প্রকৃতির আধো-হিম প্রেমিকাই হেমন্ত

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

জোবায়ের মিলন

প্রকৃতির একটি নিজস্বতা আছে। সে নিজের মতো করে তার কক্ষপথে ঘুরে বেড়ায়। এই বেড়াতে গিয়ে যেখানে যখন যেমন প্রয়োজন সেখানে তেমন পোশাক পড়ে আবির্ভূত হয়। শরীর থেকে রং ছড়ায়। সে রং নানান রং। নানান তার বৈশিষ্ট্য। প্রকৃতির এই মনের বদল, শরীরের বদল, ভাবের বদল, প্রভাবের বদলই ঋতু। ঋতু আবার খুব খেয়ালি গ্রাম্যকিশোরী। কাকন হাতে, নূপুর পায়ে, চুলে বেণী গেঁথে মেঠোপথ ধরে চপল পায়ে দৌড়ে চলে। চঞ্চল তার গতিবেগ। নিটোল তার হাবভাব। ভাবের পালে বাতাস দোলায় তার মনের মতো। নাগরদোলার মতো দুলে দুলে ঘুরতে থাকে। আনন্দময়ীর আনন্দগীত যেন ছিটে ছিটে পড়ে বিন্দু বিন্দু শিশির ফোঁটার মতো। যেখানেই পড়ে সেখানেই ছড়িয়ে যায় আলতো করে, আর রুপার বর্ণের মতো একটা রং হেসে ওঠে ঠিক শিশুর হাসি যেমন। কখনো এই হাসি অট্টহাসি, কখনো এই হাসি মুচকি, কখনো এই হাসি রোদেল হাসির মতো সোনা-রং-ধরা। নগর পথেও বালকের মতো তারে দেখা যায়। বাউ-ুলে মেজাজে। আবেশ পাওয়া গেলেও তার মনের বিধি ধরা কঠিন। শান্ত, নিরিবিলি, চুপচাপ কোনক্ষণে হয়তো ধরা যায়, আবার ধরা যায় না। এ বালকের চোখ, মুখ, শরীর দেখে সঠিক বোঝাও যায় না এখন প্রকৃতির কোন্ কাল। তবে ভজনরূপী প্রকৃতি-প্রেমিক মাত্রই সূর্যের গাও দেখে, তাপের মাত্রা বুঝে, বুঝে যায় কোন্ খেলা খেলিছে মাঠে প্রকৃতির দীক্ষিত মনন।

