সাদত আল মাহমুদ

মধ্যবিত্তের কথাশিল্পী

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

এম মনসুর আলি

সাদত আল মাহমুদ মধ্যবিত্তের জন্য একজন উর্বর লেখক। লেখকদেরকে আমরা দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করতে পারি। যে সকল লেখক তাদের লেখায় মানুষের অনুভূতিকে ধারণ করতে পারেন তাদেরকে ইন্টেলিজেন্ট কথাশিল্পী বলতে পারি। যাদের মতো আর কেউ নয়, যাদের লেখায় নিজস্ব স্বকীয়তা পাওয়া যায় তারা জিনিয়াস লেখক। আমি এখানে জিনিয়াস লেখক হিসেবে উপন্যাসিক সাদত আল মাহমুদের কথা বলছি। তিনি এমনই একজন উপন্যাসিক যিনি কর্দমাক্ত জমিতে ফসল রোপণের মতো করে এক বা একাধিক বর্ণের সমষ্টিকে প্রতিটি স্তরে স্তরে শব্দ বসিয়ে বাক্য গঠন করে থাকেন। শব্দের গাঁথুনিগুলো এমনভাবেই সাজানো হয় যেখানে প্রতিটি শব্দই তার নিজস্ব জাত প্রকাশ করে থাকে। তৈলে ভাজা জিলাপীকে যেভাবে চিনির শিরা দিয়ে ভিজিয়ে সুমিষ্ট ও সুস্বাদু করে তুলে, তেমনি শব্দগুলোর গায়ে সাহিত্য রস ঢেলে দিয়ে জীবন্ত সাহিত্যে পরিণত করে থাকেন। এই জায়গাতেই লেখকের সার্থক বিচক্ষণতার পরিচয় ফুটে উঠে।

কালজয়ী ‘চিতার আগুনে’ উপন্যাসে লেখক ক্যানভাস হিসেবে বেছে নিয়েছেন সমাজের সহজ সরল এক মেয়ে যার নাম নন্দিনী। তার চরিত্র চিত্রনে লেখক বেশ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।

বিক্রমপুরের লৌহজং থানার অশ্চাৎপদ গ্রাম পালগাঁও। গ্রামটিতে বসবাস করেন যারা তাদের বেশিরভাগই সনাতন ধর্মে বিশ^াসী। আবার গ্রামটির জোতদার এবং মালিকানার দাবিদার এক কথিত মুসলমান। যিনি নামেই মুসলমান যার বেশিরভাগ কারবারই ইসলামবিরোধী শুরা আর সখা নিয়েই মানুষকে সহায়তার নামে সে নারীর ইজ্জত লুণ্ঠনে সিদ্ধহস্ত। যার অপার ক্ষমতার ভয়ে নীপিড়ীতরা সদা তঠস্থ। যার নজরে পড়লে কন্যাসম মেয়েও লালসার শিকার হন সেই পাপাত্মাকে নিয়ে লেখক এক মহাকাব্যিক উপখ্যান সাজিয়েছেন। ‘চিতার আগুনে’ উপন্যাসে সমরেশের শেষ উপলব্ধি সব অসহ্যকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়। তখন মনে হয়, মনের গহীনে জমাট বাঁধা অন্ধকারকে ঠেলে কে যেন আলো জালিয়ে সমরেশের কণ্ঠে জানিয়ে দিলো, সতীত্ব দেহে নয় মনে। কুসংস্কার অন্ধকার বিশ^াসের বিরুদ্ধে তীব্রভাবে এবং ক্ষিপ্রতার সঙ্গে লেখক অস্ত্রে শান দিয়েছেন।

লেখকের ‘রাজাকার কন্যা’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে ট্রাজেডি উপন্যাস হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে। সেক্সপিয়ার তার রচনায় ট্রাজেডিকে যে মাপকাঠিতে আনতে সক্ষম হয়েছেন, লেখক হয়তো ততটা ট্রাজিক ড্রামা তৈরি করতে পারেনি। ‘রাজাকার কন্যা’ উপন্যাসটি আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের চরম বিরোধিতাকারীর আত্মজকে নিয়েই আবর্তিত হয়েছে। উপন্যাসের কাহিনিতে আমাদের গর্বের মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে সর্বস্ব হারানো এক নারীর গর্বের কথা। যুদ্ধের সময়ে তিনি ছিলেন রাজাকারের কন্যা। পিতা রাজাকার হওয়ার কারণে তাদের বাড়িতে এসেছে পাকিস্তানি বাহিনী।

