আবুল হোসেনের কাব্যদর্শন

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০১৯, ০০:০০

বীরেন মুখার্জী

আবুল হোসেন (১৯২২-২০১৪) চল্লিশের দশকের প্রাণ-প্রাচুর্যময় কবি হিসেবে চিহ্নিত। কবিতাকে মানুষের দৈনন্দিন মুখের ভাষার কাছে টেনে এনে তৎকালীন কবিতায় যে নতুন বীজ তিনি বপন করেছিলেন, তা কালক্রমে তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে। ‘ত্রিশোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার যে ধারা উত্তরকালের কবিদের হাতে বিকশিত হয়েছিল, আবুল হোসেন ছিলেন সে ধারার সফল উত্তরাধিকারী। জীবনদৃষ্টি ও কাব্যভাষা দিয়ে তিনি আমাদের যুক্ত করেছিলেন আধুনিকতার সঙ্গে’Ñ আবুল হোসেন ও তার কবিতা সম্পর্কে কাব্যবোদ্ধাদের এই বিশ্লেষণ অগ্রাহ্য করা যায় না। আবার অনেকে মনে করেন, ‘বাঙালি মুসলমানের বাংলা কাব্যচর্চার আধুনিকতার ঊষালগ্নটি দুর্দান্তরূপে স্পর্শ করেছেন তিনি। প্রকৃতি বিচ্ছুরিত রোমান্টিক রং কবির বিশ্বাস ও শিল্পোৎকর্ষের সঙ্গে যেন এক রথে মিলেছে।’ আবুল হোসেনের কবিতা নিয়ে কিছু বলতে গেলে উপর্যুক্ত কথাগুলো আপনাআপনি উচ্চারিত হয়। নিজের কবিতাচর্চা সম্পর্কেও আবুল হোসেন বলেছেন, ‘আবেগ হচ্ছে কবিতার প্রথম উপকরণ। হৃদয়ে আবেগের তোড় না থাকলে কখনো কবিতা হয় না। কিন্তু সেই আবেগ যাতে কবিকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে না পারে সে সম্পর্কে কবিকে সব সময় সাবধান থাকতে হয়। সেখানেই তার শিল্পকর্ম। আমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কবিতা লিখি না, আমি সেন্টিমেন্টের বিরোধী নই, সেন্টিমেন্টালিটির বিরোধী। তাকে সত্যিই ভীষণ ভয় পাই।’ আবুল হোসেনের কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে পাঠক সেই আবেগরহিত শিল্পেরই সন্ধান পান, যে শিল্প শুধু শিল্পের জন্য সৃষ্ট নয়। বস্তুত তার কবিতা সার্বিকভাবে যাপনের খুব কাছে দাঁড়িয়ে জীবনকে নানাভাবে অবলোকনের সুযোগ করে দেয়।

আবুল হোসেন কবিতাকে ‘মানুষের জীবনের বসন্ত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘কবির কাছ থেকে বসন্ত কোনো দিনই চলে যাবে না।’ কবির প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘নববসন্ত’-এ (১৯৪০) সূচিভুক্ত কবিতা থেকেই এর প্রমাণ মেলে। এ বইটির সমালোচনা বেরিয়েছিল মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের ‘সওগাত’-এ। এ ছাড়া গোলাম কুদ্দুস, হুমায়ুন কবিরের ‘চতুরঙ্গ’, বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’, ‘কৃষক’, ‘রূপায়ণ’, ‘নিরুক্ত’ এবং সলিমুল্লাহ হল বার্ষিকীতে। লিখেছিলেন তৎকালীন নামি লেখকরা। জানা যায়, কাজী নজরুল ইসলামও এই বইটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন। তবে নজরুলের মন্তব্য আবুল হোসেনের কবি স্বভাবকে সমর্থন করে নয়। ‘নববসন্ত’ সম্পর্কে ব্যাপক সমালোচনা ও মন্তব্য থেকে অনুমান করা যায়, বাংলা কবিতায় আরেকটি পালাবদল আসছে যার আভাস সে সময়ের সাহিত্যরসিকরা পেয়েছিলেন।

