আহসান হাবীব

প্রকৃতি, প্রেম ও জীবনবোধের কবি

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

বাংলা কাব্য সাহিত্যে একটি অনিবার্য নাম আহসান হাবীব। মৃদুভাষী কবি হিসেবে সাহিত্য অঙ্গনে সুপরিচিত ছিলেন। সমকালীন কবিদের মধ্যে অত্যন্ত বিনয়ী ও ভদ্রলোক হিসেবেও সমাদৃত। ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। একাধারে কবি, সাংবাদিক এবং খ্যাতিমান সাহিত্য সম্পাদক। আহসান হাবীব কবিতায় নির্মাণ করেছেন স্বদেশলগ্নতা, জীবনঘনিষ্ঠতা, মানবিক বেদনাবোধ, প্রেমানুভবের উৎসারণ, নিজস্ব আত্মজৈবনিক কাব্যশৈলী। নিজস্ব কাব্যশৈলীর আধুনিকতার সঙ্গে রবীন্দ্র-নজরুল যুগের কাব্যকলার সংমিশ্রণে দেশ ও জীবনবোধের সাহচর্যে নতুন আধুনিক কাব্য আন্দোলনের সূচনাক্রম উদ্ভাসিত হয়েছে আহসান হাবীবের রচনাকর্মে। তাইতো আহসান হাবীব শুধু আমাদের প্রকৃত আধুনিক কবি নন, উত্তরাধুনিকতার এক পথপ্রদর্শক। কারণ তিনি কবিতায় তুলে ধরেছেন সমকালীন ইতিহাস, সমাজ, জীবন বাস্তবতা, কাব্য নিরীক্ষা, ঐতিহ্যের নবরূপায়ণ, দার্শনিকতার নতুনবোধ ও শিল্পরীতি। কবি হুমায়ুন আজাদ এক মূল্যায়নে যথার্থই বলেছেনÑ ‘আহসান হাবীবের কবিতাই আমাদের আধুনিকতা চর্চার প্রকৃত সোপান তৈরি করেছে। তিরিশের কবিরা কবিতায় যে রবীন্দ্রোত্তর ধারা প্রবাহিত করেছেন, আহসান হাবীব তাতে অবগাহন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে আহসান হাবীব তার রচনাকর্মে আশাবাদ, সচেতনতা, ভাষাশৈলীতে আধুনিকতার সংজ্ঞাকে মুক্ত ও সম্প্রসারিত করেছেন। কবি হিসেবে বরেণ্য কেবল আমাদের কাছে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কারণে নয়, তিরিশোত্তোরকালে আবির্ভূত তিনিই আমাদের শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবিদের একজন।’

১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি আহসান হাবীব পিরোজপুরের (সাবেক বরিশাল জেলার) সংকরপাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পিতা-মাতার ১০ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম সন্তান। বাড়িতে একটি পাঠশালা ছিল, সেখান থেকেই তার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। সেসময় তার বাড়িতে ছিল আধুনিক সাহিত্যের বইপত্র ও কিছু পুঁথি। যেমন আনোয়ারা, মনোয়ারা, মিলন মন্দির প্রভৃতি। এসব পড়তে পড়তে একসময় নিজেই কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করেন। সাহিত্যের অনুকূল পরিবেশ নিয়ে পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ১৯৩৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ভর্তি হন বরিশালের বিখ্যাত বিএম কলেজে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কলেজের পড়াশোনার পাঠ শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত রাখতে হয়। বিএম কলেজে দেড় বছর পড়ার পর ১৯৩৬ সালের শেষার্ধে কাজের খোঁজে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান। এভাবেই কবি আহসান হাবীবের বরিশাল থেকে তৎকালীন কলকাতায় পদার্পণ। স্কুলে পড়াকালীন থেকেই তার কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘মায়ের কবর পাড়ে কিশোর’ তার প্রথম মুদ্রিত রচনা। বাইরের পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘প্রদীপ’ বের হয় শরিয়তে ইসলাম পত্রিকায়। এরপর তার কবিতা কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকা যেমনÑ দেশ, মাসিক মুয়াজ্জিন, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী, সাপ্তাহিক হানাফফতে প্রকাশিত হয়।

