১৬ অক্টোবর গুন্টার গ্রাসের জন্মদিন

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

হিমেল আহমেদ

গুন্টার গ্রাস। যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্টাইলিশ গোঁফ আর মুখে মোটা তামাকের পাইপ গুজিয়ে রাখা সাদাসিধে একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি। নোবেলবিজয়ী এই সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেন ১৬ অক্টোবর ১৯২৭ সালে। ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল ৮৭ বছর বয়সে ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আর সেইসঙ্গে অবসান ঘটে জার্মান সাহিত্য তথা বিশ্বসাহিত্যের একটি অধ্যায়ের।

কিংবদন্তি এই সাহিত্যিক জন্মেছিলেন বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে আর প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সাহিত্যকে ব্যবহার করা শেখাতে। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য টিন ড্রাম’-এর জন্য বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। বহুল আলোচিত ট্রিলজির স্রষ্টা তিনি। ‘ক্যাট অ্যান্ড মাউস’ ও ‘ডগ ইয়ার্স’ এই ট্রিলজিতে অন্তর্ভুক্ত। ‘দ্য টিন ড্রাম’ বইটি জার্মানির ডানজিশ শহরের পটভূমিতে লেখা, যে শহরটিতে গুন্টার গ্রাস বেড়ে উঠেছেন। তিনটি বইয়েই তুলে আনেন তার নিজের শহর ডানজিশে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর উত্থান ও নির্মমতার কথা। ডানজিশ শহরটি এখন অবশ্য পোলান্ডে পড়েছে, নাম গদানস্ক। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে জন্ম এই সাহিত্যিকের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে তার লেখা উপন্যাসমূহ জনপ্রিয়তা পায়। তার এই তিনটি উপন্যাস যেন বিশ্ব জয় করে ফেলল! বিশেষ করে ‘দ্য টিন ড্রাম’, যেখানে উঠে এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার বাস্তব চিত্র।

গুন্টার গ্রাস শুধু একজন মেধাবী ও বিশ্বমানের লেখক ছিলেন তা নয়, তিনি একজন সমাজ বিশ্লেষক। তিনি একাধারে ছিলেন কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর। ছিলেন কঠোর প্রতিবাদী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন সর্বদা। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর তীব্র সমালোচক ও বিরোধী ছিলেন। এই সাহিত্যিক মনে করতেন, ‘বুশ এই যুদ্ধের নামে ধর্মকে ব্যবহার করছেন। নিরীহ হত্যায় মেতে উঠেছেন।’ সর্বদা সত্যকে আঁকড়ে চলতে পছন্দ করতেন তিনি। এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘যতই বছর যাচ্ছে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, দিনের পর দিন আমরাই স্বয়ং বিনাশের সম্ভাবনাকে প্রকটরূপ ধারণ করাচ্ছি। এমন অবস্থা কিন্তু পূর্বে বিরাজমান ছিল না। এটা বলা হচ্ছে যে, প্রকৃতি দুর্ভিক্ষ-খরা সৃষ্টিকারী অথচ দায় রয়েছে অন্যত্র। দায়ী মানুষ, এই আমরাই।’ তিনি বলেন, ‘এখন আর প্রকৃতি নয়, প্রথমবারের মতো আমরাই দায়ী, মানুষের অপার সম্ভাবনা এবং ক্ষমতাও রয়েছে এই আমাদের নিজেদের স্বয়ং ধ্বংস বা বিনাশকরণে। আমরা এখনো কিছুই করছি না এই বিপদ এড়াতে। এ সবকিছু একসঙ্গে আমাকে উপলব্ধি করিয়েছে যে, আমাদের সবকিছু সসীম অথচ আমাদের হাতে অফুরন্ত সময় নেই।’ মানুষ যে স্বয়ং নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে তা খুব সুক্ষ্মভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করতেন এই সাহিত্যিক। তাই আওয়াজ তুলেছিলেন বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। আফগানিস্তান ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলেরও কড়া সমালোচক ছিলেন। এ জন্য ইসরায়েল অপছন্দ করত গ্রাসকে। হিটলারের ইহুদি দমন মিশনে জড়িত থাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি।’ ইসরায়েলের সমালোচনা করে ২০১২ সালে ‘হোয়াট মাস্ট বি সেইড’ নামের একটি গদ্যকবিতা লেখেন; যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। যেখানে তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেখেন। ইসরায়েল তখন গ্রাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টি-সেমিটিজমের (ইহুদিবাদবিদ্বেষী) অভিযোগ এনে তাকে এবং তার কবিতাকে দেশটিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী আর মেধাবী ছিলেন গ্রাস। পড়াশোনা করেছেন ভাস্কর্য ও গ্রাফিকস নিয়ে। তবে তিনি ছিলেন শখের ভিজুয়্যাল শিল্পী। তার লেখা আর শিল্পে বারবার এসেছে জার্মানির অতীত ইতিহাস আর নির্মমতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। মার্কিন সেনাদের হাতে ধরা পড়ে ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই বছর বন্দি ছিলেন। পরে মুক্তি পেয়ে খামার শ্রমিকের কাজ করেন। পরবর্তীকালে চিত্রকলা নিয়ে পড়াশোনা করেন ডুসেলডর্ফ ও বার্লিনে। ‘পিলিং দ্য ওনিয়ন’ নামে ২০০৬ সালে একটি আত্মজীবনী লিখেছিলেন এই নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। সেখানে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা গোপন রাখার ব্যাখ্যা দেন। এবং তিনিও যে ইহুদিবিরোধী তার প্রমাণ মেলে। গ্রাস তার প্রতিবাদী লেখনির জন্য বিখ্যাত। সাহিত্যে সবচেয়ে গৌরবময় নোবেল পুরস্কার পান ১৯৯৯ সালে। পুরস্কারটি দেওয়ার সময় সুইডিশ অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘গুন্টার গ্রাস তার সাহিত্যে নিপুণ হাতে ‘ইতিহাসের বিস্মৃত বাস্তব মুখচ্ছবি’ এঁকেছেন।’ বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে রচিত তার উপন্যাস ‘দ্য টিন ড্রাম’-এর জন্য নোবেল পান।

বিখ্যাত এই সাহিত্যিকের বাংলার প্রতিও ছিল অন্যরকম এক টান। পরপর দুবার ঢাকায় এসেছিলেন। ১৯৮৬ সালে প্রথমবার এসে পুরান ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা হেঁটে বেড়ান। এরপর ঢাকায় আসেন ২০০১ সালে। রিকশায় চড়েছিলেন শখ করে। সে সময় জাতীয় জাদুঘরে জয়নুল আবেদিনের ছবি দেখে মুগ্ধ হন। প্রশংসা করেন জয়নুলের চিত্রকর্মের। লালবাগ কেল্লা ঘুরে দেখেন। শহরের প্রাচুর্য ছেড়ে দেখতে যান গরিবের দরিদ্রজীবনের জলছবি। ঘুরে দেখেন মোহাম্মদপুরে বিহারী ক্যাম্প। বাংলার গ্রামের কুমার, তাঁতি এবং শহরের বস্তিবাসীর জীবন তিনি খুব কাছে থেকে উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন হয়তো! বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু বলা হয় গুন্টার গ্রাসকে। ৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালির পক্ষে ছিলেন তিনি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার বিরোধিতা করেছিলেন। বাঙালিদের প্রতি ছিল তার অগাধ প্রেম।

 

"