চল্লিশের দশকে কবিতায় দুল্যমান রাজনৈতিক প্রবণতার সুস্পষ্ট ছাপও পাওয়া যায় আবুল হোসেনের কবিতায়। এ ছাড়া কবিতার আঙ্গিক সংগঠনের জন্য তাকে পাওয়া যায় একজন ছন্দ নিয়ে নিরীক্ষক হিসেবে। তিনি কবিতার অন্তমিলে এনেছেন সূক্ষ্ম চমক; মধ্যমিল এবং লুকোনো মিলেও তার নৈপুণ্য অন্যদের থেকে আলাদা। আর বিষয়বস্তুর দিক থেকে, ‘সংবেদন ও অভিজ্ঞতা আবুল হোসেনের কবিতার মূলধন। এই অভিজ্ঞতাকেই অগ্রজ কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কবিতায় সর্বাধিক মূল্য দিয়েছিলেন’Ñ আবদুল মান্নান সৈয়দের এ মূল্যায়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিরিশ পরবর্তী বাংলাদেশের কবিতায় নিজস্ব একটি রীতি আবুল হোসেন নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে আয়ত্ত করতে সক্ষম হন। আবেগি কল্পনাকে পাশ কাটিয়ে বিশ্লেষণজাত মনোভঙ্গিতে তিনি গড়ে তুলেছেন স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। কবিতাকে ফরমাল না করে, মানুষের কাছে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচরণে পৌঁছে দিতে পেরেছেন তিনি। যে কারণে তার কবিতায় প্রয়োগকৃত শব্দ হয়েছে গভীর এবং বাকপ্রতিমায় তৈরি হয়েছে বাড়তি ব্যঞ্জনা। কবিতাকে তিনি এমন ভঙ্গিমায় প্রতিস্থাপন করেছেন, এমন একটা ভাবের আবহ দিয়েছেন, যা তৎকালীন বাংলা কবিতায় ছিল অনুপস্থিত। বলা যেতে পারে, আবুল হোসেনের কবিতা পৃথকভাবে শনাক্ত করতে পারার এও একটি বড় কারণ।

একজন প্রকৃত কবিকে নিজস্ব ভাষাশৈলী তৈরির জন্য সাধনা করতে হয়, আবুল হোসেন দীর্ঘ কাব্যজীবনে এ সাধনায় নিয়োজিত থেকেছেন। অপরিমেয় পরিশ্রম ও কৌশলী কাব্যভাবনার পাশাপাশি তিনি আত্মমুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছেন কবি সমর সেনের অনুসৃত পথে। তিনি স্বীকারও করেছেন, ‘আমার মনে হলো, আমি কবিতা শিখব সেই ভাষায়, যে ভাষায় মানুষ কথা বলছে হাটবাজারে, ড্রয়িংরুমে। যে কারণে আমি সমর সেনকে বড় কবি বলি, সেটা হচ্ছে গদ্য কবিতা, এই গদ্য কবিতায় যে ছন্দরস থাকতে পারে, সেটা এনেছেন সমর সেন। আমি সমর সেনের কাছে এটা শিখেছি।’ (কালের খেয়া, ১৫০ সংখ্যা, ২৯ আগস্ট, ২০০৮)। আবুল হোসেনের গদ্য কবিতা পাঠে এর প্রমাণ পাওয়া যায়Ñ ‘আজকের দিনে রান্নাঘরের অন্ধকারের মাঝে/যে মেয়েরা বসে চীনে বাসন মাজে/মশলা পিষতে চোখ ভরে আসে জলে/তাদেরো অন্ধ জীবনের তলে/উঁকিঝুঁকি মারে রাজকুমার। পেঁয়াজ কাটার ফাঁকে/মনের গহনে রবিঠাকুরের একটি লাইন হয়তো চিত্র আঁকে/হয়তো কখনো মনে তোলে দোলা/ শেলির একটি কবিতা, আত্মভোলা/ কীটসের অমর ওডগুলো/ হয়তো পথের ধুলো/সংবাদ আনে রাজকুমারের আগমনের সুপ্ত মনের/আড়াল দেওয়া পর্দাটা যায় ফেঁসে/একটি নিমিষে। (‘আমরা : বাংলার মেয়ে’, নববসন্ত)

