রম্য গল্প

মামার কান্ড কারখানা

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

কামরুল ইসলাম ডিয়েম

নাহিদা সপরিবারে আমেরিকার প্রবাসী হলেও শিকড়ের টানে স্বামী-সন্তান নিয়ে বড় কোনো ছুটিতে দেশে এসে বেড়িয়ে যায়। দুই ছেলে মেয়েকে রীতিমতো বাঙালি সংস্কৃতির ছত্রছায়ায় মানুষ করেছে। যে কারণে নাহিদার পরিবার আমেরিকা বাংলাদেশ উভয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। নাহিদা জিল্লু দম্পত্তি এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ বছরের সামার ভেকেশনের ৩ মাসের ছুটিতে বাংলাদেশে কাটাবে।

নাহিদারা ৫ বোন ও একটি মাত্র ভাই। তাদের আগমনী বার্তায় অন্যান্য বোন ভাই ও তাদের ছেলে মেয়েরা উচ্ছ্বসিত এবং আবেগে আপ্লুত। নাহিদার মেয়ে জান্নাতি দশম শ্রেণিতে পড়ে খুব টেলেন্টেড এবং সব কাজ সুন্দরভাবে ঘুচিয়ে করে। যে কারণে অন্যান্য খালাত ভাই বোনেরা একসঙ্গে কোনো প্রোগ্রাম করলে ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পড়ে জান্নাতির ওপর। একমাত্র মামার খুব ভক্ত সে। আমেরিকা থেকে ও নিয়মিত মামার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে আর দেশে আসলে কথাই নেই। কেননা আম্মুর মুখে মামার অনেক রসালো কর্মকা-ের গল্প সে শুনেছে। তাই এবার জান্নাত প্ল্যান করেছে মামার কর্মকা-গুলো বিশেষ করে হাসির জিনিসগুলো ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আপলোড করবে। যেই ভাবনা সেই কাজ। বাংলাদেশে এসে মামাকে সে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং সঙ্গ দেয়। তাদের ছোট খালামনির সঙ্গে সব ভাগনা ভাগনীর বেশ ভাব। বরং শাসনের পরিবর্তে সোহাগের পাল্লাই ভারী। তাদের ছোটখাট ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে সবাইকে আগলে রাখে। যে কারণে সে ভাগনা ভাগনীর কাছে বন্ধুর মতো। কোলাহল পূর্ণ বাড়ির বিকেলের এক জম্পেস আড্ডায় তাদের ছোট খালা ভাইয়ার একটি ঘটনার বর্ণনা দেয়।

আমরা ৫ বোন প্রায় সবাই ছোটবেলা ভাইয়ার কাছে পড়তাম আর অনেক ভয় পেতাম। তোমাদের মামা ছোটবেলা থেকেই খেলাধূলা দেখায় প্রচ- আসক্ত। বিদেশের মাটিতে ফুটবলে আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনার সে খুব ভক্ত। দেশের মাটিতে ছিল মোহামেডান। ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে কাপ জয় করলে ভাইয়া আমাদের টানা এক সপ্তাহ ছুটি দেয়। আর যদি কোনো কারণে তোমার মামার দল হেরে যেত তাহলে তো গুরুগম্ভীর চেহারায় অগ্নিশর্মা হয়ে উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে নেমে আসত আমাদের ওপর। এতে পড়াশুনা ভালোভাবে হলেও বসিয়ে রাখতো আমাদের। অন্যদিকে নিজের নাওয়া খাওয়া বন্ধ রেখে পুরো বাড়িতে তোলপাড়। আবার একদিন বাসায় না বলে বন্ধুবান্ধব মিলে স্টেডিয়াম খেলা দেখতে গেলে ধরা পড়ে যায়। তাতে তোমার নানার শাসন হিসাবে কান ধরে উঠ বস করালে আমরা খুব খুশি হয়ে ছিলাম। এ কথা শুনার পরে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

ঈদুল ফিতরের ঈদের সালামি নিতে জান্নাতির নেতৃত্বে সব ভাইবোন (খালাত) একত্র। আমার কথা অবশ্যই সালামি পাবে। কিন্তু একটা সিস্টেম মতো। জান্নাতির প্রশ্ন, মামা কি সেই সিস্টেম? মামার উত্তর, প্রথমত তোমরা সবাই লম্বা লাইন করে দাঁড়াবে; ছোট থেকে শুরু হয়ে অতঃপর বয়স ভেদে বড়রা। দ্বিতীয়ত জিরো সাইজ থেকে শুরু করে ১০ বছর পর্যন্ত নগদ টাকা নয়, তাদের দেবো চকলেট, আইসক্রিম, চিপস। তৃতীয় ধাপে অর্থাৎ ১০ বছরের পরে থেকে শুরু হবে নগদ টাকার সালামি, তাও আবার সবার সমান নয়। বয়স ভেদে টাকা কম বেশি হবে। কেননা তোমাদের প্রেস্টিজ বলে একটা কথা আছে না? শর্তগুলো শুনে নেত্রী জান্নাতি বলে, মামা আমাদের ও সবার সঙ্গে কথা বলার দরকার আছে। ঠিক আছে তোমরা মিটিংয়ে বসে আমাকে জানাও। আমারও টাকা পয়সার হিসাব করে কতটা চিপস, চকলেট, আইসক্রিম ও নগদ টাকা লাগবে বের করতে হবে। এখনতো আর আমার এই বয়সে সালামি নেবার পালা নেই, শুধু দেবার পালা। এক মামা বলেই ঝড় ঝাপটা সব আমার ওপর দিয়েই। কিছুক্ষণ ভেবে জান্নাতি বলে, মামা আমরা রাজি তবে একটা শর্ত। আমি কিন্তু এই দৃশ্য ভিডিও করে স্ট্যাটাস দিয়ে ফেসবুকে আপলোড করব। কারণ বিশ্ববাসী দেখুক তোমার কীর্তি! এটা কি হিসাংত্মক নাকি রসাত্মক?

