প্রতীক ইজাজের

ধান কাউনের কাব্য

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

কবিতা গল্প গদ্য। সবই ছবি। সুপাঠ। এসব কিছুই লিখি আবৃত্তি ও গানের জন্য; সুপাঠের জন্য। দেখি আর লিখি। লিখি আর দেখি। দেখতে না পেলে লিখতে পারি না। গাইতে পারি না। অস্পষ্ট লাগে। প্রথমে নিজের জন্য, পরে পাঠক। নিজের ভালো লাগলে পাঠকেরও ভালো লাগবে নিশ্চয়। আমিও তো পাঠক। সেই ভাবনা থেকেই লেখা। ঠিক গুছিয়ে নয়; এলোমেলো। তবে পরম্পরা চলে আসে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। একটা সাযুজ্য খুঁজে পাই ব্যক্তি থেকে সামষ্টিকে। এভাবেই এক দিন গীত হয় মঙ্গল বন্দনা। বাতাসে ভাসে হেমন্তের নতুন ধানের গন্ধ, নবান্নের ঢাক।

 

ভাসান যে দাও, সে কোন বন্দরে ভেড়ে নাও, পানসি, বণিকের দল? কে কারে ডাকে চাঁদভাঙা জ্যোৎস্না গায়? কালো জলে ফণা তুলে কে দেখে মনসার নাচন? পাড়ভাঙা ঢেউ, হঠাৎ ক্যান বুকসমান জল নিয়া লাফ দেয় আসমানে? লাল চোখ মনসা ক্যান ছোড়ে ভ্রুক্ষেপের আগুন? ক্যান মানুষ প্রাণহরি জলে ডুব দেয় সাগরে? সপিয়া মানত অঞ্জলি দেয় খোলা পিঠ আচলা জলে? সে কি জানে না, না মিলিলে মন্ত্রতন্ত্র, বিষহরি সর্প দংশনে যাবে প্রাণ?

 

তবুও কালিদাসে ভাসে চাঁদ সদাগরের নাও। আশায় বুক বাঁধে আধভাঙা মানুষ।

মাঠজুড়ে সোনার ধান। গায়ে ধান ভানে ঢেঁকি। গীত হয় গান। রোদে পোড়া সোনার গতর বাতাসে ছড়ায় যে রঙ; আজ তার বরণের পালা। বিশ্বাসে বুক বাঁধে মানুষ। হাড় জিরজির সংসারে এবার বুঝি ওঠে গতরে মাংসের তুফান; এবার বুঝি নাচে নাকছাবি; উঠোনে নাচন ধরে ছেলেপুলের দল; লকলক জ্বলে ওঠে চুলার আগুন। বহু দিন বহু সন্ধ্যায়, আধপেটা অভুক্ত মানুষ, পেটে নিয়া আশার স্বপন, ঘুমাইছে ছেঁড়া কাঁথা গায়। ঘরের চালায় এবার বুঝি পড়ে ক্ষ্যাতের খড়। জানালা হয়। দরজা হয়। লাল-নীল সুতোয় নকশি ওঠে কাঁথায়। শাড়ির শক্ত বুননে এবার বুঝি ঢাকে সোনা বউয়ের ইলিশের মতো চকচকে গতর! নাকি-

 

নাকি গরজরিপার এবারো ডোবে সপ্তনাও বণিকের? এবারো কি ছোবল দেবে ত্রিবেণী কালসাগরের সর্বভুক জল? মন সায় দেয় নায়। তাই সপেনি প্রাণ পূজা তাহারে। তাই বলে কি রক্তে বোনা বীজ ফসল দেয় নায়? দেয় নায় মাঠভর্তি ফল? তয় কিসের তোড়ে বারবার এমন ছোবল মনসার? কে কারে পূজা দেয়? কে মানে কারে? কেউ কি জানে-কত মাঝরাত পেটে নিয়া ক্ষুদা, চাঁদভাঙা জ্যোস্না গিলছে মন! মাঠের পর মাঠ ধান পাট কাউন। স্বপ্নেও চাষ দেয় কিষান। হাল টানে। লাঙলের ফলায় চাষে মাটি। পাশে সোনার গতর চাষ হয় না বহু দিন। রাত-বিরাতে উসখুস করে শরীর। মন যখন উচাটন, বিষে নীল শরীর সটান পইরা ঘুমায় কলাগাছের ভেলার লাহান!

 

বহু দিন এই গায়ে ধানের গন্ধ নাই। শুকনা পাতা পোড়ানোর ঘ্রাণ নাই। বিকেলে সোনা রোদে পিঠ দেয় না মেলে বৌ-ঝিরা। জমে না গল্প উঠান। বাতাবি নেবুর ফুল কাড়ে না মন। কামিনী টানে না সাপ। মরণক্ষুধা কালকেউটে নেয় না ঘ্রাণ ছুড়ে লকলকে জিব। ওড়ে না রুমাল বুকের ভেতর। অন্তঃজলে পা ডোবায় না কিশোরী। একরত্তি জলপুকুরে নাও নাচে না। গোলা তার শূন্য থাকে ধানের আশায়। গান ধরে বেহুলা-

‘কী সাপে দংশিল লখাইরে

তার বর্ণ হইলো কালা

রে বিধির কি হইল’

 

তবুও হেমন্ত আসে। হঠাৎ বৃষ্টির পর ছাতিমফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসে দক্ষিণের বাতাসে ভর দিয়া একদিন। জীর্ণ শরীরের লাহান পড়ে থাকা সড়কের পাশে ছেঁড়া কম্বল বিছায় গেরস্থ। রোদে পোড়ে পোকামাকর, পুরান গন্ধ। বাজারে সবজি ওঠে। ঠোঁটে নিয়া ভেজা বাতাস নির্জন সন্ধ্যায় শিষ দেয় কেউ। প্রাণ কাড়ে। পেটে মোচড় দেয় পুরনো গন্ধ। স্বপ্নে ভাসে নতুন চালের নতুন ভাতের ঘ্রাণ!