তার প্রকৃত জীবনসংগ্রাম শুরু হয় কলকাতায়। সেখানে অবস্থানকালে তকবীর, দৈনিক আজাদ, দৈনিক কৃষক, মাসিক সওগাত, দৈনিক ইত্তেহাদ ও আকাশবাণী বেতারে চাকরি করেন। কলকাতায় মেসবাড়ির দুর্বিষহ জীবনের মধ্যে তিনি সময় বের করে নিভৃতে কাব্যচর্চা চালিয়ে গেছেন। জীবনের ওই চরম মুহূর্তের মধ্যেও ফলিয়েছেন কবিতার সোনার ফসল। বাংলা কবিতার ভুবনে যুক্ত করেছেন এক হিরন্ময় অধ্যায়। আমাদের এই বাংলায় উত্তরাধুনিক যুগ আর পথ নির্মাণে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন আহসান হাবীব। তখন কবিতার পাশাপাশি উপন্যাস, গল্প, শিশুতোষ রচনা, অনুবাদ, প্রবন্ধ, নিবন্ধ এবং স্মৃতিকথাও লিখেছেন। আহসান হাবীব কলকাতায় ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। বলতে গেলে তার সাহিত্যচর্চার স্বর্ণযুগ ছিল ওই সময়। বিশেষ করে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এক দশক তিনি নিরলসভাবে লিখে গেছেন। জীবনের অধিকাংশ সেরা বিখ্যাত কবিতা ও গল্প লিখেছেন ওই সময়েই। কবি খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করেও আহসান হাবীব তার অন্যান্য রচনাতেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রি শেষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে। এ কবিতাগুলো তিনি রচনা করেন জীবনের গভীর দুঃখ-কষ্টের দিনগুলোতে। চারপাশের মানুষ, সমাজ, সমকাল, বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবন সংগ্রাম, স্বপ্ন, প্রাপ্তি, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ও শ্রেণিবৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এসবই তার কবিতার পটভূমি হয়ে ওঠে। যুগ সচেতন, সমাজ সচেতন কবি সমাজে বেড়ে ওঠা ধনতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শ্রেণি আর তাদের সুষ্ঠু সামাজিক অসাম্য উপলব্ধি করেন গভীরভাবে। তিনি বৈষম্যের শিকার মানুষের অন্তর্বেদনা শিল্পিত রূপে মূর্ত করে তোলেন তার কবিতায়। তিরিশের ভাবধারায় লালিত হয়েও কবি তার মানসলোকে লালন করেছেন সংযমের বর্ণিল নকশিকাঁথা। তাই তার কবিতায় রুদ্রতা, হুঙ্কার, ঝংকার নেই। এক স্নিগ্ধ কোমল নীরব বেদনা, নিঃশব্দ আর্তি রোমান্টিসিজমের মোড়কে তার কবিতা রন্ধ্রে রন্ধ্রে বহমান। প্রকৃতির নিবিড় সখ্য মানুষের দোলাচল দগ্ধ জীবনকে আহসান হাবীব কবিতায় তুলে এনেছেন আপন দক্ষতায়। সেখানে শিল্পসুষমা অকৃপণভাবে দান করতে ভোলেননি তিনি। তার কবিতা হতে পেরেছে তাই বাতাসের মতো বেগবান। সমকাল, সমকালের মানুষ আহসান হাবীবের কবিতায় অনিবার্যভাবে উঠে এসেছে। সহজাত রোমান্টিকতা বাস্তবতার মিশেলে আহসান হাবীবের কবিতাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে।

রাজনীতি আহসান হাবীবের কবিতায় সচেতন মানসভূমির উচ্চারণ হিসেবেই এসেছে। সেখানে শিল্পের দায়-দাবি পূরণে তিনি ছিলেন নিখুঁত যতœশীল। কোনো ধরনের বাহুল্য, পক্ষপাতিত্ব, কূপম-ূকতা সেখানে জায়গা পায়নি। মানুষের মৌলিক মানবাধিকার এবং সৌন্দর্য চেতনা সেখানে নতুন মাত্রা পেয়েছে। ওই প্রখরতায় উজ্জ্বল হয়ে সময়কে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন আহসান হাবীব। এখানেই তিনি উজ্জ্বল আলোকিত ঝলমলে। জীবন ও প্রকৃতি একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে আহসান হাবীবের কবিতায়। কদাকার জীবন ভাবনার শিল্পিত ভাষ্য হচ্ছে তার কবিতা। বলা যায়, ‘ধন্যবাদ’ তার একটি সামাজিক বৈষম্যপীড়িত চিত্রবাহী কবিতা। উনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য প্রভাবে গড়ে ওঠা শহুরে এলিট শ্রেণি এবং তাদের জীবনযাপনে এ দেশের অগণিত সাধারণ মানুষ ধরাছোঁয়ার বাইরে, যে জীবনের খবর সাধারণ মানুষ জানে না। কিন্তু যখন জেনে যায়, তখন তারা নিঃশব্দে বেদনায় বিবর্ণ হয়। সমাজের এ বৈষম্য কাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং কেন? এর জবাব আসলে তাদের কাছে নেই। আহসান হাবীব অসাধারণ শিল্প কুশলতায় এক কেরানির জবানিতে তুলে ধরেছেন। বৈষম্যপীড়িত সমাজের এক মর্মান্তিক আলেখ্য।

