মূল্যায়ন

আড়ালযাপনের কবি মাহফুজ সজল

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

আহমেদ তানভীর

‘... খরানে খরান ঘেঁষে জানি এক দিন আগুন হেসে ওঠে। জঠরের মুক্তি থেকে; মায়ের সহন থেকে চিনে আসি এই দাহ প্রাণিত আগুন। আমাদের হে মৃত অঙ্গীকার জাগোÑ আসন্ন ফাগুনবনে তৃষ্ণায় ভরে আসো আরো আরো রুপালি খরান...। ... প্রেমের হৃদোত্তাপে কোনোকালে টেকে নাই ডাইনোসরÑ যত শোষণের আচম্বিত জানোয়ার।...’ [গুমর]

এইটুকু কয়েকবার নিবিড় পাঠ, অতঃপর কিয়ৎক্ষণ মৌনতার ঘোর! পাঠকমন আচমকা সোল্লাসে বলে ওঠেÑ এই-ই তো কবিতা, এই-ই তো সময়প্রবাহের প্রকৃত সমীকরণ।

এ সময়ের প্রতিভাধর তরুণ কবি ও সাহিত্যবিশ্লেষক মাহফুজ সজল। নিজস্ব আড়ালবাসে থেকে নীরবে-নিভৃতে তার অবিরাম লিখে চলা; পোক্ত কাব্যসৃষ্টির এ ধারাবাহিকতার গভীরে দৃষ্টি দিলেÑ ঠিক কত দিন ধরে এ রকম লিখে চলেছেন কবি সজলÑ অনুমান করা শক্ত। তালিয়াসর্বস্ব কবি আড্ডায় তাকে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় না তথাকথিত সাহিত্যগোষ্ঠীর লেজুড়বৃত্তিতে কিংবা তৈলমর্দনের বিনিময়ে কাগজে লেখা প্রকাশে, সুতরাং হালের সাহিত্যকর্মীরা তাকে চিনবেন নাÑ এটাই বরং যৌক্তিক।

কবি সজলের কবিতার সবচেয়ে বড়ো শক্তি হচ্ছে ‘প্রাণময়তা’। পড়তে পড়তে মনে হয়Ñ শব্দে শব্দে কথা বলছেন নিজের মতো করে; কখনো স্বগতোক্তি আবার কখনো গভীর আত্মদর্শন ছুড়ে দিচ্ছেন সমগ্র মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করেÑ

‘অন্নের চেয়েও মানুষ মনের মতো স্বাধীনতা চায়; পছন্দ-অপছন্দের, নোট ও নেট, ভোট ও ব্যালট, সঞ্চিত ভল্ট, রায় ও হায় হায় সমগ্র জারির।’ [খুনপিয়াসা]

দৈনন্দিনকার শব্দ, নিজস্ব নির্মোহ ভঙ্গি আর কী সুন্দর কাব্যশৈলীতে তুলে এনেছেন চলমান বাস্তবতার স্বরূপ!

যাপিত জীবন, ঘাত-প্রতিঘাত, প্রেম প্রেম সৌরভ, বিরহদহন, ধর্মাধর্ম, শূন্যতা, বোধের দোলাচল, সত্যচেতনার দৃঢ়তা প্রভৃতি সজলের লেখার উপজীব্য। দেখার চোখ তীক্ষè বলেই হয়তো তার কবিতারা যতটা প্রাণবন্ত, ঠিক ততটাই নিরীক্ষাধর্মী। কিছু লাইন উদ্ধৃত না করলেই নয়Ñ

‘একবাহু প্রেম দিয়ে একবুক ছুড়ে দাও ঘৃণা/হায় মানুষ, তোমার মনের মোচড় বুঝি না!’

[দ্বিচারণ পন্থে]

‘দেখি রোদ ফোটানির বালু তির্যক ক্রোধে হয় খাঁড়া/আলোর লাটিমে ঘুরে স্থিতি সই সন্ধ্যার তারা/মাতাল বেসাতি লৈয়া অমীমাংসা তোমারে ডাকিলো?/জগৎ ভ্রমি পিপীলিকা আমি বন্ধু সাবধানে পা ফেলো।’ [মধুত্থবর্তিকামিতি]

‘এখানে মনের চোখ খেয়েছে টাকার গুদাম/চোখ বুজলেই দেখি ভুলভাল আগুনের পাড়া/জীবনেও ঘুম আসে না।’ [ঘুম নেই]

