গল্প

ছায়াবৃক্ষ

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

মেহেরুন নেছা রুমা

চার দিন ধরে আনিস সাহেব ঘরে ভাত খান না। স্ত্রী ফরিদা বেগমের বেড়ে দেওয়া গরম ভাতের থালাটি সামনে নেই বলে আচমকাই তার জীবনচিত্র বদলে গেছে। যেন চৈত্রের খড়ার মতো হৃদয়জমিনে হাহাকার করছে একরাশ শূন্যতা। মনঘরে করুণ বিষাদের চাদর মুড়ি দিয়ে বিলাপ করছে সুখের অনুভূতিরা।

বাড়িতে যতক্ষণ থাকেন আনিস সাহেবের হাতে দা, কাঁচি, দড়ি, কোদাল, ঝুড়ি এসবের একটা না একটা থাকেই। কাজ না থাকলেও কাজ খুঁজে নেওয়া মানুষটি যেন স্থির থাকতেই জানেন না। বিশাল বাড়ির সীমানায় যতদূর দৃষ্টি পড়ে সব সবুজে সয়লাব। এ সবুজের সমারোহ তার নিজের হাতেই গড়া। একসময় এই ভিটে ছিল মানুষের আতঙ্কের নাম। বুনো ঝোঁপঝাড়, খানাখন্দ, হিংস্র সাপ আর ভুতুড়ে তালপুকুর নিয়ে লোকমুখে ছিল নানা রকম ভীতিকর গল্প। মাত্র কয়েক বছরের যতেœ পরিত্যক্ত ভূমি এমনভাবে বদলে গেছে যে, পূর্বের চিত্রটি এখন গল্পের মতো মনে হবে।

কখনো গাছের শাখা-প্রশাখার বৃদ্ধিরোধক পরগাছা ছেঁটে দেন, কখনো ঝুঁপড়ি ডালপালার একটি-দুটি ডাল কেটে গাছের ভার কমিয়ে দেন। দু-একটি গাছ মরে গেলে আবার নতুন চারা রোপণ করেন। বলেন, আমি না থাকলেও ছেলে-বউ, নাতি-পুতিরা সারাজীবন বাড়ির ফলমুল আর শাকসবজি খাইতে পারব।

বাড়ির সামনের লাল ইটের রাস্তাটা থেকে প্রায়ই কেউ না কেউ আস্ত ইট খাবলে নিয়ে যায়। রোজ এসব দেখেন আর ওই ইটখেকো লোকদের ওপর চেচামেচি করে নিজেই মেরামত করে দেন রাস্তার খুঁতটুকু। বর্ষাকালে ভাঙা ছাতায় টুনটান আওয়াজে ঠিকঠাক করেন। কাদামাটিতে পায়ের চটিজোড়া আটকে গিয়ে ফিতে ছিঁড়ে গেলে তখনই সেলাইয়ের সরঞ্জাম নিয়ে বসে পড়েন। আলসেমি তার ধাতে নেই। দীর্ঘদিন চাকরিজীবনে তাকে কেউ কখনো স্কুলে অনুপস্থিত থাকতে দেখেনি। ক্লাসের দুর্বল ছাত্রটির খবর নিতে তিনি প্রায়ই কোনো না কোনো ছাত্রের বাড়িতে আচমকা

উপস্থিত হতেন।

তুমুল বর্ষা কিংবা সূর্যের মুখ না দেখা শৈত্যপ্রবাহেও দুই চাকার বাইসাইকেল চেপে তিনি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যেতেন। নিজের সাইকেল ছাড়া তাকে কেউ কখনো রিকশায় চড়তে দেখেননি।

সব কিছু নিজের হাতে করলেও ফরিদা বেগম বেড়ে না দিলে আনিস সাহেব ভাত খেতেন না। অন্যকে নির্দেশ দেওয়া তার স্বভাবে প্রায় না থাকলেও কেবল ভাত খাওয়ার সময় হলেই বলতেনÑ ভাত বাড়ো। গরম ভাত থালায় বেড়ে পাখার বাতাস দিতেন ফরিদা বেগম। খাওয়া শেষে স্ত্রীর হাতে বানানো এক খিলি পান মুখে পুরে আরামচে চিবোতে চিবোতে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন গন্তব্যে।

