্ত, দিয়েছে শান্তি ও পরিপূর্ণতা।

সুতরাং আমরা লক্ষ করি, রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম তাঁর দার্শনিকতা ও আধ্যাত্মচিন্তার মধ্য দিয়ে সার্বিক মানব-মঙ্গল এবং মানবিকতার অন্য স্তরে উন্নীত। রবীন্দ্রনাথের স্বাদেশিকতার মূলমন্ত্র ছিল মানুষের প্রকৃত মুক্তি, বৈষয়িক চাওয়া-পাওয়া এবং লালসাচিন্তার শৃঙ্খল থেকে মুক্তিÑ যার চূড়ান্ত গন্তব্য এক সর্বজনীন শুভবোধ। কবির স্বপ্ন ছিল ক্ষুদ্র মনুষ্য-অস্তিত্ব থেকে আলোকিত এক মানবে উত্তরণ, যার অবস্থান মানুষের ভেতরেই, মানবধর্মে।

‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’Ñ রবীন্দ্রনাথের এই উক্তি বলে দেয় মানুষের জন্য কল্যাণ কামনা এবং মানুষের ওপর বিশ্বাসই তাঁর ধর্মের অন্যতম স্তম্ভ। কিন্তু এ হলো তাঁর দর্শনের ইহজাগতিক দিক। অন্যদিকে তিনি মানুষের ক্ষুদ্র জীবসত্তাকে অসীম মহাজাগতিক সত্তার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। আর তাই কবি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মুক্ত মানবতার সন্ধান করে চলেছেন।

মূলত হিংসা, আত্মদ্বন্দ্ব এবং সংঘাতের অবসানে রবীন্দ্রনাথ এভাবেই মানবিকতার বিজয়কেতনকেই ঊর্ধেŸ তুলে ধরেছেন। চিরদিন শুভর পক্ষে, নির্যাতিতের পক্ষে, ধর্মান্ধতার বিপক্ষে, যুদ্ধের বিপক্ষে গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথ একজন উদার মানবিকতাবাদী কবি।

"