ষড়ঋতুর এ দেশে শরৎ শেষে আসে হেমন্ত। মধ্য দুপুরের রোদের তেজ কমে পৌঢ়ের চিন্তির, শান্ত, ধীর পায়ের বিকেল নামে। বিকেলে উত্তর থেকে তিরতির করে আসে বাতাস। বাতাসের গায়ে সামান্য হিম। টানটান শরীরে চটচট অনুভূতি। ঠোঁট ফাটার চিনচিন ব্যথা। সন্ধ্যা আসতেই চকচক কৃষ্ণকলির বদলে একটা নেতানো কালো জেঁকে বসে। পাতায় জমা ধুলোর মতো চারপাশটা মলিন ময়লা বদনে ঘরের কোণে আশ্রয় নেয়। ভেজা ভেজা একটা কুয়াশা-চাদর মুড়িয়ে যায় নিবিড়ভাবে। পথের মানুষরা কাজের ফিরিস্তি ফেলে চায়ের দোকানে আড্ডায় বসতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে অধিক। গভীর গ্রামে কৃষাণিরা গরম কাপড় গায়ে জড়িয়ে গৃহকাজে মন দেয়। দিনের আলো সংক্ষেপিত হওয়ায় প্রাকরাতে সেরে নেয় আরো কিছু হাতের কাজ। বালক-বালিকারা সেন্টু-গেঞ্জি ছেড়ে নামায় ফুলহাতা জামা। সন্ধ্যা বাড়ে, রাত ঘনায়, বৃক্ষের পাতা বেয়ে টিনের চালে টপটপ করে পড়ে শিশির, শব্দ হয়। কুয়াশা ঘন হয়। শিশির জমে মাঠের ঘাসে। শীতের অনুষঙ্গরা দেখা দেয় ধীরে ধীরে। হেমন্ত শীতের পূর্ব ঋতু। পূর্বাভাস দেখা দেবে এটাই সত্য, স্বাভাবিক। সে স্বাভাবিকতায় প্রকৃতিজুড়ে নমনীয় একটা রূপ জেগে ওঠে ভিন্ন রূপে। যে রূপ শরতের নেই, যে রূপ বর্ষার নেই, যে রূপ গ্রীষ্মের নেই, যে রূপ বসন্তের নেই, যে রূপ শীতের নেই। হেমন্তের রূপ স্বতন্ত্র। অরূপ এক রূপ। প্রশান্তির রূপ। ভাদ্রের কাঠফাটা রোদের অতিষ্ঠতার শেষে হালকা হিমের নরম এক রূপ। শান্তির এক রূপ। হিমঝুড়ি ফুলের এক রূপ। এই রূপকে কাগজে লিখে, মুখে বলে, ছবির ফ্রেমে দেখিয়ে, চিত্রের পটে এঁকে, নাট্যের বর্ণনায় ব্যাখ্যা করা যায় না। বলা যায় না। সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা যায় না। কী কবিতায়, কী গল্পে, কী উপন্যাসে, কী নাটকে, কী সিনেমায় তুলে ধরে তুলে আনা যায় নাÑ হেমন্তের সেই ধানের জমির সৌন্দর্য, সেদ্ধ ধানের রূপ, প্রথম ভাতের গন্ধ। হেমন্তের শরীর দেখতে হলে কাঁচা-মাটির দেশে যেতে হবে। পাড়া-গাঁয়ে যেতে হবে। যেখানে এখনো পিচের ছোঁয়া লাগেনি সেই পথে যেতে হবে। আজানেরও আগে ঘুম ভেঙে বিস্তীর্ণ মাঠে নামতে হবে। খালি পায়ে চলতে হবে। হাতের কাছেই কুয়াশার দেয়াল, দুহাতে সরিয়ে সরিয়ে সামনে বাড়তে হবে। মুখে, শরীরে জলের ভেজা ভেজা শিশির, চোখের পাতায় জমা ছোট্ট জলকণা, কয়েক পা পরেই কিছু দেখা যায় না। ঘাসের মাথায় বড় ফোঁটা, পা পিছলে যায়, হোঁচট খায়, অনেক সময় বোঝা যায় নাÑ এ কি শীত না হেমন্ত? এমনই এক পারত্রিক সৌন্দর্য হেমন্তজুড়ে। যে অভাগা কাঁচের শার্সিতে ঘেরা শহর ভেন্যুতে জন্ম নিল, পাকা রাস্তায় বেড়ে ওঠে বড় হলো, পিৎজা ও বার্গারে পুরে নিল পেটের ক্ষুধা সে জানে নাÑ এই বাংলায় কী রূপ নামে ঋতু-হেমন্তের পর্বে পর্বে। সে জানে না হেমন্তের আঙুলে কোন্ রমণীয় বিভা খেলা করে অলৌকিক ভঙ্গিমায়। যে অভাগার সময় কাটে আধুনিক ইলেকট্রনিকস মেকিতায় সে জানে নাÑ কী আনন্দ ফেলে যাচ্ছে তুচ্ছ অবহেলায়, কী রূপ থেকে সে বঞ্চিত হচ্ছে নিজেরই আবেগে, অবজ্ঞায়। জানবেও না কোনো দিন। যারা না জানে, না জানতে চায়, বঙ্গমৌলিকতা তার জন্য পথ চায় না। ঋতু বসে থাকে না কোনো দুর্ভাগার কপালে চুমু আঁকতে। হেমন্তও না।

