চিরকালের তারুণ্যে কাজী নজরুল

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

জোবায়ের মিলন

‘গাহি সাম্যের গান-/যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান/যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।...মিথ্যা শুনিনি ভাই/এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।’ কবি কাজী নজরুলকে ছাড়া এমন বাণী কে আর লিখতে পেরেছে? কে তাকে ছেড়ে যেতে পেরেছে কালের ধূলি উড়িয়ে? কাজী নজরুল চিরদিনের তরুণ প্রাণ। তার নাম কাগজে কিংবা ব্ল্যাকবোর্ডে সাদা খড়িমাটি দিয়ে লেখা কোনো নাম নয়। তার নাম কালিতে লেখা সাদা কাগজে ক্ষুদ্র অক্ষরও নয়। কাল থেকে মহাকালের আকাশ ভেলায় লেখা তার নাম। তার বাণী। নজরুলকে চাইলেই হাওয়ায় ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে বা উগরে দেওয়া যায় না। তাকে বাদ বলে বাতিলের খোয়ারে ঢুকিয়ে দিয়ে বিরাম নেওয়ার সুযোগ নেই জন্মের এত এত কাল পরেও। তারও পরে সুযোগ হবে না এ নাম বিতাড়ণের। প্রায় মানুষ বেঁচে থাকে দেহে/শরীরে আর কিছু মানুষ বাঁচে প্রাণে। কবি কাজী নজরুল প্রাণের উজ্জীবন। যুগের বার্তায় লিখিত অমর বিস্ময়। ক্ষণজন্মাও বলা যায় দ্রোহের আর মানুষের কবি কাজী নজরুলকে। বয়স বিবেচ্যে শরীরের কাঁচা, বৃদ্ধতা প্রকাশ পেলেও কবি তার কথায়, বাণীতেই দিনের পঞ্জিকায় চিহ্নিত হয়ে থাকেন। কবি তার কবিতায় গানে সুরে দর্শনে সে হেঁটে চলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। ‘মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান/নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি/সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি...।’ এই বাক্য, ভাব, দর্শনের নিগূঢ়তা নজরুলকে দিয়েছে অভেদ্য প্রাণ; দিয়েছে নশ্বরতায় অনশ্বরতা। কবি কাজী নজরুলকে চাইলেই আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। তাকে রেখে যেতে পারি না পেছনের সারিতে। তাকে বলতে পারি না- তিনি শেষ। সুখে দুঃখে, চেতনায় জাগরণে নজরুল আমাদের পথের অগ্রভাগে হাত উঁচু করে চলেন। আমরা তার বাণীর পিছু পিছু চলতে থাকি। অভাবে অভিযোগে, সাহসে সঞ্চারে তার শরীর প্রস্থানের বহু বহু সময় পরে এসেও আমরা তার কাছে সমর্পিত হই, তার কথার কাছে বিনয়ে নত হই, ধূসরতায় স্বচ্ছতা খুঁজে ফিরি। এখনো পরিশ্রান্ত হলে, শ্রমে ক্লান্ত হলে, মিছিলে আন্দোলনে ঝিমিয়ে গেলে জাগতে ও জাগাতে বলে উঠি, ‘বল বীর/বল উন্নত মম শির/শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির/বল বীর/বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি/চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি/ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া/খোদার আসন আরশ ছেদিয়া/উঠিয়াছি চিরবিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর...।’

সময় পুরনো হবে, পৃথিবীর বয়স বেড়ে জীর্ণশীর্ণ অথবা উজ্জ্বল হবে আরো; অথবা সময়ের পিঠে নোনা ধরে বয়স্ক হবে তার সন্তান না-হয় জলতরঙ্গের মতো কলকল কলতানে ছুটে যাবে আগামীর দিকে; নশ্বরতা কেউ টিকে থাকবে না। কাচের বোতলের ভাঙা অংশের মতো ঝুরঝুর করে ক্ষয়ের দিকে পা বাড়াবে প্রকৃতির নিয়মে। কিন্তু শরীরি কবি কাজী নজরুল যে বাণী রেখে গেলেন তার কী হবে? উত্তর অপেক্ষা করে না। আমরাই জানি, অক্ষয়িষ্ণু বাণীতে নজরুল চির তরুণ, নজরুল স্থির এখনো, সময়ের রেলগাড়িতে। তিনি দুই প্রান্তজুড়ে বহমান। যার যখন প্রয়োজন সে তখন নজরুলকে পেয়ে যায় অব্যক্ত ভাষার ব্যক্ত আশ্রম হিসাবে। তার বাণীর কাছে চিরদিনের দুঃখের যেমন সমাধান আছে, সুখের তেমন সঙ্গতা আছে। তার বাণীর কাছে দ্রোহের যেমন রস আছে, শান্ত হবার আছে সুধা।

