কবিতার স্থপতি ও সাহিত্যের কথিত ব্র্রাহ্মণরা

প্রকাশ | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

জাহাঙ্গীর আলম জাহান

কবিতা হচ্ছে শব্দ নিয়ে খেলা। সেরা এবং যথার্থ শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়ে ভাবের উপযুক্ত প্রকাশই কবিতা। কবিতায় ভাব থাকবে বটে, তাই বলে নিছক ভাবালুতা কবিতা নয়। কবিতাবোদ্ধারা বলেন, কবিতার জন্ম ভাব থেকে। কতগুলো শব্দের গাঁথুনিও কবিতা নয়। শুধু শব্দের পর শব্দ সাজালে কবিতা হয় না। যদি হতো তাহলে পৃথিবীর তাবৎ লেখাকেই বলা হতো কবিতা। কিন্তু তা হয় না। হয় না বলেই কবিতার বৈশিষ্ট্য অন্যরকম। অন্যরকম মানে ভাব ও আবেগ নির্ভর। ইংরেজি সাহিত্যে রোমান্টিক কবিতার জনক বলে খ্যাত William Wordsworth (১৭৭০-১৮৫০) শক্তিময় অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশকেই ভালো কবিতা বলে মনে করতেন (For all good poetry is the spontaneous overflow of powerfull feelings)। আরেক রোমান্টিক ইংরেজ কবি John keats-এর নাম (১৭৯৫-১৮২১) আমরা কে না জানি! তিনি তার 'From the letter’ প্রবন্ধে কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘That if poetry comes not as naturally as the leaves to a tree, it had better not come at all’ (প্রকৃতিগতভাবে গাছের পাতা গজানোর মতো যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কবিতা না আসে, তাহলে সে কবিতা না আসাই ভালো)। এ থেকে বোঝা যায়, কবিতা জোর করে তৈরি করার বিষয় নয়। কবিতা হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ ও প্রণোদনার বহিঃপ্রকাশ। কবিতা কখনোই লেখার বিষয় নয়; কবিতা নির্মাণের বিষয়, হয়ে ওঠার বিষয়। ইচ্ছে করলেই কবিতা নির্মাণ করা যায় না। কবিতা স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের নাম। যিনি কবিতা লেখেন তিনিই কবি। তবে সব কবিই নির্মাতা নন। কেউ কবিতা-লেখক, কেউ কবিতা-নির্মাতা। কবিতা-লেখকের চেয়ে কবিতা-নির্মাতার দায় অনেক। লেখকের কবিতা সবসময় কবিতা না-ও হতে পারে। কিন্তু যিনি নির্মাতা, তার কবিতা প্রকৃত কবিতার বৈশিষ্ট্য পাবেই। অর্থাৎ কবিকেও হতে হয় স্থপতি সমান।

গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তার নগর-রাষ্ট্রের ধারণায় কবিকে তুচ্ছজ্ঞান করেছেন। তার কল্পিত রাষ্ট্রে তিনি কবিদের কোনোই স্থান দেননি। কেন দেননি সে তিনিই ভালো জানেন। তবে আজকের আধুনিক নগর-সভ্যতায় কবিকে বাদ দেওয়া মানে নান্দনিক সুন্দরকে অস্বীকার করা। কেননা কবিতা সুন্দরেরই ভিন্নরূপ। আর কবি হচ্ছেন সেই সুন্দরের উপাসক। কবির মাধ্যমেই সুন্দরের বিকাশ ঘটে। নন্দনতত্ত্বের ধারণা তো কবিরাই এনেছেন পৃথিবীতে। যদিও গত কয়েক দশক ধরে আধুনিকতার নামে কবিতায় এক ধরনের দুর্বোধ্যতা আমদানি করা হয়েছে। কে কত বেশি ভারী, শব্দের মালা গাঁথতে পারে এ যেন তারই প্রতিযোগিতা। কবিতায় যথার্থ শব্দের চয়ন এবং উপমা-উৎপ্রেক্ষার সম্মিলন থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এগুলো কবিতার অলঙ্কার। এর প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু ভারিক্কি চালে দুর্বোধ্যতার ধূম্রজাল সৃষ্টি করা একধরনের অনাবশ্যক আঁতলেমিরই পরিচায়ক। কেউ কেউ কবিতায় আঁতলেমির বাহুল্য দিয়ে পাঠককে কবিতাবিমুখ করছেন। ফলে কবিতার পাঠক কমছে। কবিতা হয়ে যাচ্ছে অনেকটাই নিঃসঙ্গ। এ দোষ কবিতার নয়। কোনো কোনো কবির। যারা কবিতা বুঝতে পাঠককে অভিধান খুলতে বাধ্য করেন, সেই আঁতেল কবিরাই কবিতাকে অজনপ্রিয় করতে খেটে যাচ্ছেন নিজেরই অজান্তে। পাঠকের এতো সময় কোথায় অভিধান খুলে কবিতা বোঝার!