কাত্তিকা তারার নামে কার্তিক, আর্দ্রা তারার নামে অগ্রহায়ণ এই দুই মাসে হেমনস্ত ঋতুর বসবাস বিধায় প্রকৃতির নিয়ম ধারায় এই দুই মাসে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক চিত্র ভেসে ওঠে। হেমন্তকে মূলত ধানের ঋতু হিসেবে গণ্য করা হয়। গ্রামবাংলার জনপদে ধানের মৌসুম হিসেনেই একে ধরে নেওয়া হয় আজও। আউশ-আমন ধান এ ঋতুর প্রধান ফসল। কার্তিকে এ ধানে সোনার রং লাগে, অগ্রহায়ণে কেটে বাড়ি তোলা হয়। অঞ্চলভেদে কিছুটা আগপিছ হলেও এ সময়েই ঘরে তোলা হয় নতুন ধান। উঠানে শুকিয়ে, সেদ্ধ করে ভাত রান্নাকে কেন্দ্র করে হিমকন্যার হেমন্তে বসে নবান্ন। উৎসবে উৎসবে মেতে ওঠে সারা বাংলা। পিঠা পায়েশ, মিঠা মন্ড ইত্যাদিতে ভরে ওঠে হাটবাজার, ঘর গেরস্থালি। কন্যা আসে বাপের বাড়ি, নাইয়র হয়। জামাই আদরে প্রতিটি ঘর জমে ওঠে অতিথি আপ্যায়নে। ঘরে ঘরে আনন্দযজ্ঞ। খাবার আসে, নতুন জামা আসে, কৃষক হাসে, কৃষাণি শাড়ি পরে, সব নতুন লাগে চাররঙা ঘুড়ির মতো। গোলায় ধান হাসে, মাঠে শান্তির বাতাস বয়ে যায়। নিশ্চিন্তের বাঁশি বাজে খেতের আলে। সারা বছরের হিসাব মিটিয়ে কৃষক যখন নির্ভার হয়, তার বুক থেকে যখন নেমে যায় জাগতিক গণিতের ভার, তখন তাকে যে কী সুন্দর দেখায় তা হেমন্ত জানে, হেমন্তের যে কী রং হয়। গোলাপি পোলাপি, বাদাম বাদাম, স্বচ্ছ জলের মতো চকচক তা অঘ্রাণ জানে। খোলা মাঠে মাঠে, উঁচ জমিতে, বাজার কেন্দ্রে কেন্দ্রে বসে সুখের মেলা। সে মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে ফেরিওয়ালা আসে। যার যার পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে। ক্রেতা আসে সে বাজারে, ফেরিওয়ালার কাছে, কথায় কথায় কত কী যে বেচাকিনি হয়। কত কত আনন্দের ডিঙি যে সাজে সে মেলাতে। নাগরদোলা, শখের চুড়ি, মিষ্টি দোকান, লাল ফিতা, কাকন বালা, রাঙা চশমা কী থাকে না সেখানে! ঘরের মেয়েরা দল বেঁধে মেলায় যায়, বাইস্কোপ দেখে, ফিতা কেনে, বধূরা জা’র সঙ্গে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় ঘুরে আসে দেবর-ভাসুরের চোখ আড়াল করে। ছেলেরা নামে কাবাডি খেলায়, সাঁতার খেলায়, গরুর দৌড় খেলায়। কাজের ভার কম থাকায় আনন্দ আর আনন্দ, কে দেখে সে সুখের বাঁশি। উঠানে উঠানে পুঁথি পাঠ, যাত্রাপালা, কিচ্ছার মজমা হরেক পালা বসে চাঁদের আলোয়। শিশু-বৃদ্ধ-কিশোররা সে পালায় অংশ নেয়। উল্লাস উচ্ছ্বাস ভাগ করে নেয় সবাই সমান ভাগে। যদিও গ্রাম ক্রমে নগরে পরিবর্তিত হওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে তবু এর ছাপ দেখা যায় অনেক গ্রামেই। নগর পার্শ্ব গ্রামে এ চল উঠে গেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিছুটা বাকি আছে এখনো। এখনো তারা হেমন্তকে ধানের ঋতু বলে প্রার্থনা করে। উৎসব করে। পাড়ায় পাড়ায় আয়োজন করে। এ চিত্র গ্রামের চিরদিনের হলেও মফস্বল থেকে শহরেও এ আচার-অনুষ্ঠান চোখে পড়ে অন্য আঙ্গিকে। চিরায়ত এ ছবি দেখা যায় ফাঁকে ফাঁকে বোনা। শহরের মানুষরা ধানের সঙ্গে শেকড়ে বাঁধা নয় বলে তারা জানে নাÑ কখন ধানের ঋতু, কখন কাশের ঋতু, কখন বর্ষার ঋতু, কখন জাগরণের ঋতু। তারা কেউ কেউ সময়কে তপস্যা না করলেও সংবাদ শুনে প্রস্তুত হয়, সাজে, সে মতে বেড়াতে বের হয়, আয়োজনে নাচে, গান গায়, কবিতা পড়ে, গল্প শোনে, টিভিতে কথা বলে; মনের অজান্তে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছার আবেগ প্রকাশ করে। জীবন-জীবিকার ব্যস্ততায় তারা হয়তো মেলায় গিয়ে নাগরদোলায় চড়তে পারে না। তারা হয়তো আউশ ধানের গন্ধে মাতাল হতে পারে না। তারা হয়তো আমন ধানের ফিন্নি পাকায় না। কিন্তু তারা কুয়াশায় ভেজা ঘাসে হাঁটতে চায়। তারা হেমন্তকে ডেকে বাড়ির ছাদে চাঁদের রাতে প্রিয় মানুষের সঙ্গে চা খেতে বসতে চায়। দিন তারিখ মাস তারা ভুলে গেলেও জানালায় জল লাগলে তারা বুঝে শীত আসছে। শেষ রাতে বৈদ্যুতিক পাখা বন্ধ করে দিতে হলে তারা বুঝে হেমন্তের আগমনবার্তা। গায়ের লোশন পাল্টাতে হলে তারা জেনে যায় এখন ঋতুতে হিম। অলিগলি বা প্রাণকেন্দের নবান্ন উৎসবে যাওয়ার প্রস্তুতি তারা নেয়, সেখানে তাদের সন্তানকে হেমন্ত চেনাতে পিঠা পায়েশ খাওয়ায়, মঞ্চের সামনে বসে কোলের শিশুটিকে বা কিশোর সন্তানকে জানায় তার জানা ঋতুভিত্তিক কিছু কথা। এ দৃশ্যগুলো আমরা অন্য ঋতুর সঙ্গে হেমন্তেও দেখি। এটা বাংলার চিরায়ত রূপ। সেই যে ধানের জমি, নাড়া পোড়া আবার এই যে বকুল তলায় বসে মেকি হেমন্ত সাজিয়ে প্রাণহীন নবান্ন আয়োজনÑ এও হেমন্ত ঋতুর বৈশিষ্ট্য। বাংলার বৈশিষ্ট্য। একে আমরা কোনোভাবেই বাদ দিতে পারব না। সরিয়ে দিতে পারব না। পারব না বলেই একেও বলি হেমন্তের রূপবিভার এক অনিন্দ প্রকাশ।

