ভূতের লাঠি

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০

আবদুস সালাম

হাট-বাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্কুল-কলেজে পড়ালেখা করাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে নূরপুর গ্রামের লোকজনকে শহরে যেতে হয়। শহরে যাওয়ার জন্য দুটি রাস্তা রয়েছে। একটি পাকা রাস্তা আর অন্যটি কাঁচা। পাকা রাস্তাযোগে শহরের দূরত্ব বেশি আর কাঁচা রাস্তাযোগে শহরের দূরত্ব কম। পাকা রাস্তা দিয়ে শহরে যেতে একটু দূর হলেও মূলত এ রাস্তা দিয়েই বেশির ভাগ লোকজন যানবাহনে এবং হেঁটে চলাফেরা করে। কাঁচা রাস্তাটি মূলত হাঁটার রাস্তা। তাই এই রাস্তাটি তেমন করে ব্যবহার হয় না। আর রাতের বেলায় কেউ চলাফেরা করে না বললেই চলে। কারণ এ রাস্তা দিয়ে চলতে গেলে চোখে পড়ে কবরস্থান, বাঁশঝাড় এবং কয়েকটি বড় বড় গাছ। ভূত পেতনির ভয়েই সাধারণত রাতের বেলায় কেউ চলাফেরা করতে সাহস পায় না।

নূরপুর গ্রামে এক বৃদ্ধ লোক বাস করেন। তার নাম মোতালেব। বয়সটা একটু বেশি হওয়ার কারণে অনেকেই তাকে দাদা বলে ডাকেন। তিনি চোখেও কম দেখেন। তবে উনার খুব সাহস। দিন হোক বা রাত হোক তিনি সব সময় এই কাঁচা রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করেন। আর চলাফেরা করার সময় তার হাতে থাকে একটা লাঠি। এই লাঠি তাকে খুব সাহায্য করে। এই লাঠির ভয়েই কেউ তার সামনে আসতে পারে না। কুকুর, বিড়াল তো দূরের কথা ভূত পেতনিও নাকি তার কাছে আসতে সাহস পায় না। লাঠিটা আসলে কিসের তৈরি যে ভূত পেতনিও এই লাঠি দেখে ভয় পায়? এই লাঠি দাদা কোথায় পেয়েছেন? এ রকম নানা প্রশ্ন নিয়ে গ্রামের মানুষের মনে কৌতূহল রয়েছে। তবে এই লাঠি নিয়ে দাদাকে কেউ বিরক্ত করেন না।

গ্রামের মাঝখানে একটি বটগাছ রয়েছে। সেই বটগাছের নিচে মজিদ মিয়ার চায়ের দোকান। দোকানের পাশেই রয়েছে একটি মাচা। দোকানটি অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। গ্রামের লোকজনরা এখানে চা পান করতে আসে। চা পান করার সময় তারা মাচায় বসে নানা বিষয় নিয়ে গল্প করে। মোতালেব দাদাও নিয়মিত এই দোকানে চা পান করেন। তিনি সবার সঙ্গে অনেক গল্প করেন। তিনি অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প বলেন। দাদার গল্প অনেকেই পছন্দ করেন। অনেকেই খুব মনোযোগ দিয়ে গল্প শোনেন। মজিদ মিয়ার দোকানের পাশ দিয়েই দাদাকে শহরে যাতায়াত করতে হয়।

কয়েক দিন হলো গ্রামের কিছু ছেলের স্কুলের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাই তারা মাঝে মাঝে মজিদ মিয়ার দোকানের আশপাশে বসে আড্ডা দেন। আজ সন্ধ্যার পর দোকানের একটু দূরে বসে মজনু, শফিক, আসলাম ও হাসানসহ বেশ কয়েকজন বন্ধু গল্প করছেন। এমন সময় মোতালেব দাদা শহর থেকে বাসায় ফিরছেন। বালকদের সঙ্গে আজ দাদার দেখা হয়ে গেল। তারা বললেন, দাদা আপনার সঙ্গে আমাদের অনেক কথা আছে। তার আগে বলুন, আপনি কোথায় গিয়েছিলেন? কোন রাস্তা দিয়ে আসলেন? দাদা বললেন, আমি শহরে গিয়েছিলাম আর বরাবরের মতো কাঁচা রাস্তা দিয়েই আসলাম।

Ñআপনার ভয় করে না?