তাদের সঙ্গে পিতার দহরম মহরম তিনি দেখেছেন। দেখেছেন কিভাবে স্বাধীনতাপ্রিয় জাতির সোনার ছেলেদের ধরিয়ে বাবা পাকিস্তানের প্রসাদ লাভে মগ্ন। তাহমিনার ওপর পাকিস্তানিদের পাশবিক নির্যাতন সমানে চলছে। একদিন দেশ স্বাধীন হলে সেদিনের সেই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের একজন আকবর তাহমিনার সন্ধান পান। জীবনের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে সেদিন তাহমিনাকে বউ হিসাবে ঘরে তুলে নেন। বেশ ভালই চলছিল ওদের দুজনের সংসার। হঠাৎ একদিন দমকা হাওয়ায় তার সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তাহমিনা কেবল ধর্ষিত হয়নি, সে পেটে ধরে এনেছে এক অবৈধ পরিচয়হীন ভ্রুণকে। সেদিনের সেই ভ্রুণ তাদের সুখের সংসারে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে সবকিছু। ফেলে যেতে হয় তাহমিনার সোনার সংসার। অবশেষে সেদিনের সেই ভ্রুণ ভূমিষ্ট হয় পৃথিবীর বুকে। একসময় অবৈধ ভ্রুণটি বিলকিস নামে বড় হয়ে চিকিৎসক হয়ে ওঠে। বিলকিস চিকিৎসক হয়ে সমাজের অবহেলিতদের সেবা করার ব্রত নিলে তারও আশু সংসার হয়ে ওঠে অনিশ্চিত। গল্পের শেষে আমরা তার করুণ পরিণতি দেখতে পাই। আরিফ ভালবেসেও অবশেষে সমাজের দোহাই দিয়ে বিলকিসকে প্রত্যাখান করে। উপন্যাসের এখানেই কারিশমা। লেখক এই অংশে এসে আমাদের নতুন করে জাগিয়ে দিতে চান। যতই মুখে আমরা মুক্তিযুদ্ধ এবং বীরাঙ্গনাদের নিয়ে আত্মতুষ্টির চেষ্টা করি না কেন, সেটি যে কেবলই লোক দেখানো লেখক চাবুক মেরে আরো একবার বুঝিয়ে দিয়েছেন।

উত্তরবঙ্গের নীলফামারীর এক অজপাড়াগায়ের উপন্যাস লিখেছেন সাদত আল মাহমুদ। ‘প্রসব বেদনা’ নামের এই উপন্যাসের কাহিনি গড়ে ওঠেছে এক সর্বহারার লেখক হবার স্বপ্নের কথা নিয়ে। বোহেমিয়ান জীবনের যার ভেসে যাবার কথা। যার বাবা মারা যান অতি শৈশবে, মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে। সেখানে অবহেলা আর অনাদার। এরপর একসময় মাও তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে যান সেই না ফেরার দেশে। এমনি শতেক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করার এক উপখ্যান লেখকের ‘প্রসব বেদনা’।

সাদতের ‘প্রসব বেদনা’ উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা অবাধ প্রেমের অভাব রয়েছে। এক ঝলক চোখাচোখি আছে, আবার নিম্নবর্ণের মেয়ের সঙ্গে একটি সঙ্গমরত রাত রয়েছে। তবে সেটি কোনোভাবেই প্রেমের আদিখ্যেতাকে স্পষ্ট করে না। বরং পদ্মাবতীর দৃঢ়তা-মানবিকতা পাঠককে আলোড়িত করে। এছাড়াও লেখকের আরো একটি জনপ্রিয় উপন্যাস রমণীদ্বয় পারিবারিক ক্রোন্দলকে খুব নিপুণভাবে দেখানো হয়েছে। এই উপন্যাসে পিতা-কন্যার ভালবাসার প্রতিচ্ছবি সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি তাদের পরস্পরের বিরহের চিত্রটাও দেখানো হয়েছে। উপন্যাসের নায়ক ইকবাল দুই রমণীর নানাবিধ অসহযোগিতার চাপে মূহ্যমান নিজে নারীমুক্ত হয়ে যান। অবশেষে স্ত্রী-অর্থ-সম্পদ ত্যাগ করে কলিজার টুকরো মেয়েকে নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ান। মাত্র আঠার বছর বয়সে লিখে ফেলেন প্রথম উপন্যাস ‘শেষ বেলায়’।

তিনি একজন সাংবাদিক, নাট্যকার, উপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও শিশুসাহিত্যিক। তিনি উচিতবাদী, চরম কৃতজ্ঞ, সাদামাটা, সহজ-সরল চির সবুজ মনের মানুষ। আমি বারংবার মোহগ্রস্থ হয়েছি তার বিচক্ষণতা, প্রিসাইন্স, কো-অপারেটিভ আচরণ ও মানবিক গুণাবলী দেখে। সাদত আল মাহমুদ ১৯৭৬ সালে টাঙ্গাইল জেলার ডুবাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। লেখক হিসেবে সাদত আল মাহমুদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বাঙালি জীবন ছবির নিবিড় নিপুণ কারিগরের ছোঁয়া। মধ্যবিত্তের ছোট-বড় সুখ-দুঃখকে পরম আদরে তার লেখায় লালন করে ভিন্ন স্বাদের সাহিত্য বানাতে সক্ষম হয়েছেন। আর এইসব আদরমাখা লেখা পড়ে এই প্রজন্মের অনেকের চোখেই জল ঝড়েছে। সমাজের বড় বড় অসংগতি খুব সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তার কথাসাহিত্যে। প্রাঞ্জল ভাষা, স্বচ্ছ বিচার-বিশ্লেষণ আর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তি লেখাকে কী পরিমাণে শাণিত করে তোলে সাদত আল মাহমুদের উপন্যাস পড়লেই সম্মানিত পাঠক সেটা বুঝতে পারবেন। ২০১৯ সালের একুশে বইমেলা উপলক্ষে ছোট সোনামনিদের জন্য কাকলী প্রকাশিত ‘গগেন্দার গল্পের ঝুড়ি’ বইটি আসছে। এটি ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ বইয়ের প্যারালাল একটি বই।

"