ধানের ঋতু, সে নয় একমাত্র পরিচয়। ফুল ফলেও হেমন্ত অন্য ঋতুর চেয়ে আরেক অঙ্গ শৈলীতে সাজে। তার রয়েছে আপন বৈশিষ্ট্য। ঋতুভিত্তিক বৈশিষ্ট্য, যা অন্যের থেকে আলাদা। যা হেমন্তকে চিহ্নিত করে নিজস্বতায়। বকফুল, ছাতিম, রাজ অশোক, শিউলি, কামিনী, মল্লিকাসহ আরো কত যে নাম না জানা সতেজ ফুলের গন্ধে ভরে হেমন্ত তা অনুচ্চারিত। ফলে তাকেও চেনা যায় তার মতো করে। সজিব ফসলে ভরে ওঠে মাঠ। টাটকা সবজিতে সবুজ হাসি হাসে খোলা প্রান্তর। যেদিকে তাকাই সেদিকেই শুদ্ধতার পরিবেশ। পরিম-ল। দীর্ঘ বেঁচে থাকার আহ্বান। বাতাসে জীর্ণতা, ধুলায় মলিনতা, গায়ে গতরে বার্ধক্যের রেখা দেখা গেলেও বসবাসে খুব নাতিশীতোষ্ণতায় একটা প্রাণ যেন জেগে ওঠে ক্লান্তিময়তায়। ঝরঝরা এক ভাব যেন অবয়বে। ক্ষুদ্র দিনের আকাশ মেঘমুক্ত এক বিছানা, আধো সাদা মেঘ কোদালি ঢঙে ভেসে বেড়ায় তাদের ছন্দে। কোথাও থাকে, কোথাও থামে না। শীতের মতোই ধীর লয়ে চলে। রোদের কোমলতায় মেঘও মিশে থাকে ঊর্ধŸাকাশে। এই ঋতুতে কোনো গাঁয়ে হালকা কাঁপন দিয়ে শীত নামে আবার কোনো কোনো গাঁয়ে ভারী কুয়াশা ঘিরে থাকে জমির উদ্যান। যেখানে বৃক্ষের সমাগম, যেখানে লতাপাতার জঙ্গল, যেখানে ঘাসের জমিন, যেখানে খোলা প্রান্তর, যেখানে খালি মাঠ, যেখানে সবুজের আধারÑ সেখানে হেমন্তের সত্যি রূপ দেখা যায় মন ভরে। সেখানে হেমন্তচিত্র নামে আসল রূপ নিয়ে। নগরায়ণে এ ঋতু শুধু নয়, কোনো ঋতুর চিত্রই ধরা দেয় না। বেলা-অবেলায় কিছুটা আঁচ করা যায় মাত্র।

"