ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ও মেরি শেলি

প্রকাশ | ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

মাহমুদুর রহমান খান

জনপ্রিয় ইংরেজ উপন্যাসিক মেরি শেলি ১৭৯৭ সালের ৩০ আগস্ট ইংল্যান্ডের লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। বহুল প্রতিভাধর এই নারী একাধারে ছিলেন গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্য রচয়িতা, জীবনীকার এবং ভ্রমণকাহিনি রচয়িতা। তার রচিত বহুল জনপ্রিয় উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’। এটি একটি গথিক উপন্যাস যা ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাস রচনার মাধ্যমে শেলি বিশ্বের পাঠকের হৃদয়ে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে যান।

সাহিত্যের সঙ্গে যেন মেরি শেলির নিবিড় সম্পর্ক। তাইতো সাহিত্যিক পরিবারেই তার জন্ম। বাবা উইলিয়াম গডউইন (১৭৫৬-১৮৩৬) ছিলেন একজন মুক্তমনা দার্শনিক, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক লেখক। ‘এনকুইরি কনসার্নিং পলিটিক্যাল জাস্টিস’ (১৭৯৩) তার জনপ্রিয় রাজনৈতিক বই। মা মেরি উলস্টনক্রাফট গডউইন (১৭৫৯-১৭৯৭) একজন নারীবাদী অ্যাডভোকেট, যিনি ‘দি ভিনডিকেশন অব দ্যা রাইটস অব উইমেন’ (১৭৯২) বইটি লেখার জন্য বিখ্যাত। তার স্বামী পার্সি বিশি শেলি ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত রোমান্টিক কবি।

জন্মের মাত্র ১১ দিনের মধ্যেই মেরি শেলি মাকে হারান। তারপর বাবা গডউইন মেরির ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে বড় বোন ফ্যানি ইমলে’র সঙ্গে বেড়ে ওঠেন। ১৮ শতাব্দীর শেষের দিকের অন্যান্য ইংরেজ নারীর মতো তিনিও তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করতে পারেননি। উইলিয়াম গডউইনের প্রেরণায় লিখতে ও পড়তে শিখেছেন। ছোটবেলা থেকেই পিতামাতার লেখা দ্বারা প্রভাবিত হন, যা পরবর্তীতে তার লেখায় লক্ষ্য করা যায়। বাবার বিশাল পাঠাগারটির সদ্ব্যবহার করেছেন প্রতিনিয়তই। এখান থেকে বাবা ও মায়ের সংগ্রহ করা অসংখ্য বই পড়েন। বিবাহ পরবর্তী জীবনে তার স্বামী পার্সি বিশি শেলির থেকে গ্রিক, ল্যাটিন এবং অন্যান্য ভাষায় পারদর্শিতা লাভ করেন।

রোমান্টিক কবি পার্সি বিশি শেলি উইলিয়াম গডউইনের লেখায় অনুপ্রাণিত হয়ে তার শিষ্য হয়ে ওঠেন। সেই সূত্রে মেরির পরিবারে শেলির যাওয়া আসা শুরু হয়। এর মধ্যেই মেরি ও পার্সি শেলির মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯১৪ সালে মেরি ও পার্সি শেলি তাদের সম্পর্কের কথা জনসম্মুখে ঘোষণা করেন। কিন্তু পার্সি শেলি তার প্রথম স্ত্রী হ্যারিয়েটের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। তাই মেরির বাবা গডউইন এ বিয়েতে রাজি ছিলেন না। পরে তারা দুজনে ইংল্যান্ড ত্যাগ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন এবং ফ্রান্সে চলে যান। তার দুই বছর পরে পার্সি শেলির প্রথম স্ত্রী হ্যারিয়েট কোনো কারণে আত্মহত্যা করে। এর ঠিক কিছুদিন পরেই গডউইনের সম্মতিক্রমে মেরির সঙ্গে পার্সি শেলির বিবাহ সম্পন্ন হয়।

ওই বছরের কোনো এক গ্রীষ্মের বৃষ্টিস্নাত দিনে শেলি দম্পতি, বিখ্যাত কবি লর্ড বায়রন ও জন পলিডরি একত্রে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন এবং ভূতের গল্পের বই পড়ছিলেন। তখন বায়রন এক অদ্ভুত প্রস্তাব দিলেন। তিনি সবাইকে একটি করে ভূতের গল্প লিখতে বললেন এবং যার লেখা সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর হবে তিনিই বিজয়ী হবেন বলে ঘোষণা দেন। ঠিক তখন থেকেই মেরির মাথায় ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ লেখার পরিকল্পনা শুরু হয়।

