মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার নারী

আঞ্চলিক ইতিহাসে নতুন সংযোজন

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৯, ০০:০০

খন্দকার জাহাঙ্গীর হুসাইন

গ্রন্থটিতে মুক্তিযুদ্ধের ৪৭ বছরের মৌখিক ইতিহাসকে লিখিত ইতিহাসে রূপ দিয়ে আঞ্চলিক ইতিহাসে নতুন সংযোজন করেছেন গবেষক ইমাম মেহেদী। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার কয়েকজন মহীয়সী নারীর ত্যাগ, তিতিক্ষা ও বীরত্বগাথা অবদানের কথা লিখেছেন ইমাম মেহেদী। গবেষক গ্রন্থটির নামকরণ করেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার নারী’ শিরোনামে।

গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছেন বিগত সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী ও জনপ্রিয় অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর। ভূমিকার মধ্যে তিনি উল্লেখ করেছেনÑ ‘এই নারীগণের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন, তাদেরই কয়েকজন বীর নারীর সাক্ষাৎকারভিত্তিক ইতিহাস রচনা করে ইতিহাস-ঐতিহ্য অনুসন্ধানী গবেষক ইমাম মেহেদী আমাদের সবারই কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন বলে মনে করি। তার এ কাজে আর সামান্য বিলম্ব হলে এই বীর নারীদের অনেকেই গৌরবের বিস্মৃত ইতিহাসে পরিণত হতেন।’

ইমাম মেহেদী একাধারে একজন সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক। সাংবাদিকতায় পেশাগত জীবনের একপর্যায়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা রয়েছে। অন্তরের আলোড়নে নিজেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনুসন্ধানের। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে যেসব বীর নারী যোদ্ধা আমাদেরকে ঋদ্ধ করেছেন তাদের কথা তুলে ধরলেন আলোচিত গ্রন্থের মাধ্যমে। লেখক তার বক্তব্যে লিখেছেনÑ

‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সূর্যের উদয়গিরি ও রণাঙ্গন কুষ্টিয়া। নর হত্যাকারী পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতি ধারণ করে আছে এই কুষ্টিয়ার জনপদ। তবে সেই সঙ্গে উল্লেখ্য, এই গ্রন্থে আলোচিত এই জনপদের কয়েকজন বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে গৌরবোজ্জ্বল অবদান রেখেছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের প্রতি অবহেলা এবং উপেক্ষা প্রদর্শিত হয়েছে। এই রচনায় সেই অকৃতজ্ঞতা মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।’

তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে কুষ্টিয়া শহর কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে ছুটে বেড়িয়েছেন গবেষক একেবারে একক উদ্যোগে। কারো পৃষ্ঠপোষকতার ধার ধারেননি তিনি। গবেষক তার চেতনা বোধের কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এটি তার ঐকান্তিক দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। লেখক গ্রন্থটির শুরুর দিকে সংক্ষিপ্তভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ, কুষ্টিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ও তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ধারাবাহিকভাবে একাত্তরের রণাঙ্গনের সাহসী এগারোজন নারীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেনÑ আরজুমান বানু, লুলু-ই ফেরদৌস, লুলু-ই জান্নাত, রাবেয়া খাতুন, মোমেনা খাতুন, দোলজান নেছা, এলেজান নেছা, মাছুদা খাতুন, শাহানা আক্তার চৌধুরী ও মমতাজ আরা বেগম রুমী এবং রওশন আরা বেগম নীলার জীবনী। এগারোজনের মধ্যে নয়জনই গেজেটভুক্ত।

গ্রন্থটি পাঠ করলে পাঠক তৃপ্ত হবেন এই কারণে যে, লেখক এসব বীর নারী যোদ্ধার যুদ্ধকালীন নানা স্মৃতি ও শ্রুতি লিখেছেন। সন্নিবেশিত করেছেন তাদের পরিবার-পরিজনের একাত্তর থেকে বর্তমান জীবনযাপনের সুখ-দুঃখের খুঁঁটিনাটি।

মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার নারী’ গ্রন্থের এই ইতিহাস ঐতিহ্যের খোঁড়াখুঁড়িতে পাঠক গন্ধ পাবেন একাত্তরের রণাঙ্গনে আলবদর, রাজাকার ও পাক হানাদার বাহিনীর বীভৎসতা এবং নারকীয়তার। যেকোনো দেশপ্রেমী পাঠকের অনুভূতিকে নাড়িয়ে তুলবে নিঃসন্দেহে। বিশেষ করে ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানার ইমামের আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চারজন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা। তারপর গ্রামে ফিরে গিয়ে নিজেদেরকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন সমাজের কাছে। সমাজ তাদের গ্রহণ না করে একঘরে করেছিলেন। সেই নির্মম সামাজিকতার বর্ণনা তুলে ধরেছেন গ্রন্থে।

১৯৯৮ সালের ২ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকন্যা তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুমারখালীর সেই চার নারী মুক্তিযোদ্ধাকে ঢাকায় গণভবনে সঞ্চয়প্রাপ্ত ৫০ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান দিয়েছিলেন ঘরবাড়ি করার জন্য। বিশ বছর আগের সেই ছবি ও ইতিহাস গবেষক খুঁজে বের করেছেন।

একাত্তর সালে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ছিলেন দুই বোন লুলু-ই ফেরদৌস, লুলু-ই জান্নাত। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে পরিবারের সঙ্গে ভারতে গিয়ে শান্তিনগর হাসপাতালে সেবিকার দায়িত্ব পালন করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাসপাতালে। যুদ্ধদিনের মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে হাসপাতালের দিনগুলির কথা চমৎকারভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন গ্রন্থে।

১৯৬৮ সালে কুমারখালী উপজেলা শহরে প্রথম শহীদ মিনার তৈরিতে রওশন আরা বেগম নীলার অংশগ্রহণ অবদান এবং ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর শুধু গল্পই তুলে ধরেননি, খুঁজে বের করেছেন দুষ্প্রাপ্য সব ছবিও।

মুক্তিযুদ্ধের গবেষক ইমাম মেহেদীর এই ‘মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার নারী’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ‘বেহুলা বাংলা প্রকাশনী’। প্রকাশকাল অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯। মূল্য ২০০ টাকা। প্রচ্ছদ করেছেন আল নোমান।

 

"