পায়ের নিচে দুটো বালিশ, দুই হাতের নিচে দুটো পাতলা কাঁথা ভাঁজ করে হাত দুটোও একটু ওপরে তুলে রাখা হয়েছে। পুরোনো অভ্য্যাসের শাড়ি ছেড়ে ম্যাক্সি পরে শুয়ে আছেন ফরিদা বেগম। খাটের পাশেই বহু দিনের পুরোনো মেহগনি কাঠের চেয়ার-টেবিল। চেয়ারে বসে দোকান থেকে কিনে আনা পাউরুটি দিয়ে নিজের বানানো চা খাচ্ছেন আনিস সাহেব। স্রুত করে শব্দ করে খাচ্ছেন। শেষ চুমুকে শব্দের মাত্রাটা আরো একটু বাড়িয়ে দিলেন। চায়ের স্বাদটা দীর্ঘক্ষণ জিভে রাখার জন্য, নাকি ফরিদা বেগমের মুঁদে থাকা চোখের পাতা খোলার চেষ্টায়, তা তিনিই জানেন।

চোখ খোলেন ফরিদা বেগম।

‘এমন কইরা কদ্দিন থাকবেন ভাত না খাইয়া?’

দৃষ্টি তার ঘরের ছাদের দিকে। সেভাবেই প্রশ্নটি করলেন স্বামীকে।

চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরে এককালীন কিছু টাকা পেয়ে সেই টাকায় ঘরের ছাদ তুলেছিলেন আনিস সাহেব। আর কিছু টাকা পোস্ট অফিসে জমা রেখেছিলেন স্ত্রীর নামে। ভেবেছিলেন তার মৃত্যুর পর ছেলেদের ওপর নির্ভর না করে ফরিদা বেগম ওই সঞ্চিত টাকা দিয়ে চলতে পারবেন। শিক্ষকতায় অর্জিত প্রায় সবটাই ব্যয় করে তিন ছেলেকে শিক্ষিত বানানোর চেষ্টায় কোনো কমতি রাখেননি। ছেলেরা স্বাবলম্বী হওয়ার আগ পর্যন্ত ভরসা ছিল তিনটে ছেলে থাকতে বৃদ্ধ বয়সে তাদের কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না। ছেলেরাও বাবা-মা বলতে মুখে ফেনা তুলত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেরা তাদের ভরসার জায়গা থেকে ক্রমশই পিছলে দূরে সরে গেছে।

ফরিদা বেগমের কণ্ঠে বেদনার নীল ছাপ শরীরের যন্ত্রণার থেকেও কম কিছু নয়। চোখের তারার চিকচিকে ভাবটা আরো গাঢ় হয়ে আসে। কিছুটা জ্বলুনিও অনুভূত হয় এবং অনবরত কারণে-অকারণে আঁখি উপচে পড়ে।

চুপচাপ পান সাজাতে থাকেন আনিস সাহেব। কুটুস কুটুস আওয়াজে সুপারি কেটে পানে চুন মেখে এক চিমটি হাকিমপুরি জর্দা ঢেলে দিয়ে চিবোতে থাকেন আরামসে। ফরিদা বেগমের খুব ইচ্ছে হয় স্বামীর পান খেতে থাকা মুখের আদলটা একটু দেখার। কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার সাধ্য তার নেই। কাঁচা সুপারি আর হাকিমপুরি জর্দার মিশ্রিত ঘ্রাণ তাকে বিমোহিত করে তোলে। চোখ থেকে টপ করে একফোঁটা জল গড়িয়ে গালটা ভিজে ওঠে তার। সেই গড়ানো অশ্রুতে মিশে থাকে নিজের অক্ষমতার বেদনা, থাকে অতীতের শত সুখের খলবলানো একখানা ছবি।

এক প্রস্থ দীর্ঘশ^াস ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে আনমনে। জীবনের অনিবার্যক্ষণ কি তা হলে

এভাবেই এসে যায়?

চার দিন আগে হঠাৎ করে মাথা ঘুরে পড়ে যান ফরিদা বেগম। উচ্চরক্তচাপ আর হাড়ক্ষয়রোগ নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই ভুগছিলেন তিনি। গ্রামের ডাক্তারের চিকিৎসায় কোনো রকম ঠেলেঠুলে এত দিন শরীরটাকে চালিয়ে নিয়েছিলেন কোনো রকম। এবার বুঝি তা একেবারেই ভেঙে পড়ল!

