বোধ ও বোধির কবিতা

বঙ্গ রাখাল

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

মামুন মুস্তাফা

মামুন মুস্তাফা সময় বিবেচনায় নব্বই দশকের কবি। যদিও তিনি দশক বিবেচনায় বিশ্বাসী নন, তবু কবির সময়টাকে ধরার জন্য সময়টা বিবেচনায় আনা জরুরি হয়ে পড়ে। মামুন মুস্তাফার কবিতা সম্পর্কে আলাদা করে বলার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। তার কবিতায় রয়েছে এক ধরনের পরীক্ষাধর্মীতা, যেখানে তিনি নানাভাবে কবিতাকে নিয়ে ইচ্ছা মতন খেলায় মেতেছেন। যা পাঠক তার কবিতা পাঠের মাধ্যমেই আস্বাদন করতে পারেন। তার কবিতায় এক ধরনের মরমীয় অনুভূতি জাগে যা আমাদের যাপিত জীবনবোধের জায়গা থেকে উৎসারিত হয়। কবির কবিতা পাঠে মনোনিবেশ করলে পাঠক মুগ্ধতার গভীর থেকে গভীরতম জায়গায় নিজেকে নিমজ্জিত করতে সক্ষম হবেন। যেখানে পাঠকশূন্যতা নিয়ে কবির কবিতা পড়তে পড়তে পূর্ণতা নিয়ে ফিরবেন। ফলে পাঠককে প্রতারিত করে না মামুনের কবিতা; বরং তাকে আন্দোলিত করবে আমাদের হৃদয়ের গহীনে প্রোথিত হওয়া মাতৃঐতিহ্যের শেকড়ে, জীবনযাপন আর লোকাচারে যা বারংবার কবিকে ভাবিত করে নিয়ে যায় দড়াটানা নদীর ঘাটে কিংবা বাজার ফেরত চরণবাবুর মধ্যবিত্ত জীবনের নানা চাওয়া-পাওয়া অথবা না পাওয়া বেদনাকুসুমের প্রত্যাশার কাছাকাছি।

চরণবাবু দেখেন বাজারের মোড়ে/সেই সফেদা আপেল বেদানার দানা/তেমনই রাখালদার দোকান, সামনেই সুনীলের কী মিষ্টি পান আহা!/সুবলের সুপারি তেমন আর হয় না কাটা! (কুহকের প্রত্নলিপি)

কবি দক্ষ নাবিকের মতো পথ চলেন জীবন নির্মাণের কাঠামো তৈরি করে। তিনি কোনো আরোপিত অনুষঙ্গকে উপাদান করে কবিতায় ব্যবহার করেন না। তিনি শিরদাঁড়া টানটান করে বলতে চানÑ এই মাটি আমার, এই দেশ আমার। কিন্তু তিনি সহ-সঙ্গীকে মৃত সাগর দেখার মতো করে হেলেনের পদধ্বনির মধ্যেও লুকানো যে রহস্য থাকে, সেই জীবনকে খোলাসা করে দিয়েছেন