Ñকীসের ভয়? আমার হাতে লাঠি আছে না। এই লাঠিটা খুব ভয়ংকর। এই লাঠি হাতে থাকলে আমার ত্রিসীমানায় জন্তু-জানোয়ার, ভূত-পেতনি কেউই আসতে সাহস পায় না।

Ñএই লাঠি আপনি কোথায় পেয়েছেন?

বালকদের কথা শুনে দাদা হেসে বললেন, এটি ভূতের লাঠি। ভূতের সর্দার আমার বন্ধু। দুষ্টু ভূত-পেতনির শায়েস্তা করার জন্য সে আমাকে এই লাঠিটা উপহার দিয়েছে। এই লাঠি যদি দুষ্টু ভূতের গা স্পর্শ করে, তা হলে সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হবে।

Ñভূত তো অশরীরী। তাকে তো দেখা যায় না। আপনি কীভাবে ভূত দেখলেন?

Ñভূত তার আসল চেহারায় কখনো মানুষের সামনে আসে না। তবে তারা মানুষ এবং পশুপাখির রূপ ধরতে পারে। তারা মানুষ এবং পশুপাখির রূপ ধরে আমাদের সামনে আসে।

দাদা বালকদের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করার পরে চলে গেল। আর বালকরাও সঙ্গে সঙ্গে নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেল। বালকদের মধ্যে মজনু বেশ সাহসী। শহরে তাদের একটি মুদির দোকান আছে। তাই প্রায়ই তাকে সকাল-সন্ধ্যায় দোকানের উদ্দেশে শহরে যাতায়াত করতে হয়। মোতালেব দাদার মতো তার একটা ভূতের লাঠির ভীষণ প্রয়োজন। এ রকম একটি লাঠি থাকলে তার কোনো চিন্তাই থাকত না। খুব অল্প সময়ের মধ্যে কাঁচা রাস্তা ধরে শহরে যাতায়াত করতে পারত। তাই সে মনে মনে ভাবল, এ বিষয়ে দাদার সঙ্গে পরামর্শ করবে যে, এ রকম কোনো লাঠি দাদা জোগাড় করে দিতে পারবে কি না।

মজনু পরদিন দাদার বাড়িতে গেল। দাদাকে তার অভিপ্রায় জানাল। দাদা তার কথা শুনে বলল, এ রকম লাঠি আপাতত আর জোগাড় করা সম্ভব নয়। তবে তুমি চাইলে মাঝে মাঝে আমার লাঠিটা ধার নিতে পার। দাদার এই প্রস্তাব শুনে মজনু খুব খুশি হলো। সে বলল, ঠিক আছে তাই হবে। মজনুকে আজই সন্ধ্যার পরে একটা কাজে শহরে যেতে হবে। তাই সে বিকালবেলায় ওই লাঠিটা দাদার কাছ থেকে ধার করে আনল। তারপর সন্ধ্যা হলে মজনু সেই লাঠিটা নিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে শহরের উদ্দেশে হাঁটা দিল। কবরস্থান, বাঁশঝাড় ও বড় বড় গাছের পাশ দিয়ে সে নির্ভয়ে হেঁটে চলল। কাজ সেরে আবার একই রাস্তা ধরে ফিরে এলো। আজ তার কোনো রকম ভয় করেনি। মজনু দাদার লাঠিটা ব্যবহার করতে পেরে খুব খুশি। মজনু যখন লাঠিটা ফেতর দিতে গেল, তখন দাদা তাকে জিজ্ঞাসা করল, কোনো ভয় করেনি তো?

