কুমিল্লায় চিন্ময় নজরুল মৃন্ময়ী নজরুল

প্রকাশ | ২৪ মে ২০১৯, ০০:০০

কামাল আহমেদ

বাংলা কবিতা, গানে, কথাসাহিত্যে, নাটকে ও অপরাপর শাখায় যিনি একজন প্রবাদপুরুষÑ সেই কবি কাজী নজরুল ইসলাম কুমিল্লার বাতাস আর ধূলিকণায় চিন্ময় হয়ে আছেন।

১৯২১ সালের ৩ এপ্রিল নজরুল কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম মেইলে করে আলী আকবর খাঁর সঙ্গে রাতে কুমিল্লায় আসেন। ওই রাতে নজরুল কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ে তার সহপাঠী বন্ধু বীরেন্দ্র কুমার সেনের বাড়িতে ওঠেন। সে যাত্রায় মুরাদনগরের দৌলতপুর অবস্থান করেন তিন মাস। দ্বিতীয়বার ১৯২১ সালের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর, তৃতীয়বার ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন, চতুর্থবার ১৯২২ সালের অক্টোবর থেকে ২৩ নভেম্বর এবং পঞ্চমবার ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে। বলা যায় তিনি কুমিল্লায় এসেছিলেন পাঁচবার। সব মিলিয়ে থেকেছেন প্রায় ১১ মাস। নজরুলের দাম্পত্যজীবনের বন্ধনও ঘটেছিল কুমিল্লায়। দুই মহীয়সী নারীর পাণিগ্রহণ করে কুমিল্লার সঙ্গে তার ঘটেছিল চিরায়ত নারীর সম্মিলন।

তাই এই কীর্তিময় সময়ের বহু স্মৃতি এখন ফলক রূপে দৃশ্যমান। দেখা যায়Ñ এখানে বসে বাঁশি বাজাতেন, এখানে বসে আড্ডা জমাতেন, এখানে গোসল করতেন, এখানে গান গাইতেন, এখানে গ্রেফতার হয়ে জেলে গেছেন ইত্যাদি।

কবির এসব স্মৃতি রক্ষার প্রথম বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন ১৯৬২ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে তৎকালীন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক আমিনুর রহমান কবির স্মৃতিময় লেখাগুলো লিখিয়ে টিনের ফলক বসিয়েছিলেন। এ গুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯২ সালে কুমিল্লার আর এক জেলা প্রশাসক হেদায়েতুল ইসলাম চৌধুরী কবির স্মৃতিকে অমরতা দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৯২ সালের জন্মবার্ষিকীতে নির্মিত স্মৃতিসৌধ ‘চেতনায় নজরুল’-এর উদ্বোধন করেন। তখনই জেলা প্রশাসক ফলকগুলোকে শ্বেতপাথরে খোদাই করে লিখিয়ে স্থাপন করার ব্যবস্থা নেন। তিনি এজন্য প্রশংসিতও হয়েছিলেন।

প্রথম ফলকটি কান্দিরপাড়ে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তর বাসায়। এখানেই কবির কুমিল্লাতে প্রথম রাত্রিযাপন এবং দ্বিতীয় স্ত্রী আশালতা সেনগুপ্তার সঙ্গে পরিচয়। দ্বিতীয়টিও এর আশপাশেই বসানো হয়েছে। তৃতীয় ফলকটি দৌলতপুর মুনশি বাড়িতে। এ বাড়ি কবির ধ্যান তাপসী, গোমতী পাড়ের কন্যা, প্রথম স্ত্রী নার্গিস আসার খানমের। বিয়ে হয়েছিল ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ৩ আষাঢ়ে। চতুর্থ ফলকটি কান্দিরপাড় বর্তমান নজরুল অ্যাভিনিউ। এটি বসন্তকুমার মজুমদার ও হেমপ্রভা মজুমদারের বাড়ি। নজরুল বন্ধুদের নিয়ে এখানে পাঠাগারে বই পড়তেন। পঞ্চম ফলক দৌলতপুর খাঁ বাড়ির সেই আমগাছ তলায়, যেখানে ১৯২১ সালের এপ্রিল, মে মাসে বসে বসে বাঁশি বাজাতেন, কবিতা-গান লিখতেন। ষষ্ঠ ফলকটি আছে দৌলতপুর খাঁ বাড়ির লাগোয়া বিশাল পুকুরঘাটে, যেখানে ১৯২১ সালের এপ্রিল, মে মাসে কবি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কাটতেন।