কাজী নজরুলকে কেউ কেউ শুধুই বিদ্রোহী বলে, এক পেশে করে রেখে, অসুস্থ মনের প্রচার ঘটালেও এই কবির কাছে প্রেমের বিনয় আছে, ভালোবাসার আশ্রয় আছে, ইশ্বর বন্ধনা আছে তা অনেকেই সরল মনে মেনে নিতে আজও কার্পণ্য করলেও নজরুলের দীপ থেকে ছিটকে পড়ে না কোনো বিন্দু। পতিত হয় না কোনো আলো; জাগরণের উৎসাহ। নজরুলের জীবনকালের মতো আজকের কালেও তাকে নিয়ে টানাটানি আমাদের বিস্ময়কে দমিয়ে রাখে না। অনেক সময়ই মন খারাপ করিয়ে দেয় অযোগ্যদের আস্ফালন, তাকে নিয়ে গোপন কৌশল। তার দর্শন, তার সৃষ্টিকে দেখি কোনো কোনো শরীরি শয়তান হাজার ভাগে ভাগ করে গোসতের ভাগার মতো নিজ পাতে পাতে টেনে নিয়ে কখনো তাকে মলিন, কখনো উজ্জ্বল করে উপস্থাপন করেন প্রজন্মের কাছে। কিন্তু প্রজন্ম বোকা নয়, সময়ের তরুণ যারা তারা বোকা নয়, তারা অপাঠে অযোগ্য নয়, তারা পিছিয়ে পড়া জ্ঞান নয়; প্রজন্ম জানে সত্য ও মিথ্যার গায়ের রং। তারা ঠোঁটের বাঁক বুঝে বুঝে লয় নবীন ও প্রবীণের মুখ। শত্রু ও মিত্রতার বন্ধনে তারা উজায় না, অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের ইশারা অনুমান করে তারা অনুভবে উজিয়ে ওঠে। পাঠ করে। অনুধাবন করে। এ যে জোর করে অনুধাবন, অনুমান, পাঠ তা নয়। কথার তারুণ্য, শব্দের যৌবনতা, ভাবের বিনিময়, সময়োপযোগিতা ও দর্শনজ্ঞান প্রতিটি সময়কে ভাবতে বাধ্য করে; সে চালকের আসনে নজরুল। তার সৃষ্টিই অমরাতার হাত ধরে অমৃত পানে তুষ্ট করছে নবীনতাকে, তারুণ্যকে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে বাংলাসাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালির উত্থানে পতনে, জীবনাচরণ থেকে যেমন বিদায় করা সম্ভব নয়, তেমনি কাজী নজরুলকেও সমাজ সচেতনার তীব্র সেøাগান থেকে বিদায়ের অবসর নেই। তাকে বাদ দিয়ে বাঙালির অধিকার আন্দোলনে যেমন সফল হওয়া যায়নি, তেমনি বাংলা ও বাঙালির দৈনন্দিনতা থেকে শুরু করে ক্রান্তিকালের দিনেও তাকে ছাড়া অচলÑ ন্যায্যতা আদায়ে। কাজী নজরুলের বলে যাওয়া ভাষা ঝড়ের তীব্রতায় একদিক থেকে ছুটে অন্যদিকে হারিয়ে যায়নি, যাবে না বলেই তিনি চির তরুণ। তিনি নবীনতায় ভাস্কর। তিনি ঘুড়ির মতো উড়ে চলা এক চাপ্লাশ বিহগ। তিনি সদা ফুরফুরা মনোগতি। ঘোড়ার মতো বেগবান, শক্তিতে বলিয়ান। ‘আমি চির দুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস/মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস/আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর/আমি দুর্বার/আমি ভেঙে করি সব