‘আলো-অন্ধকার বলে কিছু নেই সকলই আলো/আলো-অন্ধকার বলে কিছু নেই সমস্ত অন্ধকার/ভারসাম্যহীনতা এঁকে গ্যাছে লোকের সমাজ-/বিকৃতির শীর্ষদেশে সমাদৃত আছি বিকল ভুবনের চাকা/পূজায় ভক্তিতে পা-চাটায় নমস্কারে/মনহরির হৃদয়-নমাজ!’ [ক্ষরণ ও আলোকিত অন্ধকার]

‘আমরা অহেতুক মুখোশে প্রচেতার সাজ ধরি;/হৃদয়ের নকশিকাঁথা ছেড়ে মগজের কম্বল নাড়ি/আর যত কথা কই মোটাদাগে অপরিণামদর্শিতা।/তাহারে বুঝায়া বলো, কেন সে এখনো মানে নাÑ/মানুষ বিনয়সুন্দর কারণ মানুষই অহমিকার খাতিরে মাপজোকহীন আহাম্মক।’ [নামগোত্রহীন প্রণতি]

এইসব কবিতার ছত্রে ছত্রে নির্দ্বিধ কবি মাহফুজ সজল অবলীলায় বিবৃত করে গেছেন আলোর জঠরে কালে কালে বেড়ে ওঠা অন্ধকারের গল্প। সহজিয়া ভাষায় দেখিয়েছেন দারুণ মুনশিয়ানা। আলো আলো আকাশে আঁধারপাখি ডানা মেলে যেইমাত্র তাবৎ স্বপ্নকে ঢেকে দিতে চায়, তখনই উন্মোচিত হয় কবি সজলের সচেতন রূপ; স্বদেশচেতনায় দৃপ্ত এক প্রেমিক কিংবা আঁধার-ঠেকানো বেপরোয়া দ্রোহীর অবিচল চেহারা ধরা পড়ে নিমিষেই-

‘প্রতিক্ষণে প্রতিবাদ প্রতিপল চিৎকারে বলে দিয়ে বাঁচি/ধর্ষণ রাষ্ট্রসিদ্ধ বিচারহীনতা চলার অভয় কত যাচি!’ [শিরোনামহীন : তানিয়াকে ধর্ষণ ও

হত্যার প্রতিবাদে]

‘আমি আজ আকাশভুক লেলিহান শিখা হয়ে জ্বলেছি। মৃত্যুর কৌমার্য দিয়ে আমাকে পারলে ঠেকাও।’ [সহজের ওঙ্কার]

‘তোমার বুকের ঘ্রাণÑ/সুদূর-খরচা, অমৃত নিঃশ্বাস মধুÑ/শান্তির সুধা- মরমী জীবনাবেশ/ভালোবেসে নাম করিÑ ‘মনের ভ্রমর’/ও আমার প্রিয় বাংলাদেশ।’ [মনভ্রমর]

জীবনঘনিষ্ঠ ভাবনার কবি সজলের ভেতরে কখনো কখনো খেলা করে এক গোপন কারিগর, যে নিবিড় মমতায় সজলকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় কিছু নান্দনিক গীতিকবিতা তথা গানের কলি। ফলে গীতিপ্রবণতার অনুভবে তিনি লিখতে থাকেন এমনতরো গীতিকবিতাÑ

‘সাধা রূপ যদি মুছো প্রিয় অতি/স্বরূপের পাখি সে তো হারাবে/হারাবে সুরের হাওয়া প্রীতি/তুমি আজÑ কী আকাশ ভুলো/এ বুকেই লিখে যাওয়া উড়ালের পাখনা ছিঁড়ে।’

অথবা

‘সব সাজ পেয়ে তবু সে তো বহেনি/কেন বহেনি সুরের দখিনা/ভালোবাসিয়া বাসিয়া কেন দূরে থাকা মিছে হোলো না/মন যাচিয়া যাচিয়া বাড়ায় কেন তোমার কুহক কামনা।’

এভাবেই মুক্তোদানার মতো জ্বলজ্বলে কাব্যসম্ভার উপচে পড়ে সজলের উদাত্ত হৃদয় বেয়ে। অথচ আজ অবধি কোনো লেখা তার যুগল মলাটের বাসিন্দা হয়ে হাঁটতে শুরু করেনি পাঠকের আঙিনায়। নিকট আগামীতে আড়ালযাপনের কবি মাহফুজ সজলের কাব্যসন্তানেরা গ্রন্থিত হয়ে আলিঙ্গন করবে নিবিষ্ট পাঠকের পাঠতৃষ্ণাকে, এমন পবিত্র প্রত্যাশাসহ কবিকে অশেষ ভালোবাসা।

 

 

"