 

চোখে ঘুম নাই। রাতভর ডাকে সোনা রঙ ধরা পাকা ধান। সাত-সকালেই কিষান ছোটে ক্ষ্যাতে। পা ধোয় সবুজ ঘাসে জমা শিশির। ঝরা শিউলি ছড়ায় সৌরভ। জল কমে আসা ডোবানালায় নুয়ে পড়ে জংলা বরইগাছ। কানে বাজে যে ছড়া গান, কিষান কি জানে কোন দূর অতীতে কোনো এক নবান্নে প্রাণ বেঁধেছিল কোনো এক কবিয়াল-

‘আহা! কোথায় গেল সেই দিন। ছেলেপুলের দল কলাপাতার পাতে নিয়ে নবান্ন ছুটিয়া চলিল মাঠে। গোয়ালঘরেও ছুটিয়া চলিল কেউ। বছরজুড়ে দুধ দেয় যে গাই, চনা গোবরে লেপে উঠান, সেই গোয়াল ঘরেও নবান্ন। কেউবা শৃগালের জন্য চাট্টি চাল, খান দুই শাকালু ও এক টুকরো পাকা কলা লইয়া বাঁশ বনে কিংবা শেওড়ার জঙ্গলে ফেলিয়া আসিল।’

 

আজ আবার ডাক পড়ে। ডাকে কেউ। ডাক পড়ে কালিদহে। স্বপনে ভাসায় ধানের নাও এক দিন ডাক দিছিল মানুষ। কাচা দিয়া লুঙ্গি-ধুতি, পোড় খাওয়া প্রাণ, উড়ায় দিছিল আকাশের নীলে। লালে লাল আসমান। লাল জমিন। আশটে শরীর। বাতাসে ভাসে শঙ্খ। বুকে জাগে ঝড়। পাখির ডানায় নিয়া দারুণ শক্তি, আধপেটা মানুষ নামে পথে। চোখে সিংহের সাহস। লাল কৃষ্ণচূড়া। মাঠ নাই। ধান নাই। শরীর পোড়া ঘামে রাতভর বোনে বীজ; তার ফসল যায় মহাজনের গোলায়। ওঠে গগনবিদারী ডাক-

‘জোতদার খোলানে নয়

এবার ধান উঠিবে ধান, ভাগচাষির বাড়িতে।’

 

তোলপাড় ওঠে জলে। তোরঙ্গ জ্বলে। জ্বলে মাঠ। গুলি চলে। শপাং শপাং চাবুক। কান্দে বাতাস। লালপিঠ আধভাঙা মানুষ মরে। মরে কৃষক নেতা তন্নারায়ন, চিয়ারশাই, ভাগচাষি সর্বেশ্বর। ঘুমের ঘোরে যেমন মরে লখিন্দর; ত্রিবেণীতে ডোবে চাঁদবণিক; তেমনি মরে নিঃস্ব শিবরাম, সমিরউদ্দিন। হাসতে হাসতে মরণের কাছে সঁপে দেয় প্রাণ রাসমণি, শঙ্খমণি, রেবতিরা। রক্তে বোনে গান কৃষক বধু-মাতা-কন্যা। লাঙলের ফলায় জ্বলে মাটি। হেমন্তের হলুদ মাঠ বান্দে ধান কাউনের কাব্য। আগুনের ফুলকি, ঝলকে ঝলকে ওঠে রুপার নাকছবি। মাঠ জ্বলে খড় পোড়া আগুনে। ঝকঝকে তকতকে লেপা উঠানে বৃত্তাকারে মানুষ গায় বাতাসে উড়ায় দিয়া শতেক জীবনের গান। ঠোঁট নড়ে। চোখ জ্বলে। বুকের তোরঙ্গে নাচে আসমানি সুখ।

 

আহা! কত দিন এ গায়ে ঘুমায় না মানুষ অস্তাচল ফিরে আসা রাতে।

আঙুলের গিঁটে গিঁটে ফেরার তাগাদা নিয়া কত দিন আঁকে না নকশি উপোসি বউ। কত দিন এ গায়ে আঁকশির মতো বুকের ভেতর মস্ত সুখ নিয়া আসে না কার্তিক। ধানের কুড়া মুখে ভোরের লালিমা নিয়া ডাকে না লালঝুটি মোরগ। কত দিন দশমী তিথি নবমী চান্দের সোনালু বরণ খবর জানে না এ গায়ের লোকে! কত দিন, আহা, কত দিন!

 

[একটি বিশেষ পঠনরীতিতে লেখা]

"