মুসলমানদের আরেক ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহার দিন সমাগত। এই ঈদের কয়েকদিন পরেই জান্নাতির ছুটি শেষ। তারা চলে যাবে। জান্নাতি বলে মামা শেষ ভালো যার সব ভালো তার। অর্থাৎ এই ঈদে কোনো চমক নাই? মামা বলে অবশ্যই আছে। সে বায়না ধরে আছে মামা আমি এবার নিজে গরুর হাটে যাবো। আমেরিকাতে কোরবানি দেই বটে। কিন্তু সেখানে এই মজাটা হয় না। কেননা পশু নির্দিষ্ট কসাইখানায় দিয়ে দিলে তারা সব কমপ্লিট করে বাসায় পৌঁছে দেয়। সুতরাং এতে আনন্দ পাওয়া যায় না, তাই নাছোড়বান্দা মামার সঙ্গে অন্যান্য বন্ধুবান্ধব ও ভাই বোনদের নিয়ে গরুর হাটে যাবে। মামা বলে ঠিক আছে তাই হবে। তবে একটা শর্ত, কি শর্ত মামা? বলে জান্নাতি। যাবো সবাই গাড়িতে করেই কিন্তু ফিরবো গরুর সাথে পায়ে হেটে রাজিতো সবাই? জান্নাতি আনন্দচিত্তে রাজি হলেও তার অন্যান্য বন্ধুবান্ধব ও ভাই বোনেরা একটু আমতা আমতা করে বলে হেঁটে হেঁটে আসতে কষ্ট হবে না? সে সবাইকে সাহস দিয়ে বলে এই কষ্টে আনন্দ আছে। আমি অভয় দিয়ে বলছি, নিশ্চয় এখানে একটা রহস্য আছে। কারণ মামার কোনো চমকের আগে আমি তার পূর্বাভাস পাই এটা মামার ওপর আমার সাইকোলজি। এরই মধ্যে মামা বলে উঠে, তাহলে তোমরা সবাই যাবার জন্য প্রস্তুত? হ্যাঁ প্রস্তুত। তাহলে জান্নাতি সঙ্গে করে বড় দেখে দুটি আর্ট পেপার আর একটা রং পেন্সিল বা সাইনপেন নিয়ে নে। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে জান্নাতি- দেখেছিস তোরা কিছুক্ষণ আগে... আমি বলেছিলাম না, মামার চমকের পূর্বাভাস আমি বুঝি। দেখো শুরু হয়ে গেছে। মামা শুনে বলে, এর বাস্তবায়ন হবে গরুর হাট থেকে। তাহলে চলো রওনা দেওয়া যাক। গাড়ির মধ্যে সবাই একে অপরের দিকে বিস্ময়াভূত তাকিয়ে বলতে থাকে মামা আমাদের তো মাথায় ঢুকছে না কি চমক দেখাবে তুমি? কয়েকটি গরুর হাট যেমন কমলাপুর, আফতাব নগর, শাজাহানপুর ঘুড়ে পছন্দমতো গরু কিংবা দাম দরে পছন্দ না হওয়ায় অবশেষে গাড়ি গিয়ে থামানো হলো গাবতলীতে। সবাই হই হুল্লোড় করে নেমে মামাকে সঙ্গে করে পশু পছন্দ করা শুরু করলো। ইতোমধ্যেই জান্নাতির পছন্দের সঙ্গে অন্যান্য সবাই একমত পোষণ করল ও পুষ্ট একটি গরু পছন্দ হলো। সর্বসাকূল্যে দাম পড়ল ১ লাখ টাকা। মামা জান্নাতিকে কাছে ডেকে এনে বলে, জান্নাত এবার দুই আর্ট পেপারের মধ্যে সুন্দর করে লিখ আমার দাম এক লাখ টাকা। অতঃপর আর্ট পেপার দুটো গরুর দুপাশে অর্থাৎ পেটের দুই দিকে ইসকসটেপ দিয়ে লাগিয়ে দাও। কারণ রাস্তা দিয়ে গরুর হাঁটার সময় সব লোকজনই জিজ্ঞেস করে ভাই কত দিয়ে কিনেছেন? তোমাদের আর কষ্ট করে বলতে হবে না। মামার এই কর্মকা- দেখে সবার হাসতে হাসতে পেটের খিল ধরে যায়। আর যথারীতি জান্নাতি মোবাইলে ডাইনলোড করে ফেসবুকে পোস্ট করে। আর বলে উঠে, মামা, তুমি পারও!! আসার পথে লোকজন অবাক বিস্ময়ে, হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে।

"