যে আকাশ ছুঁয়ে দেখে জানালার অহংকার

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

* ফকির ইলিয়াস

কবিতার একটি নিজস্ব আকাশ আছে। আছে কবিরও। কবি সেই আকাশে নিজেকে দেখেন। দেখেন তার ভালোবাসার মানচিত্র। তাকিয়ে থাকেন একটি মুক্ত জানালার দিকে। লিখেন নিজেকে। অথবা বলা যায়Ñ কবিতা সময়কে লিখে রাখে। আঁকে সৃজনের ছাপচিত্র। অথবা বিনষ্টকালের পথ ধরে চারপাশে যে সামাজিক অবক্ষয় ঘটে যায়, তারও সাক্ষী থাকে কবিতা। কবি হাবিব ফয়েজির ‘মানুষটি আজও জানালা খুলে’ কাব্যগ্রন্থটি তেমনি কিছু বর্ণনা আর প্রশ্ন রেখেছে আমাদের কাছে।

আলোর সংকেত দিয়ে বাজে নদী। বয়ে যায় ঢেউ। কখনো উজানে। কখনো ভাটির গন্তব্যে। একজন কবি নদীতীরে দাঁড়িয়ে দেখেন সেই দৃশ্য। আঁকেন নিজের মাঝে পঙ্ক্তির বিভাস। আর তা বিলিয়ে দেন মানুষের মাঝে। এই যে শব্দের আদান- তার নামই কবিতা। প্রেম ও পরিণামের সফল কালচিত্র ।

হাবিব ফয়েজি একজন কাব্য-পরিব্রাজক। তার পরিভ্রমণ কবিতায়। তিনি আলো খোঁজেন। আলোর পথ দেখান। আর ডাক দিয়ে যান, মানুষকে অনাবিল আনন্দের পথে। পরম শান্তির পথে।

এই কবির কিছু কবিতা আমি পড়েছি বিভিন্ন কাগজে। না মলাটবন্দি তার কোনো বই এর আগে আমার পড়া হয়নি।

তার কবিতার আত্মকথন, মানুষকে ভাবায় নিজস্ব পরিম-লে। আর এই যে নিমগ্নতাÑ সেটাই কবিতার সূতিকাগার। তিনি বলেন, ‘তোমাকে চিনতে ভুল করেছিÑ এ আমার ব্যর্থতা নয়/কেননা তুমি তো দেখতে ঠিক মানুষের মতো/বলতে পারো, এ ছিল আমার সরল বিশ্বাস।/আমাকে চিনতে ভুল করেছ, এ তোমার ব্যর্থতা/কেননা আমি তো নিজেকে মেলে ধরেছি তোমার বরাবর।’ [দর্শন]

হাবিব ফয়েজি তার কবিতায় প্রেম ও প্রকৃতি বন্দনায় ব্যাপৃত করেছেন নিজেকে বিভিন্ন আঙিকে। তার কবিতা সেই দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়ে যায়Ñ ‘আমি/নিজেকে ভেঙেছি/তোমাকে গড়ব বলে/তুমি/আমাকে ভেঙেছো/নিজেকে গড়বে বলে...!’ [তফাৎ]

‘ক্রমশ বদলে যাচ্ছে পৃথিবী/বদলে যাচ্ছে সব/আর বদলে যাচ্ছি আমিও।/একসময় লজ্জা পেতাম, এখন পাই না/কেননা যেদিকেই তাকাই, দেখিÑ/নির্লজ্জদের অবাধ বিচরণ।’ [পালাবদল]

মানুষ এখন লজ্জা পাওয়াও ভুলে যাচ্ছে! আমাদের চারপাশে এই যে নারকীয় সময়, দেশে কিংবা বিদেশে মানুষকে কি এক শঙ্কার মাঝে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের রাজনীতি, আমাদের মিথ্যাচার!

দুই.