বাংলা কবিতায় পশ্চিমা আধুনিক ধারা আনয়নে যারা সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন তাদের মধ্যে তিরিশ দশকের সেই পঞ্চপা-ব অন্যতম। জীবনানন্দ দাশ সেই পঞ্চপা-বেরই অগ্রগণ্য একজন। সমসাময়িককালে জীবনানন্দ দাশ কবি হিসাবে অতটা স্বীকৃত ছিলেন না। কিন্তু আজ এটি প্রমাণিত সত্য, চিরায়ত আধুনিক কবিতায় তার বিকল্প নেই। রবীন্দ্র বলয়ের প্রভাবমুক্ত হয়ে কবিতায় পশ্চিমা ধাঁচের আধুনিকায়ন ত্রিশের পাঁচ কবির সবচেয়ে বড় কীর্তি। আজকের কবিকে এটা বুঝতে হবে, আধুনিকতা মানে দুর্বোধ্যতা নয়। কিংবা শব্দের ধূম্রজাল সৃষ্টিও নয় আধুনিকতা। শব্দ নিয়ে কবি খেলা করবেন; কিন্তু শব্দকে জটিল করবেন না। ‘Best words in the best order’ কথাটির যথার্থতা মাথায় রেখে কবিকে নিরন্তর নবায়নযোগ্য হয়ে উঠতে হবে। কবিতা তো শব্দেরই খেলা। শব্দ নিয়ে ভালো খেলা খেলতে জানলে ভালো কবিতা না হয়ে যায় কোথায়! সে লেখায় আরোপিত শব্দের বাহুল্য অনাবশ্যক। কবিকে এটি বুঝতে হবে। বুঝে তবেই লিখতে হবে কবিতা। তা নইলে পাঠককে ধরে রাখা যাবে না এবং কবিতা আরো বেশি নিঃসঙ্গ হবে, হয়ে উঠবে আরো বেশি পাঠকবিমুখ; যা কাম্য নয় কারোরই। কবিতাকে শিল্পসুষমায় সুসজ্জিত করার দায় তো কবিরই। এটি না বুঝলে ক্ষতি হবে কবিতার। কবিতার ক্ষতি মানে নন্দনতত্ত্বের পরাজয়, নান্দনিক সৌন্দর্যেরই অপমৃত্যু।

সাহিত্যে ব্রাহ্মণ্যবাদিতা

কবি নামের একশ্রেণির কথিত আঁতেল আজকাল বড় বেশি আঁতলামি করছে। নিজেরা নতুন কিছু সৃষ্টি করতে না পারলেও অন্যের খুঁত ধরায় এরা পারঙ্গম। সাহিত্যক্ষেত্রে এদের গঠনমূলক কোনো অবদান নেই; নেই কোনো সাহিত্য-পরিচিতি। কালেভদ্রে দু-একটি লেখা লিখেই এরা বিশ্বজয়ের দম্ভ দেখায়। এদের আরোপিত আঁতলেমি মাঝে মাঝে সহ্যসীমা অতিক্রম করে। এদের কাছে কবিতা নির্মাণের মহৌষধ হচ্ছে গাঁজার কল্কে, অথবা নিদেনপক্ষে প্রতিরাতে মুঠিভরা ঘুমের বড়ি। দিনমান তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব নিয়ে সচেতনভাবে অচেতন থাকাই এদের সংস্কৃতি। এরা সাহিত্যে কোন মহার্ঘ্য অর্জন করতে চায় তা স্পষ্ট নয়। এদের কেউ কেউ লাল মলাটের তাত্ত্বিক বই পড়ে এতোটাই মোহাচ্ছন্ন হয়েছে যে, সবকিছুতেই দুর্নীতি আর অপ-সংস্কৃতির গন্ধ পায়। শুধু তাই নয়, চারপাশে এরা বুর্জোয়া ছাড়া আর কিছুই দেখে না। এটি একধরনের বিকৃতি। এরকম বিকৃতি এদের কাছে সুস্থতারই নামান্তর। সমাজের প্রতিটি মানুষ তাদের মতো বৈকল্যগ্রস্ত হলে তবেই যেন জাতির মুক্তি। তারা সবই বোঝে, শুধু এটি বোঝে না যে, তাদের মানসিকতা অন্যেরাও বোঝে। এ ধরনের মনোভাব নিয়ে তারা কী বিপ্লব সাধন করতে চায় সে-ও এক বিরাট প্রশ্ন বটে। বিপ্লব একটি প্রক্রিয়ার বিষয়। হুট করে বিপ্লব সংঘটন করা যায় না। এর জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি, শাণিত চেতনা, মানুষের অংশগ্রহণ ও জাগরণ দরকার। দরকার অভীষ্ট লক্ষ্য ও সুনির্দিষ্ট দর্শন। কিন্তু এদের আচরণে এবং লেখালেখিতে এসবের কোনো উপস্থিতি নেই। তাহলে কিসের বিপ্লব? কীসের দর্শন-চিন্তা? সবকিছু দেখেশুনে বুঝতে হবে সকলই গরল ভেল।