এর কিছুদিন পরেই মেরি তার লেখা গল্প শেষ করেন এবং সবাই তার গল্পটিকে সেরা হিসেবে বিবেচনা করেন। তখন তার মাথায় এটিকে উপন্যাসে রূপ দেওয়ার চিন্তা আসে। ১৮১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে এটি লেখা শেষ করেন এবং ১৮১৮ সালে এটি ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বা আধুনিক প্রমিথিউস’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। পার্র্সি শেলির ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। প্রকাশের পরপরই এটি গথিক উপন্যাসের জগতে বিপ্লবের সূচনা করে।

গথিক উপন্যাস সাধারণত ভূত-প্রেত ইত্যাদি নিয়ে লেখা হয়। এ ধরনের উপন্যাসে লেখকরা সমাজের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেন। তারা মৃত্যু ও প্রাকৃতিক শক্তিকে মানুষের থেকে বেশি শক্তিশালী রূপে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। এসব উপন্যাসের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এসব উপন্যাসে আমরা অতিপ্রাকৃতিক বা রহস্যময়ী উপাদান দেখতে পাই। যেমনÑ ডাক্তার ফ্রাঙ্কেনস্টাইন একটি রহস্যময়ী চরিত্র ছিলেন যিনি একটি অতিমানবীয় দানব সৃষ্টি করেন। গথিক উপন্যাসের পরিবেশেও এক ধরনের অন্ধকারময় বা তিমিরাচ্ছন্ন ভাব থাকে। সাধারণত লোকচক্ষুর আড়ালে পুরাতন ও পরিত্যক্ত কোন বাড়ি, সুড়ঙ্গ কিংবা প্রাসাদে এ ধরনের ঘটনাগুলো চিত্রায়িত করা হয়। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ল্যাবরেটরিটিও এমন এক পরিবেশে চিত্রায়িত করা হয়েছে। এ সকল উপন্যাসের চরিত্রে স্বাভাবিক এবং অস্বাভাবিক দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যই লক্ষ্য করা যায়। বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে মেরি শেলির ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ পুরোপুরি সার্থক একটি গথিক উপন্যাস।

এই উপন্যাস প্রকাশের পর মেরি শেলির ভাগ্য কিছুটা পরিবর্তিত হয়। কিন্তু ১৮২২ সালে পার্সি শেলি নৌকাডুবিতে মারা গেলে তার জীবনে পুনরায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পরের বছর মেরি পুনরায় ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন এবং নিজেকে একজন পেশাদার লেখিকা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি তার স্বামী পার্সি শেলির লেখাগুলির প্রচার চালাতে থাকেন। ১৮২০ থেকে ১৮৩০ সালের মধ্যে মেরি ছোট ও বড় মিলিয়ে প্রচুর গল্প লিখেন। এর পরবর্তী দশকে তিনি ইতালীয়, স্পেনীয় ও পর্তুগাল এবং ফরাসি বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যাক্তিদের জীবনী রচনায় মনোনিবেশ করেন।

তার লেখা প্রথম কবিতা ‘মনসির নংটংপো’ ১৮০৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। শেলির সঙ্গে ফ্রান্সে থাকাকালীন ঘটনা নিয়ে ১৮১৭ সালে ‘হিস্টোরি অব এ সিক্স উইকস ট্যুর’ নামে একটি ভ্রমণ কাহিনি প্রকাশ করেন। এছাড়াও ১৮২৬ সালে ‘দ্য লাল্ট ম্যান’, ১৮৩০ সালে লেখা ‘লডোর’ এবং ১৮৩৭ সালে লেখা ফকনার তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে অন্যতম। তার লেখা শেষ পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ ‘রমেরি শেলির জীবনের শেষ সময়গুলো খুব সুখকর ছিল না। তিনি দীর্ঘকাল অসুস্থ ছিলেন। যার কারণে তার লেখালেখি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন রোগে ভোগার পর ১৮৫১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখ ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে কালজয়ী উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ রচয়িতা এই নারী লেখিকা ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

 

"