বড় ছেলের চাকরিজীবী বউ চাকরির অজুহাতে শাশুড়ির হাতে বানানো নাশতা খেয়ে সকালে বের হয়ে অফিস শেষে বাপের বাড়ির সমাচার জেনেশুনে অবশেষে নীড় ফেরা পাখির মতো সন্ধ্যার আগে আগে ঘরে ফিরে আসত। ঘরের সবটা যেমন পূর্বেও ফরিদা বেগমের ওপর ন্যস্ত ছিল, পুত্রবধূ আসার পরে সেই দায়িত্বের খানিকটা আরো বেড়ে গিয়েছিল। তবু মেয়ে না থাকার দুঃখ ভুলতে মেয়ে ভেবেই পুত্রবধূর অত্যাচারকে সয়ে যাচ্ছিলেন তারা দুজনেই। তবে তার প্রতি ভালোবাসাও ছিল নিখাদ।

আনিস সাহেব চাকরি থেকে অবসর নিলেও কখনো ছেলে কিংবা ছেলের বউয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না। তবু বউটা রোজ খোটা দেয়Ñ ‘কষ্টের চাকরির টাকা সব এই সংসারেই ঢালছি’। বাড়ির সবার জন্য খেটে মরে তার জীবনটা নাকি একেবারেই শেষ হয়ে গেছে। যেদিন থেকে ফরিদা বেগম বিছানায় পড়লেন, সেদিন থেকে পুত্রবধূর প্রতিটি কথায় বোমা ফেটে পড়ছে। আর সেই বোমায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন দুজন বয়োবৃদ্ধ। বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে নালিশটাও মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে দূরে থাকা ছেলেদের কানে। রোজ তাই সেলুলার ফোনে বাবা-মায়ের নামে বিচারের এজলাস বসে।

ছেলেরা বলে, তোমরা তিনজন মাত্র মানুষ বাড়িতে থাকো, তা একটু মানিয়ে

চলতে পারো না?

মেঝো ছেলে বলে, এজন্যই মুনিরা বাড়ি যেতে চায় না। মুনিরা তাদের মেঝো ছেলের বউ। বাড়ির পরিবেশ নাকি বসবাসের উপযুক্ত নয়, অশিক্ষিত মূর্খদের সঙ্গে তার প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে।

ডাক্তার বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদা বেগমকে শিগগিরই শহরে নিয়ে যেতে হবে। দ্রুত চিকিৎসা না হলে তার অবস্থা ক্রমশ অবনতির দিকে যেতে পারে। ছেলেদের কাছে সেই কথা বলার সাহস পান না মা। অনেক ভেবেচিন্তে শেষে ছোট ছেলেকে বলেন, তোর আব্বা আমারে নিয়া একা যাইতে পারব না ঢাকা। আমার তো নিজের পায় দাঁড়ানোর অবস্থাও নাই। তুই যদি একবার আসতি বাড়িতে, তাইলে তোর সাথে যাইতাম।

ছেলে বলে, আর কয়েক দিন অপেক্ষা করো মা। আমার অফিসের অবস্থা খুব একটা ভালো না। তাছাড়া বাসায় এখন কাজের বুয়া নাই। একটু গুছায়ে নেই, তারপর তোমারে যেয়ে

নিয়া আসব।

ছেলের কথায় মায়ের মুখে আর জবাব আসে না। মনের ভেতর অনেক কথা দাপাদাপি করলেও সংসারের শান্তি বজায় রাখার জন্য চুপ থাকাকেই বেছে নেন।

‘কি কয় তোমার পোলা?’

আনিস সাহেব জানতে চাইলে স্ত্রীর মুখে কোনো জবাব না পেয়ে বুঝে নেন ফোনের ওপারের মানুষটি এতক্ষণ কী বলেছিল। কয়েক মিনিট ঘরে পাঁয়চারি করে আলনা থেকে জামাটি নিয়ে গায়ে দিতে দিতে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। ফরিদা বেগম পেছন থেকে ডেকে বলেন, এই খাড়ান দুপুরবেলা আবার কই চললেন? যাবেন যখন ভাত খাইয়া যান। চাইরডা দিন ধইরা মানুষটা ভাত খায় না অথচ দেখার কেউ নাই। তোরা যখন ছোট ছিলি কোনো দিন রাইতে না খাইয়া ঘুমাইতে দেয় নাই তোদের আব্বা। ঘুমাইয়া পড়লেও উঠাইয়া কোলে বসাইয়া মুখে ভাত তুইলা দিছে।

আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন ফরিদা বেগম। যেতে যেতে স্ত্রীর শেষের কথাগুলো কিংবা কান্নার শব্দ কোনোটাই আনিস সাহেবের কানে পৌঁছে না। জীবন তাকে এক নতুন গন্তব্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

 

"