অণুগল্প

অপুষ্পক

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

মোহাম্মদ জসিম

‘অবশেষে, নিষ্ফলা বৃক্ষটিকে কেটে ফেলা হলো’Ñ একটি গল্প পড়তে পড়তে লাইনটি মাথায় গেঁথে গেল সামিরার। মনটি হু হু করে উঠলো তার। নিষ্ফলা, অকেজো গাছটি অন্তত জ্বালানি কাঠের জোগান দেবে; কিন্তু সামিরা নিজে শেষ পর্যন্ত জগৎ-সংসারে কোনো কাজে লাগবে ভেবে পায় না।

বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক। শুরুটা দারুণ ছিল। স্বামীর ভালোবাসা আর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের স্নেহ-মমতায় এক টুকরো স্বর্গ পেয়েছিল হাতে। এমনই কপাল, স্বর্গসুখ উবে যেতে সময় লাগল না, যখন জানাজানি হলো সামিরা আসলে বন্ধ্যাÑ তার সন্তানাদি হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য।

শূন্য আদতে ভারহীন হলেও চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়িয়ে তোলে শূন্যতা। শ্বশুর-শাশুড়ি আকারে-ইঙ্গিতে জানিয়ে দেয় তারা নাতি-নাতনির মুখ দেখতে উদগ্রীব। স্বামী চান সন্তান, ডাক্তার বদ্যি কবিরাজের কাছে দৌড়ান সামিরাকে নিয়ে। হতাশ হন একসময়, ভাটা পড়ে উদ্যমে।

সামিরার জগৎটি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে, সংকুচিত হয়ে আসে। একা হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। স্বামীটিও বদলে যেতে থাকে। পাতলা হতে থাকে ভালোবাসার মায়াময় বাতাবরণ। এমনকি আজকাল সঙ্গমেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে ভালোবাসার মানুষটি।

ছল-চাতুরির ফাঁদ

পেতে কিছুদিন কাছে টানা গেলেও এখন আর কাজে আসছে না

কোনো কৌশলই।

সামিরার জগৎটি এখন এতটাই ছোট হয়ে এসেছে যে, নিজের বন্ধ্যত্বই যেন একমাত্র ভাবনার বিষয়বস্তু। একা, একদম একা হয়ে শুধু নিজের ভূত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে থাকে সে। উন্মাদের মতো অভিশাপ দিতে থাকে নিজেকে।

প্রতিটি বিকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলে সে। কাঁদে। সামনের রাস্তায় স্রোতের মতো মানুষ বয়ে যায়, ভেসে যায় যানবাহন। তাদের কথাবার্তা, চিৎকার-চেঁচামেচিতে পৃথিবী বিদীর্ণ হলেও সামিরার তাতে মনোযোগ নেই। তবু মাঝে মাঝে এমনও হয়, টুকরো টুকরো ঘটনা বা দৃশ্য তাকে নিজের দিকে টেনে নেয় চুম্বকের মতো, আমোদে ভাসিয়ে নেয়।

সেই বিকালটিতে বৃষ্টি ছিল তুমুল। কতগুলো কাক ভিজে ভিজে তার স্বরে কোরাস গাইছিল। আর সেই কাকপক্ষীর ভিড়ের পাশেই ফুটেছিল সংখ্যাতীত বকুল। তার বারান্দার এত কাছে যে বকুলগাছ ছিল, যেন জানতই না এমন বিস্ময় আর মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে ছিল সামিরা। চোখের পলক পড়ে না, প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয় সে। যদি পারত সব ঘ্রাণ

শুষে নিয়ে পৃথিবীকে নিঃস্ব

করে দিত।

সামিরা ভাবে, সে যদি ফুল হয়ে জন্মাতো কতই না ভালো হতো! প্রজাপতি আর মৌমাছির দল বিনে দাওয়াতেই হাজির হতো এসে। তার স্বামীটিÑ হৃদয়ের একান্ত কাছের মানুষটি যদি মৌমাছির মতো উড়ে আসত আজ! ভাবতে ভাবতে কিছুটা মিইয়ে আসে আনন্দের রেশ।

সামিরা বারান্দা থেকে শোবার ঘরে চলে যায়। অমনোযোগ নিয়ে হাত লাগায় ঘরের কাজে, তার ভাবনাজুড়ে ফুল হয়ে জন্মানোর গল্পগাছা।

তারপর থেকে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকে। দীর্ঘদিন বাদে সামিরার স্বামী জামালউদ্দিন উন্মাদের মতো বিছানায় ছুটে আসে। তাকে ছুঁঁয়ে দেয়, খোলে। খুলতেই তার যোনি থেকে একদল প্রজাপতি উড়ে যায় যেন, বকুলের ঘ্রাণে ভরে যায় সব বিছানা। আহ্লাদিত স্বামীটি ঘ্রাণ

নেয় বকুলের।

সেই রাতে সামিরার কাছের মানুষটি উপুড় হয় তার ওপর, উপহার দেয় বীর্যবৃষ্টি। তুমুল ভালোবাসায় সিক্ত করে তাকে।

মধ্যরাত পার করে ঘুমুতে যায় তারা। শেষরাতে আধো ঘুমের মধ্যে

সামিরার দ্বিধান্বিত মন আবারও বিষণœ হয়ে পড়ে। ভাবে, এসব কি শুধু শারীরিক প্রবৃত্তির টানে ঘটেছে, নাকি সত্যি সত্যিই মুকুলিত হওয়ার সময় এসেছে তার!

 

"