তার কবিতায়।

মামুন মুস্তাফার কবিতা আমাদের মাঝে মাঝে বেত্রাঘাত করে এবং চিনিয়ে দেয় নিজের শিকড়-ঐতিহ্যকে। যা এদেশের মানুষ হাজার বছর ধরে তার হৃদয়ে লালন করে যন্ত্রণাক্লিষ্ট নগরায়ণের বিপরীতে নিজস্বতা, আপন অস্তিত্ব আর মা-মাটি-দেশের অভ্যন্তরে। আর এটি আমাদের রৌদ্র-দগ্ধ এক খাঁটি মানুষরূপে গড়ে তোলে এবং নদীর অবয়বে সৃষ্টি করে সবুজাভ জীবন। এ জন্যই কবি উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করতে পারেনÑ ‘হাড় ও করোটির নৈঋতে স্থির প্রেম ও মৃত্যু’। যে কবি এমন করে প্রেম ও মৃত্যুবিষণ্নতাকে পাশাপাশি রাখতে পারেন, সেই কবি আবার বিষণœœতাকে ভালবেসে ঝুঁকে পড়েন নিষণেœœর বুকে। বিষণ্ন কবিকে আচ্ছাদিত করে তোলে সামিয়ানায় মোড়ানো জটিল সংসারী বাউলি আবেশ। কবি সন্ন্যাসী জীবনের আকুতি যদিও কোথাও করেননি, তবু তিনি বেছে নিয়েছেন ধ্যানস্থতার জীবন। আর এ জীবনের তাপসী হয়ে তিনি স্বকণ্ঠে গেয়ে ওঠেনÑ ‘আমাকে ঋণী করে তুলো না, বেদনাহত আঙুরের গুচ্ছ ঠোঁটে নিয়ে পথ চলি...।’ এ ধরনের প্রেম, মৃত্যু আর দার্শনিকতার খেলা কবি করেছেন তার ‘শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ি’ কবিতাগ্রন্থে।

মামুনের কবিতায় মূলত পার্থিব সংসারযাত্রায় একজন ব্যক্তি মানুষের মনোজলোকে ঘটে যাওয়া আর্থসামাজিক বিবর্তনগুলোর সারনির্যাস ধরা পড়ে। তার কবিতাগুলোয় সংকেত ও চিত্রকল্পের আড়ালে উঁকি দেয় পারিপার্শ্বিকতা, যেখানে কবির নিজস্ব বোধ ও অনুভূতির সঙ্গে মিলেমিশে গড়ে ওঠে সমাজনির্ণিত পরিবেশ ও প্রতিবেশের সামষ্টিক সংকট। আর তখনই কবিতায় কবির ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও অসহায়ত্ব রক্তক্ষরণের দলিল হয়ে ওঠে।

মামুন মুস্তাফার কবিতার ভাব কিংবা তাৎপর্য যা কিছুই হোক না কেন কবিতায় তিনি সমকালীন ভাব বস্তুকে প্রচ্ছন্নসীমারেখা বা সামাজিক অভিজ্ঞতাকে আশৈশব ব্যক্তিসম্পর্কিত স্মৃতিবৈভব, জীবনযাপনের ঘাত-প্রতিঘাত, চারপাশের নর-নারীর বিষণœতাবোধ, অবসাদ গ্লানিকে অভিজ্ঞতার উপাদান বানিয়ে কবিতাকে রক্ত মাংসের কাঠামোতে দান করেছেন। সৌন্দর্যকে তিনি নিস্তরঙ্গতা বা প্রেমের গুপ্ত অনুসন্ধানী মনে প্রেমের উপমা বা আঙ্গিকতার প্রণয়ে কারুময়তায় প্রকৃতির রূপে বা নারীর রূপেই প্রকৃতিকে সাজিয়ে তুলেছেন কবিতার প্রতিটি চরণে। চিন্তাসূত্রকে তিনি নানা মাত্রিকতায় দ্বন্দ্বের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। যেখানে দৃষ্টিভঙ্গির জায়গাটা সৌন্দর্য আর আনন্দের কথিত রূপ হয়ে সমাজ ব্যবস্থার অসংলগ্নতায় আঘাত হানে। ফলে মামুনের কবিতা সত্যানুসন্ধানে উচ্চারিত প্রেম হয়েই ভাষা সঞ্চয় করে। এর দরুণ এক মর্যাদাময় প্রতি মুখের অভীষ্ট লাভের উপশম হয়ে নারীকে প্রেমের এক মহান রসায়নজাত হিসেবে কবিতায় ধারণ করেন কবি। যে কারণে কবি নিঃসঙ্গ জীবনের প্রতীক হয়েই নিজেকে জীবনের কাটাছেড়াময় ভাবনার এক প্রেমময় দিব্যদৃষ্টি উপলব্ধির কোলাজ করে তোলেন। সুতরাং নারী মা, স্ত্রী, বোন, নানা রূপেই বাস্তবতাকে উপস্থাপন করে অতৃপ্তির তমোরসে। যে কারণে কবি বলেনÑ ‘দরজার চৌকাঠে সংসারী বউয়ের ছবি/আর তার স্তন দুটি টাটিয়ে উঠেছে অপত্য পিপাসায়।’ (কুহকের প্রতœলিপি)