আহসানে হাবীব বৈরী ও প্রতিকূল পরিবেশের প্রসঙ্গ অনুষঙ্গকে তার কবিতায় তুলে আনতে পেরেছেন চমৎকার কুশলতায়। সব রকম শোষণ-জুলুম, দুঃশাসন নির্যাতন তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। এসবকে দেখেছেন মানবিক ঔদার্য্য দিয়ে, অন্তরঙ্গ আলোকের নিভৃত ভূগোলে তিনি সময়ে ও অসময়ে মানুষকে জর্জরিত হতে দেখে ব্যথিত হয়েছেন, দুঃখের পঙ্ক্তিমালা সাজিয়েছেন ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’। আমাদের প্রিয় ধরণিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদের করাল ছায়া গ্রাস করেছে। তা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন এবং মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে কলম ধরেছেন। সময়ের প্রতিবন্ধকতা আহসান হাবীবকে বিচ্যুত করেনি আপন পথ থেকে। বরং করেছে সময় সচেতন, দায়িত্ব সচেতন। সময়ের কথাকে তিনি তার কবিতায় এনেছেন আঙ্গিকের ভিন্নতায়। আহসান হাবীব আমৃত্যু উত্তরণের এক একটি ধাপ পেরিয়ে তিনি আশির দশকের কবিদেরও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েই তারুণ্যে উজ্জ্বল ছিলেন। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পরিসরে বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ তথা অভাব-অনটন, দারিদ্র্য অবনতি ঘটায় সব কিছুর, বিশেষত নৈতিকতা, শালীনতা ও মানবতার। জীবন হারায় জীবনের বৈশিষ্ট্য। আহত পঙ্গু জীবনের এই ব্যর্থতা-হাহাকার তার কবিতায় স্থান লাভ করেছে। এজন্য অনেক সমালোচক তাকে হতাশার কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এ প্রসঙ্গে আহসান হাবীব নিজেই লিখেছেনÑ ‘আমি বুঝি না যেখানে হেরে যাওয়ার পালা, সেখানে খামোখা জিতিয়ে দিয়ে আত্মপ্রতারণায় কী লাভ? আমরা কি মনে রাখতে পারি না, এই হারাই সমাপ্তি নয়। বরং জয়ের ইঙ্গিত এখানেই আমরা কি মনে রাখব না, বারবার হেরে গিয়ে জয়ের যে নেশা আমাদের ক্রমান্বয়ে নতুন নির্মাণের কৌশল জোগায় তারই নাম জীবন।’

দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন। ফিরে এসেই দৈনিক ইত্তেফাকে সাহিত্য পাতা সম্পাদনা শুরু করেন। পাশাপাশি সম্পাদনা করেন সাপ্তাহিক প্রবাহ। একসময় ‘কথাবিতান’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থাও গড়ে তোলেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় তারই প্রকাশনা থেকে। অবশেষ ১৯৬৪ সালে যোগ দেন তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে, যা পরবর্তীতে দৈনিক বাংলা নামে রূপান্তরিত হয়। মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত তার জীবনের দীর্ঘ ২১ বছর সময় অতিবাহিত হয়েছে দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে। তিনি আগাগোড়া তার আদর্শ ধরে রেখেছিলেন নিপুণ মর্মশৈলী এবং একনিষ্ঠতার মধ্য দিয়ে। তার সময়ের তরুণদের কাছে তিনি ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। আহসান হাবীবের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৮টি। অন্যান্য লেখাসহ সব মিলিয়ে তার গ্রন্থের সংখ্যা ২৫।

বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান মৃদুভাষী কবি আহসান হাবীব ৬৮ বছর বয়সে ১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই আমাদের ছেড়ে চলে যান। তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলা কাব্য সাহিত্যে আহসান হাবীব সমকালীন কবিদের মধ্যে অন্যতম প্রধান কবি হতে না পারলেও একজন জনপ্রিয় কবি হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

 

"