সপ্তম ফলক দৌলতপুর খাঁ বাড়ির যে ঘরে কবি ১৯২১ সালের এপ্রিল, মে মাসে থাকতেন, গান-কবিতা লিখতেন। অষ্টম ফলক বর্তমান নজরুল নিকেতন, যেখানে পাঠাগার, জাদুঘর ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। নবম ফলকটি কান্দিরপাড় ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসভবন। এর লাগোয়া বিশাল এক পুকুর কবির স্মৃতিবিজড়িত। দশম ফলক মৌলভীবাড়ি নামে খ্যাত, একজন নিষ্ঠাবান সংগীত সাধক জানে আলম (জানু মিয়া) চৌধুরীর বাড়ি। এখানে বহু প্রখ্যাত সংগীতশিল্পীদের নিয়মিত আসর হতো। কবিও আসরে যেতেন। একাদশ ফলকটি দারোগা বাড়িতে। যেখানে ১৯২১, ১৯২২, ১৯২৩ সালে কবি নজরুল ও ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুসহ অনেকেই গানের আসর জমাতেন।

দ্বাদশ ফলকটি রানীর দিঘির দক্ষিণ পশ্চিম কোণে। যেখানে ১৯২১, ১৯২২, ১৯২৩ সালে কবি নজরুল ইসলাম কলেজ পড়–য়া তরুণদের নিয়ে গান-কবিতার আসর বসাতেন। ‘মাধবীলতা দোলে....’ একটি বিখ্যাত গান এখানে বসেই লেখা। ত্রয়োদশ, মহেশ প্রাঙ্গণ, ঈশ্বর পাঠশালাসংলগ্ন। এখানে আসর হতো। দাওয়াত পেলে ছুটে যেতেন। গান পাগল কবি, দাওয়াত পেলে সবখানেই যেতেন। চতুর্দশ ফলকটি, মহারাজ কুমার নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মণ বাহাদুরের রাজবাড়িতে। ১৯২২ সালের প্রথম দিক থেকেই শচীন দেববর্মণ এবং কাজী নজরুল ইসলাম বিখ্যাত ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর কাছে সংগীতে তালিম গ্রহণ করতেন।

পঞ্চদশ ফলকটি কান্দিরপাড় ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসভবন লাগোয়া পুকুরের উত্তর পাড়ে। ১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর প্রমীলাদের বাসাতেই গান লিখে কাঁধে হারমোনিয়ম ঝুলিয়ে কবি নিজেই মিছিলে গেয়ে বেড়ান। বিখ্যাত সে গানটি ছিলÑ

‘ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও!/ফিরে চাও ওগো পুরবাসী,/সন্তান দ্বারে উপবাসী/দাও মানবতা ভিক্ষা দাও!’

এটি সেদিন প্রিন্স অব ওয়েলসের ভারত আগমনের বিরুদ্ধে লেখা। ষষ্ঠদশ ফলকটি একই দিনে, একই গান গেয়ে সারা শহর প্রদক্ষিণ শেষে মোগলটুলির দিকে থানা মোড়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে রাজদ্রোহী হিসেবে বন্দি করা হয়। সপ্তদশ, ১৯২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ধূমকেতু পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশিত হলে পরদিন ২৩ সেপ্টেম্বর তা রাজদ্রোহীতার দায়ে বাজেয়াপ্ত করা হয়। একই অভিযোগে ‘ধূমকেতু’ সম্পাদক ও কবিতার লেখক কাজী নজরুল ইসলামকে কুমিল্লার ঝাউতলায় উকিল যোগেশ চন্দ্রের বাড়ির সামনে পুলিশ গ্রেফতার করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফেরত বীর সৈনিক, অভিজাত দৈহিক গঠনের অধিকারী, সৃজনছন্দের জাদুকরী কারিগর কুমিল্লার দুই বালিকার প্রেম-ছন্দে বন্দি হওয়া, বাসর রাতেই এক বধূ থেকে রহস্যজনক পলায়ন, দ্বিতীয় বিয়ে, কয়েকবার গ্রেফতার ও কারাবরণ, সোনাঝরা লেখনীর অমূল্য দিনগুলোর কাছে এসব ফলক তেমন আর কী? তবু নতুন প্রজন্মে এ অহংকার জাগিয়ে দেওয়া, পর্যটকদের কাছে জাতিকে তোলে ধরতে ফলকগুলোর ভূমিকা কম নয়। কুমিল্লায় নজরুলের চিন্ময়ী রূপ, মৃন্ময়ী চলন-কথন সকল প্রেমিকের, সকল দ্রোহের, সব সর্বহারার, বিশ্বমানবতার প্রেরণার।

 

"