মমতা মাখা ভাষায় কবি তার কবিতায় উপস্থাপন করেছেন তাই-ই, যা মানবিক আবেগ সহজলভ্যতাকে নিজের মনের বাস্তবতা আর মনস্তাত্ত্বিকতাকে স্থাপন করে নিজের ভালোবাসা বা কামের প্রকৃত প্রতীক রূপী নারীকে। এই নারী যা কবির কবিতার মূল ভাষাÑ ‘...মাতৃজরায়ু ছিল আমাদের অধিবাস।’ অন্য কবিতায় কবি উচ্চারণ করেনÑ ‘কামুক পুরুষের নষ্ট দেহের গন্ধে/নোনাস্বাদ লাগে তার জিহ্বায়।’ কবির কবিতায় সমকালীন বীভৎসতা আর বিধ্বংসী বক্তা ইন্দ্রিয়াসক্তিই যেন বিচিত্রসন্ধানী হয়ে আত্মস্মৃতির মুখ্য সৃষ্টিরহস্য হয়েই ধরা দেয়। আর তাই কবির বিশ্লেষণী কবিতায় নিসর্গিক ভাষা আমরা টের পাইÑ ‘তোমার উপকণ্ঠে আমার জন্মজননীর/কেটেছে নীরব শৈশব চঞ্চল কৈশোর/আর যৌবনসংসারের কৃচ্ছ দিনগুলি! আর শুধু একটু/আশার প্রৌঢ়ত্ব তাঁর চোখে খেলা করে।’ মামুন মুস্তাফার ‘কুহকের প্রতœলিপি’ কবিতাগ্রন্থে এ সাহসী উচ্চারণে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি আবুবকর সিদ্দিককে বলতে শুনি, ‘বহু কবির প্রচুর কাব্যের অরণ্যে মামুন মুস্তাফা কিন্তু তাঁর এই দ্বিতীয় কাব্য কুহকের প্রতœলিপি-তে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কবি ব্যক্তিত্বের চিহ্ন তুলে ধরতে পেরেছেন। এই স্বাতন্ত্র্য যেমন বিষয়ের অধিকারে, তেমনি ভাষাশিল্পের অনন্যতায়।...আর এরই সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তিনি তাঁর মতো এক ধরনের ক্লাসিক অথচ আধুনিক ভাষারীতি অবলম্বন করেছেন। বিশেষ করে উপমা ও প্রতীকগুলোতে এই রীতির ব্যবহার লক্ষণীয়। ...প্রচলিত রোমান্টিক প্রণয়াবেগের বিপরীতে মামুন মুস্তাফা পিতৃপুরুষের শিকড়চেতনায় নিবিষ্ট হন, যা বাংলাদেশের একমেটে কবিতার ভুবনে নতুন সুর ও ব্যতিক্রমী বলে

মনে হয়েছে।’

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতায় অপ্রয়োজনীয় হই-হুল্লোর এবং আত্মপ্রচারের নগ্ন ফায়দাবাজির বিপরীতে নীরবে-নিভৃতে যে গুটিকয়েক তরুণ বিদগ্ধ কবি নিজেদেরকে নিবিষ্ট রেখেছেন মামুন মুস্তাফা তাদের অন্যতম। অন্তর্মুখীন বিরলপ্রজ এই কবি বৃহদার্থে রোমান্টিক ও সংবেদনশীল। মামুন মুস্তাফার কাব্যযাত্রা অক্ষয় হোক।

 

"