আবুল হোসেন কবিতার শব্দে, ছন্দে, উপমায় তৎকালীন যুগযন্ত্রণার সর্বৈব তুলে ধরতে সচেষ্ট থেকেছেন। মানুষের মুখের ভাষার অনুবর্তী হয়ে কতটা সাধারণ ভাষায় কবিতা সৃজন করা যায়, সেদিকে মনোযোগী হয়েছেন। আর এটাই আবুল হোসেনের আধুনিকতা। তার ভাবনা ও বয়ানে অস্পষ্টতার ছাপ নেই। যাপনের প্রাজ্ঞতার সঙ্গে শিল্পচৈতন্য জুড়ে দিয়ে তিনি কবিতাকে করে তুলেছেন উন্মুক্ত ও গভীর। কবিতার নিয়ম সর্বস্বতা এড়িয়ে তিনি ভাষাকে করেছেন প্রাঞ্জল ও অনাড়ম্বর। আবুল হোসেনের কবিতাসৌধ তার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। তাই তার কবিতা একদিকে আনন্দের, অপরদিকে আবেশেরও। ‘ঐতিহ্যসংলগ্ন আধুনিক চিন্তার তীর্থযাত্রী কবি আবুল হোসেন জনতার স্তর থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি। হননি সমাজ বাস্তবতা থেকেও বিচ্যুত। তিনি ঐতিহ্যকে ধারণ করে পুরানের নবতর উত্তরণ ঘটান।’ কবি জনতার দীপ্ত মিছিলেই নবযুগের রক্তাক্ত ঘোষণা দেনÑ ‘জেনেছি সত্য বহুদিন মনে মনে/মুক্তির পথ মিশে আছে জনগণে,/যেখানে লক্ষ লোকের রুক্ষ হাত/সৃষ্টির মাঝে নিয়োজিত দিনরাত/সেই জনতার দীপ্ত মিছিল ধরে/নবযুগ আসে রক্ত দিনের ভোরে।

কবি আবুল হোসেন ঐতিহ্যের শিকড়ে আধুনিকতার প্রলেপ লাগালেও তিনি সমাজ সচেতন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সমাজ কিংবা সমাজের অন্তরভাগকে এড়িয়ে যাননি। কবিতার গূঢ়তা দিয়ে উপলব্ধি করেছেন অতল অন্ধকারে ডুবে থাকা মনুষ্যত্ব। তিনি ধর্ম, রাজনীতি, প্রেম, নারী, নিসর্গÑ জীবনের ব্যাপক অনুষঙ্গের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন কবিতায়। আর তাই কবিতায় উপজীব্য করেছেন মানুষ ও মানবিকতা। যেকোনো কবির কবিতার বড় একটি অংশে কবির ব্যক্তিগত জীবন, আবেগ-অনুভব এবং অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন ঘটা অমূলক নয়। আবুল হোসেনের কবিতায়ও হয়তোবা তার ব্যক্তিগত জীবনের ছাপ থাকতে পারে। কিন্তু কবিতায় যে তিনি বিরলপ্রজ, সে বিষয়ে সন্দেহ পোষণের সুযোগ নেই। তিনি সংযত-রুচিশীল শিল্পবোধের পরিচয় দিয়েছেন। তার কবিতা পাঠ করলেই বোঝা যায়, তিনি জীবনের দুঃসহ বাস্তবতাকে আত্মস্থ করেই কবিতা রচনা করেছেন। তবে যাপিত জীবনের প্রাত্যহিকতায় তিনি ক্লান্ত হননি। জীবনের নিঃসঙ্গতা ও দুঃখের অনুভূতি জীবনেরই রূপকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কবিতার ভেতরে তিনি সময়ের বিচূর্ণ বাস্তবতার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। তার স্বাতন্ত্র্য, সততা ও সমাজসচেতনতা এবং আধুনিক জীবনদৃষ্টি সমকালীন কবিদের পথচলায় প্রেরণা জোগাবে নিশ্চয়। ফলে সার্বিকভাবে আবুল হোসেনকে ‘একজন অনুভবি দ্রষ্টা ও অন্তরঙ্গতম কবি’ বলা দোষের

হতে পারে না।

 

"