এদের ব্রাহ্মণ্যবাদিতা সাহিত্যক্ষেত্রে ‘সবজান্তা’র দম্ভকেই প্রকাশ করে। এরা হয়তো বিশ্বসাহিত্যের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অনেক খবরই রাখে। রাখতেই পারে। তাই বলে তারা ব্যতীত অন্যরা সে খবর রাখে না এমনটি ভাবা অন্যায়। অথচ সেরকম ভাবতেই এরা অভ্যস্ত। এটি মৌলবাদী মানসিকতারই নামান্তর। নিজেকে শীর্ষস্থানীয় ভাবা তো ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। মৌলবাদ আর ব্রাহ্মণ্যবাদ কখনোই পৃথক কিছু নয়। নির্মাণে সিদ্ধহস্ত না হলেও কল্কে টেনে কিংবা মুঠোভরা ঘুমের বড়ি সেবন করে সিদ্ধিলাভে এদের জুড়ি নেই। এরা নিজেরা সৃষ্টিশীল নয়; অন্যের সৃষ্টি নিয়ে এদের যতো মাথাব্যথা। চায়ের দোকানে টেবিল দখল করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্যের পি-ি চটকানোতেই এদের আনন্দ। সিগারেটে সুখটান দিয়ে নিজেদেরকে প্রলেতারিয়েত ভাবা আর অন্যদের বুর্জোয়া বলে গাল দেয়া এদের স্বভাব। নিজে যেটি পারে না, অন্যে সেটি কেন পারেÑ এ নিয়ে এদের অন্তর্জ্বালা। কথায় কথায় অন্যের লেখাকে নাকচ করে এরা আনন্দ পায়। এরাই আবার নিজের লেখাকে কালোত্তীর্ণ অমর কীর্তি বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। ভাব দেখে মনে হয়, এরা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণের জন্য আন্তর্জাতিক সাহিত্য কমিশনের একমাত্র সোল এজেন্ট (যদিও এরকম কোনো কমিশন আছে বলে আমাদের জানা নেই)। এদের উপরই অর্পিত হয়েছে কে সাহিত্যে টিকবে আর কে টিকবে না তা নিরূপণের মহান (!) দায়িত্ব। যে কারণে এরা না পড়েই অন্যের সাহিত্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। সাহিত্য বলতে এরা বোঝে কবিতার নামে দুর্বোধ্য কিছু কথামালা। কবিতা ছাড়া অন্য কোনো রচনা এদের কাছে সাহিত্য নয়। এরা অন্যের সাহিত্য নিয়ে সমালোচনা করতে পারবে, কিন্তু তাদের সাহিত্য নিয়ে সমালোচনা সহ্য করতে রাজি নয়। কারণ তারা তাদের রচনাকে সমালোচনার ঊর্ধেŸ এবং শুধুই প্রশংসার যোগ্য বলে মনে করে। যদিও এদের লেখার সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা; তবুও এদের ভাবখানা এই যে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য একমাত্র তাদের হাতেই তৈরি হচ্ছে। এরা পারে তো রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশদেরও নাকচ করে দেয়। সাহিত্যের নামে মৌলবাদী আচরণ আর ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতা এদের ভূষণ। এরা নিজেদেরকে ভাবে সাহিত্যের ব্রাহ্মণ, আর এদের বাইরে অন্য যারা আছে তারা যেন অচ্ছুত, নমশূদ্র। এই ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতা সাহিত্যকে বিভাজিত করছে; কলুষিত করছে সাহিত্যের অঙ্গন। এদের খপ্পরে যারাই পড়েছে তাদেরই কম্মোসারা। এরা সাহিত্যের একটি তথাকথিত আঁতেল গ্রুপ গড়ে তোলার চেষ্টায় গলদঘর্ম হচ্ছে। এদের চেষ্টা অতীতে সফল হয়নি, আজকেও হবে না। এদের পূর্বসুরী স্বঘোষিত ব্রাহ্মণেরা সাহিত্যে অন্যকে নাকচ করতে গিয়ে নিজেরাই নাকচ হয়েছে। অতীত থেকে শিক্ষা নিতে জানলে এদের আরোপিত আঁতলামি কমতে পারে। তাহলে এরা নিজেরা যেমন মানসিক সুস্থতা ফিরে পাবে, তেমনি সাহিত্যের অঙ্গনেও বইবে সম্প্রীতির সুবাতাস। ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতা আধুনিক সভ্যসমাজে কারোরই কাম্য নয়। এরা নিজেরা এটি বুঝতে পারলে এদের যেমন মঙ্গল, তেমনি মঙ্গল সৃজনশীল সাহিত্যেরও।

"