চুরমার/আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল/আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়মকানুন শৃঙ্খল/আমি মানি না কো কোনো আইন/আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন’। প্রজন্মের এ কালে এসে ভাষ্যে কিছু বলবার নেই। উদ্বৃত বাক্যই বলে দেয় নজরুল কে। নজরুল নবীন না প্রবীণ। নজরুল মৃত্যের না জীবিতের। নজরুল সময়ের না অসময়ের। নজরুল উজ্জ্বল না মলিন। শত্রুতায় নজরুলকে ছুঁড়ে ফেলা যাবে; যে কেউ পারে, পারবে। তাকে আটকে রাখার সাধ্য কারো নেই। থাকবে না। মিত্রতায় অতিমাত্রায় বলা যায়, বলা যাবে। এ-ও যে কেউ পারে, পারবে। নজরুলকে এককালেও হিন্দু বলতে অনেকেই ছাড়েন না, মুসলিম বলতে ছাড়েন না, আবার দুইয়ের কোনোটাই বলতেও ছাড়েন না। নজরুলকে নিয়ে দলাদলি আজও ফুরায়নি, গালাগালি ফুরায়নি। কৌশলে, নীরবে, নিভৃতে, প্রচারে প্রকাশে তাকে নিয়ে প্রচার অপপ্রচার বিদ্যমান কৌশলী আর স্বার্থান্বেষীদের প্রচ- ভিড়ে। তাতে কিছু যায় আসে না। না নজরুলের, না তার পাঠকের, না সময়ের। নিরপেক্ষতার নেত্রে নজরুলকে যারা পাঠ করেন তারা জানেন নজরুল কী গড়নে গড়া, কী পোশাকে মোড়া, কী বয়ানে বলিয়ান। তরুণ প্রাণকে কেউ বিচলিত করতে পারবে না। কালের আবহ থেকে নজরুলকে মুছে ফেলতে পারবে না তার গুণেই। তার কর্মের দ্বারা ফলিত ফসলের গুণেই তাকে ছেটে ফেলা দুষ্কর। অসম্ভব। মেনা কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করা সহজ, বাঘের মতো কামড় বসানো সহজ নয়। নজরুল কুতর্কে যারা লিপ্ত তারা ওই কর্মেই পার করবে জীবন। অনেকে আগেও করেছে। নজরুলের জীবদ্বশায়ও করেছে, মৃত্যুপরও করেছে, অমরত্বের কালেও করছে, করবে। করেই যাবে। ওই তাদের আনন্দ। আর যারা তারুণ্যে তরুণ কালের পালে উড্ডিন নজরুলকে অনুধাবন করেছে, তার থেকে ছেঁকে ছেঁকে তুলে নিয়েছে আলো আর সাম্যের রসদ তারা জিতেছে। তারা জীবনচলার পথে বলীয়ান হয়েছে। হচ্ছে, হবে।

নজরুলকে বিশ্রামে রেখে আশ্রমে জীবন চালানো কঠিন। পৃথিবীর পাঠশালায় আমাদের উপস্থিত হতেই হয় নজরুলের কাছে দিনে কি রাতে, রাতে কি দিনে। তাকে ছাড়া যেন অচল এক চর্কাগাড়ি আমাদের বোধের যাত্রা। সকাল স্থানে, সকল সময়ের সকল প্রশ্নে, সাম্যের নিক্তিতে আমরা পাই নজরুলকে। জন্ম আর মৃত্যুর কাল ধরে, শতকের বেড়াজালে মোড়িয়ে কাউকে যদি হাত-পা বেঁধে ভাগাড়ে ফেলে না দেই তবে নজরুলকে আমাদের পাঠে, পাঠ্যে, চেতনে, চেতনায়, ন্যায়ে, সাম্যে রাখতেই হবে। তাকে পিঠ দিয়ে বেশি দূর যেতে পারবো না। পারার অন্য সুযোগ তৈরিও হয়নি। তাই নজরুল চির তরুণ, চির কাঁচা, চিরদিনের। আমাদের।

 

"