হাবিব ফয়েজি তার প্রতিটি কবিতায় নিজের প্রতিচিত্র এঁকেছেন কালের অবয়বে। প্রজন্মকে জানাতে চেয়েছেন, তার যাপিত সময় কেমন ছিল। এমন ভাবনা বিষয়ে একটা ধারণা আমরা পাই একজন মার্কিন কবি জেমস টেটের একটি বক্তব্যে। তিনি বলেন, কবিতা দরিয়ার আলোর মতো। যে জলে আমি বারবার দেখি আমার মুখ।

হ্যাঁ, কবি সেই আলোতে নিজের মুখ দেখেন। পাঠককেও দেখান স্বপ্নের মুখ। কবি লিখেন, ‘তারপরÑ ধুলো থেকে মাটির সেøট/সেøট থেকে নিউজপ্রিন্টের সস্তা কাগজ/শাদা কাগজ, অফসেট পেপার/এরপর কম্পিউটার কিবোর্ড/এভাবেই আমার বেড়ে ওঠা,/পৃথিবীর পথে হাঁটতে শিখা/দৌড়, সাঁতার, এককথায়/জীবনযন্ত্র চালানোর সমূহ কৌশল শিখিয়েছিলে/এ ছাড়াও কতকিছু শিখেছি তোমার দেখাদেখি/কিছু হয়তো জেনেটিকেল/আমার কৃতজ্ঞতার কোনও ভাষা জানা নেই বাবা।’ [বাবার আঙুল]

এই কবির কাব্যগ্রন্থটি পড়ে আমার বারবার মনে হয়েছে, তার কবিতায় আরো নতুন আঙিকে ভাবনাগুলোকে তিনি উপস্থাপন করতে পারতেন। কবিতা-বিশ্বের সমকালকে তিনি ধারণ করতে পারতেন আরো প্রাঞ্জলভাবে। এ ক্ষেত্রে তার অপূর্ণতা থেকে গেছে।

একজন কবি যখন শব্দচয়ন করবেন তখন কবির ভাবা উচিত তিনি তার কবিতায় সমকালের শব্দাবলিকে কতটা ধারণ করছেন।

এই কবির কবিতায় রাজনীতি সচেতনতা এসেছে বেশ প্রখরভাবে। তিনি আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি পর্বকে চিত্রায়ণ করেছেন তার নিজস্ব ভাবনায়। মোট ৫৬টি কবিতা স্থান পেয়েছে চার ফরমার এই গ্রন্থটিতে।

তিন.

কোনো কবিতায় একটি চিত্রকল্প, অনুপ্রাস, উৎপ্রেক্ষা ব্যবহারের আগে কবিকে ভাবতে হয় তা, যথার্থ হচ্ছে কী না। আর সে জন্য সমকালের, সমবিশ্বের কবিতা পঠন-পাঠন এর বিকল্প কিছু নাই। যে কোনো কবিকে তা মনে রেখেই এগোতে হয়। হাবিব ফয়েজি নিউইয়র্ক অভিবাসী। তাই বিশ্বসাহিত্যের মাঠে তার অভিজ্ঞতা তিনি পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন তার আগামী কবিতাগুলোতে। তিনি লিখতে পারেন তার নিরীক্ষণ, কালিক আঙ্গিকে।

একটি প্রকৃত কবিতা কখনই আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, হতে পারে না। কবিতা হচ্ছে নির্মল যোজনার নাম। এর পটভূমি নির্মাণের আগে কবিকে পৌঁছে যেতে হয় সেই চিত্রকল্পের অনেক গভীরে।

এই কবির কিছু কবিতায় আমরা তেমন ঝলক দেখি। তিনি বলেন, ‘নারী,/একদিন তোমাকে দুই ঠোঁটের ফাঁকে/পুড়িয়েছি বেশ/তুমিও আমাকে পুড়িয়ে/করেছো নিঃশ্বেষ।’ [নারী ও নিকোটিন]

কিংবা পড়তে পারি এই পংক্তিগুলোÑ ‘কাছে না গেলে কতকিছুই অজানা থেকে যায়/দূর থেকে তো আমরা কতকিছুই ভুলভাল দেখি/দেখতে দেখতে চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসে, কিংবা/দূর থেকে কতকিছুই ভাবি, ভাবনারা ডানা মেলে, আর/ভাবতে ভাবতে বছরের পর বছর হারিয়ে যায়/দৃষ্টিভ্রম কিংবা ভাবনাভ্রমে ডুবে থাকি অবলীলায়।’ [ভ্রম]

গ্রন্থটির প্রথম ফ্ল্যাপে কবি নিজেই বলেছেন নিজের পরিচয়। চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন সালমান ফরিদ। প্রকাশ করেছে বাউলা প্রকাশ। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন কবি তার সহধর্মিণী রোমানা হাবিবকে। মূল্য রাখা হয়েছে ১২৫ টাকা, বিদেশে-পাঁচ ডলার।

 

"