মায়ের গল্প

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০

হামীম রায়হান

স্কুলের স্যার সেদিন একটা গল্প বলছিলেন। গল্পটা হয়তো তোমরা জানো। মেলায় এক ছেলে হারিয়ে যায়। ছেলেটি কাঁদতে থাকে। মেলা কমিটির একজন ছেলেটিকে ঘোষণা মঞ্চে নিয়ে যায়। ছেলেটি কেঁদে কেঁদে বলে তার মাকে হারিয়ে ফেলেছে। সবাই তার মাকে খোঁজার জন্য জিজ্ঞেস করে দেখতে কেমন তার মা। ছেলেটি বলে, আমার মা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা। সারা মেলা খোঁজা হলো, কিন্তু তার মাকে পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ পর এক কুৎসিত মহিলা এসে বলে এটা তার সন্তান। ছেলেটিও মহিলাকে মা বলে জড়িয়ে ধরে। তখন সবাই বেশ অবাক হয়। এ গল্প থেকে আমরা একটা শিক্ষা পাই, সন্তানের চোখে মা-ই সবচেয়ে সুন্দরী।

এবার আমার মায়ের কথায় আসি। আমি কখনো বাবাকে দেখিনি। বাবার কথা কখনো মাকে বলতেও শুনিনি। বাবার কথা বলে মা তা এড়িয়ে যান। অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন। এলাকার লোকের কাছে শুনেছি, বাবা আমার জন্মের আগেই আমাদের ছেড়ে চলে যান। মায়ের কপালে গভীর একটা ক্ষতচিহ্ন ছাড়া আর কোনো স্মৃতিই বাবা আমাদের জীবনে রেখে যাননি। বাবা চলে যাওয়ার পর আমাদের পরিবারে নেমে আসে চরম অভাব। মা হয়ে যান দিশাহারা। কারো কাছে গিয়ে কোনো সাহায্য মা কখনো চাইতেন না। আমার মামারাও কখনো মাকে সাহায্য করেননি। একবেলা খেয়ে দুবেলা উপোস করে মা আমাকে নিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যান। কিন্তু কারো কাছে হাত পাতেননি।

মা ভালো হাতের কাজ পারতেন। এক দিন তিনি তার পুরোনো কয়েকটা শাড়ি দিয়ে একটা কাঁথা সেলাই করেন। কাঁথাতে দারুণ নকশা করে তিনি নিয়ে যান পটিয়া সদরের একটা দোকানে। তারা মায়ের কাঁথা দেখে সঙ্গে সঙ্গে কিনে নেন এবং মাকে এ রকম আরো কাঁথার অর্ডার দেন। সেই থেকে শুরু। মা সারা দিন বসে বসে কাঁথা সেলাই করেন। আর সেগুলো সদরের দোকানে দিয়ে আসতে থাকেন। এদিকে আমারে একটা স্কুলে ভর্তি করে দেন।

আস্তে আস্তে অর্ডার বাড়তে থাকে। মায়ের ব্যস্ততাও বাড়তে থাকে। মা একা কুলাতে পারেন না। নাওয়া খাওয়া ভুলে শুধু কাঁথা সেলাই। পাড়ার রহিমা খালা, সাইমা খালা, সুলতানা বু, ফরিদা আপু, আসমা চাচিরা মায়ের কাছে কাঁথা সেলাই করতে আসেন। তারাও রাত-দিন কাজ করে মায়ের সঙ্গে। কাজের চাপ বাড়তে থাকে। এপাড়া-ওপাড়ার মেয়েরা এসে কাজ শিখতে থাকেন মায়ের কাছে।

এভাবেই কেটে যায় অনেক বছর। এখন আমাদের পরিবারে মোটামুটি সুখ এসেছে। এখন আমি দশম শ্রেণিতে পড়ছি। মায়ের কাছে এখন ১০০ মহিলা কাজ করছেন। তাদের সংসারের ভার মায়ের ওপর। পটিয়া সদরের বড় মার্কেটে মা একটা কাপড়ের দোকান দিয়েছেন। দোকানে নকশিকাঁথাসহ বিভিন্ন কাপড় বিক্রি হয়। মা দোকানে বসেন। আমিও মাঝে মাঝে দোকানে বসি। বিভিন্ন জায়গায় কাঁথা পাইকারি করেন মা। ঈদের সময় ভিড় বেশি হলে আরো মহিলা রাখা হয়।

আমার খুব ইচ্ছে ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে লেখাপড়া করার। মাও চান আমি এমন কিছু করি। আমাদের স্কুলের রুম্পা ম্যাডাম আমাকে এ ব্যাপারে খুব উৎসাহ দেন। আমি মাঝে মাঝে কাঁথায় বিভিন্ন নকশা এঁকে দিই। মা তা দেখে খুব খুশি হন। দিনের শেষে বাসায় ফিরে যখন মায়ের কপালের গভীর ক্ষত দাগে ঘাম জমে থাকে, তখন আমার মনে হয়, এই পৃথিবীর সেরা সুন্দরী!

 

"