কবিতা শব্দের পাপড়িতে গাঁথা বোধের ফুল

প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৯, ০০:৪৯

মায়িশা তাসনিম ইসলাম

কবিতা নিয়ে আমার ভাবনা কী রকম কিংবা কবিতা আসলে কী, এসব প্রশ্নে আমি দুর্বল হয়ে পড়ি। আমি শুধু জানি আমি কবিতা লিখি না, কবিতা আমাকে লেখে। আমি নিজেকে চেয়ে ফেলি তার কাছে, সে আমাকে সবসময় আশাহত করে না। আমার চাওয়াটা মানুষের কাছে বড় কিছু, তার কাছে খুবই তুচ্ছ। আমি তাকে সাধনা করি, সে আমাকে এমন একজন মায়িশা উপহার দেয় যাকে কখনো চিনিনি, দেখিনি,

যার গন্ধও পাইনি।

আমার বন্ধুবান্ধব প্রায়ই বলে, ‘তোর কবিতা মাথার উপর দিয়ে যায়।’ দাঁত ভেঙে যায় অনেকের। আমি অবশ্য এমন কিছু দেখি না। তাছাড়া, পাঠকের কথা চিন্তা করে কখনো কবিতা হয় না। এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এখানে আমার আরো একটি বিশ্বাস কাজ করে। কবিতা শব্দের পাপড়িতে গাঁথা বোধের ফুল। যদি কেউ সত্যি সত্যি কবিতার পাঠক হয়, তবে সে সেই ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে বোঝার চেষ্টায় মত্ত থাকবে না, বরং সৌন্দর্যে ও গন্ধে মোহিত হবে।

খুব সাধারণ পাঠকের কথা যদি বলি, তবে তারা প্রায়ই বলে থাকেন, কবিতা বুঝি না। কিন্তু কোনো একটা কবিতার শব্দবিন্যাস যদি তার হৃদয় ছুঁয়ে যায় তবে সে আন্তরিক পাঠক হওয়ার চেষ্টা করতেই পারে। তখন সে ব্যাখ্যা অনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। ব্যাখ্যা না পেলে অস্থির হবেন। সেক্ষেত্রে বলি হতাশ হবেন না। আপনি বারবার পড়ে যান, আর যদি সেই শব্দবিন্যাস হৃদয়ে ঝংকার সৃষ্টি করে, তবে সেটাও

কবির সার্থকতা।

কবিতাকে সংগীতের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। কবি তার হৃদয়ের সেতার বাজিয়ে শব্দে সৃষ্টি করে যান মনোমুগ্ধকর সংগীত। এখন ধরুন একজন উচ্চাঙ্গসংগীত গাইছেন, আপনি তার সবটা হয়ত বুঝবেন না। কিন্তু আপনি দুলতে থাকবেন মোহনীয় সুরে, হৃদয় প্রবেশ করবে বোধের অতল গভীরে। আপনি শুনতেই থাকবেন, শুনতেই থাকবেন। একসময় মনে হবে, আপনি কিছু না বুঝেও সবটা বুঝে যাচ্ছেন। এক আধ্যাত্মিক শক্তি ভর করবে। আপনি হয়ে উঠবেন নিবিষ্ট শ্রোতা। কবিতাও অমনি। বারবার পড়তে পড়তে শব্দের ঝংকার আপনার হৃদয়ে গেঁথে যাবে। আপনি কবির অনুভবকে অনুভব করতে শুরু করবেন।কবিতাই একমাত্র আয়না যেখানে নিজেকে ঝাপসা দেখতেও ভালো লাগবে। আর পরিষ্কার দেখলে নিজের দিকে তাকিয়ে রইবেন মুগ্ধচোখে। মূলত শব্দের কাছে নির্লজ্জ হতে দ্বিধাবোধ করতে নেই। প্রেমিক প্রেমিকার কাছে সম্পূর্ণ নিজেকে সমর্পণ না করা গেলেও শব্দের কাছে যায়। আর পুরোপুরি সমর্পণ করতে পারলেই আপনি জয়ী।

 

প্রুফ রিডিং

 

চশমা পরেও দেখতে পাই না
কিভাবে তোমার নিভৃত মোমদানিতে নিভে যাচ্ছি।

একটি ঝাপসা যুদ্ধে পরিষ্কার হয়
মাইনাস থ্রি পয়েন্ট টু জিরো!

তোমার আমার রক্তের দাগ নেই
তোমার আমার বীর্যে কাঁদে মৃতসন্তান।

 

আড়াল-অশ্রু

 

এত মানুষ, এত মানুষের চোখ
এত অস্তিত্বের ভিড়, নিঃশ্বাসে যেন সিসা ঢেলে দেয়
এত চোখের এত কথা উড়তে চায় ঘুড়ির মতো
মুখের বুলিতে বাতাস উল্টোদিকে বয়ে যায়

গ্রীষ্মের স্পর্ধা নেমে আসা ভিক্ষার থালায় জমে জীবনের খুচরা পয়সা
এত এত ঘেমে ওঠা কপাল, তবু কার কালো টিপ সবসময় ঢেকে রাখে তৃতীয় নয়ন!
এত শব্দ, তবু তো স্পষ্ট শোনা যায় পিরামিডের কান্না
এত মানুষ, আমার শুধু মনে পড়ে পোড়া ভাতে ফেলা এক ফোঁটা চোখের জল।

 

গণিত

 

একজন সৈনিক
    ভাতের পাতিল খোলার আগে
                        চাবাতে থাকে বুলেট।

একটি ভ্রুণ
    জরায়ুর আগে দেখে নেয়
                    ঋতুস্রাবের বাগান।

একজন কবি
      শব্দচয়নের ন্যানো সেকেন্ড আগে
                       মানুষ হয়ে ওঠেন।

 

অসমাপ্তের অন্তে

 

তুমি রূপতীর্থের সন্ন্যাসী
শরীরের ঘ্রাণ যার জন্য ইন্দ্রিয়নাশক
রুদ্রাক্ষমালা গলায় কথা বলা চাতক

তুমি কবিতার পুরুষ নও।

রমণ করতে পারো
চাল, ডাল আনতে পারো
শাড়ির আঁচলে ভাত মাখতে পারা পুরুষ হয়তো

কবিতার পুরুষ নও।

থিয়েটারে বসা পপকর্ন সঙ্গী
কাপড়ের দাম দিতে পারা অর্ধাঙ্গ
নেলপলিশে ঢেলে দেওয়া রক্তের ধারক

কবিতার পুরুষ নও।

নেশাখোর প্রেমিক
কিংবা দায়িত্বশীল সংসারী পুরুষ
বিবাহবার্ষিকী পালন করা প্রিয়তম স্বামী

কবিতার পুরুষ নও।

জন্মতত্ত্বের ক্লাসে অবাক ছাত্র
দোলনার পাশে ঝিমোতে থাকা নোটবুক
বয়সী পিতার অবয়বে জীবিত স্নিগ্ধ যুবক

তুমি কবিতার পুরুষ নও।

 

যজ্ঞশেষে

 

মিথ্যার আশ্রমে 
         দেহের জপ হরি হরি।

অন্তর্বাসে 
     লেগে নেই ছাপ
হ্যাঙ্গার নুয়ে কার অপরাধে?

চিবুকের কাছ থেকে 
      সরে যায় নেশা
মাতাল শুধু লিঙ্গের পাহারাদার!

তোমার ভয়ানক আঙুল
          উন্মাদ নখ
            ব্যক্তিত্বময় অপবাদ
সমস্তই মুছে যাচ্ছে
            নিজস্ব নগ্নতায়।

"