Ñমোটেও ভয় করেনি। ভূতের লাঠি থাকলে কীসের ভয়? তবে দাদা, আমাকে কিন্তু মাঝে মাঝে এই লাঠিটা ধার দিতে হবে।

Ñনিশ্চয় দেব। তোমার যখন ইচ্ছা তখন লাঠিটা ধার নিতে পার।

এদিকে মজনুর বন্ধুরা এই লাঠি ব্যবহার করার কথাটি এরই মধ্যে জেনে গেছে। লাঠির বিষয়ে মজনু তার বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করেছে। মজনুর কথা শুনে তার বন্ধু আসলামেরও খুব ইচ্ছে করছে, মজনুর মতো করে এই লাঠি নিয়ে সন্ধ্যার পরে একা একা শহরে যেতে। মজনু আসলামের ইচ্ছার কথা জানার পর বলল, ঠিক আছে তোর ইচ্ছা পূরণ করা হবে। আমি তোকে লাঠিটা এনে দেব। দুদিন পরেই আসলাম মজনুকে বলল, আজ আমাকে দাদার কাছে নিয়ে চল। আমি এক দিনের জন্য লাঠিটা ধার নেব। মজনু আসলামকে দাদার কাছে নিয়ে গেল এবং দাদাকে আসলামের অভিপ্রায়ের কথা জানাল। দাদা তাদের কথা শুনে হাসলেন। তারপর আসলামকে লাঠিটা এক দিনের জন্য ধার দিলেন।

আসলাম সন্ধ্যার পর লাঠিটা হাতে নিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে শহরের উদ্দেশে রওনা দিল। কিছুদূর যাওয়ার পর তার গা ছমছম করছে। সে মোটেও যেতে সাহস পাচ্ছে না। সে বারবার চেষ্টা করল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেতে পারল না। সে বাসায় ফিরে এলো। পরদিন সে দাদাকে লাঠিটা ফেরত দিতে গেল। দাদা আসলামকে জিজ্ঞাসা করল, কোনো সমস্যা হয়নি তো?

Ñহ্যাঁ, সমস্যা হয়েছে। আমি বারবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু একা একা যেতে মোটেও সাহস পাইনি। আমার মনে হয় গতকাল লাঠিতে কোনো কাজ করেনি। তাই ভয় পাচ্ছিলাম।

দাদা তার কথা শুনে হাসল। দাদা বলল, শোন, শুধু লাঠি থাকলেই হবে না। মনেও সাহস থাকতে হবে। মনে সাহস থাকলে সব কিছুতে সফল হওয়া যায়।

Ñকিন্তু মজনু যে বলল, এই লাঠি থাকার জন্য তার কোনো ভয় করেনি। এই লাঠি নাকি তাকে অনেক সাহস জুগিয়েছে।

Ñমজনুর বুকে অনেক সাহস। তাই সে চেষ্টা করলে লাঠি ছাড়াই একা একা রাতের বেলায় কাঁচা রাস্তা ধরে শহরে যাতায়াত করতে পারবে।

-বলেন কী!

-শোন। এই লাঠিটা আসলে বাঁশের তৈরি। এটা কোনো ভূত আমাকে উপহার দেয়নি। আমি মজা করার জন্য এই লাঠিকে ভূতের লাঠি বলে থাকি। এই লাঠি আমি তৈরি করেছি। আমি মূলত এই লাঠিতে ভর দিয়ে চলাফেরা করি। আসলে লাঠির কোনো ক্ষমতা নেই। মনের জোরই আমাকে পথ চলতে সাহায্য করে। চেষ্টা করলে তুমিও আমার মতো চলাফেরা করতে পারবে। দাদার কথাগুলো আসলাম খুব মনোযোগ সহকারে শুনল আর অবাক হলো।

 

"