আজন্ম প্রতিবাদী কবি

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

অলোক আচার্য

‘গোর্কির মতো তার চেহারাই যেন চিরাচরিতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কানে একটু কম শোনে, কথা বেশি বলে না, দেখামাত্র প্রেমে পড়ার মতো কিছু নয়, কিন্তু হাসিটি মধুর, ঠোঁট দুটি সরল’Ñ সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর এই বর্ণনায় কবি সুকান্তের একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। বুদ্ধদেব বসু সুকান্তের কথা আরো বলেছেন এভাবেÑ ‘যে চিলকে ব্যঙ্গ করেছিল, সে জানতো না সে নিজেই সেই চিল; লোভী নয়, দস্যু নয়, গর্বিত নিঃসঙ্গ আকাশচারী, স্খলিত হয়ে পড়ল ফুটপাতের ভিড়ে, আর উড়তে পারল না অথবা সময় পেল না। কবি হওয়ার জন্যই জন্মেছিল সুকান্ত, কবি হতে পারার আগে তার মৃত্যু হলো।’ ক্ষণজন্মা লেখক কবি-সাহিত্যিকরা খুব অল্পসময় পৃথিবীতে এসে আলোকিত করেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন সাহ্যিতজগত। এমন একজন ক্ষণজন্মা কবি যার অল্প সময়ের পৃথিবীতে থেকে আরেকটু সময়ের আফসোস থেকে গেছে পাঠকের মাঝে। কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার কবিতায় সমাজের জঞ্জালকে পরিষ্কার করতে চেয়েছেন। তার প্রয়াণ যেন চিরজীবনের আক্ষেপ। অন্যায়ের প্রতিবাদে তার বলিষ্ঠ অবস্থান, অধিকার ও ন্যায়ে কথা উঠে এসেছে কলমের শক্তিশালি ছোঁয়ায়। মাত্র ২১ বছরের জীবনে তার লেখনি দ্বারা প্রমাণ করে গেছেনÑ কবি সুকান্ত এসেছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে। অসময়ে মৃত্যু তার জাগতিক জীবনকে কেড়ে নিলেও তার সৃষ্টিকর্ম উজ্জ্বল হয়ে আছে আমাদের কাছে। ব্যক্তি সুকান্ত তার কলমে যেমন প্রতিবাদী ছিলেন তেমনি ব্যক্তিজীবনও প্রতিবাদী ছিল। তার প্রত্যক্ষ করা দেশটাকেই তিনি তার কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘অবাক পৃথিবী/অবাক করলে তুমি/জন্মেই দেখি/ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।’

সে সময়কার ঘটনাগুলো তার দক্ষ হাতে কবিতায় ঠাঁই পেয়েছে। তাইতো তিনি গণমানুষের কবি। তার চিন্তা-চেতনা গণমানুষের স্বাধীনতাকামী মনকে উজ্জীবিত করে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। কবি সুকান্তের কবিতায় আছে তারুণ্যের জয়গান, বয়সের স্তুতি আঠারো বছর বয়স, আছে শক্তি যে শক্তি মন্ত্রের মতো প্রেরণা যুগিয়েছে স্বাধীনতাকামীদের। সুকান্তের যুগে যত বড় বড় কবি কবিতা লিখতেন তার মধ্যেও তার কবিতা স্বাতন্ত্রবোধের পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছিল। তার কবিতা শিখিয়েছে জীবনের দুঃখ যন্ত্রণা ঠেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার উপায়। প্রতিটি লাইনে আমাদের সাহসী করেছে, উদ্দীপ্ত করেছে।

‘আমি যে বেকার পেয়েছি লেখার স্বাধীনতা।’ লেখার স্বাধীনতা পেয়েই কবি লিখেছেন অবিরত। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবি হয়ে ওঠার পেছনে তার বড় বোন রানীদির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। রানীদি মারা যাওয়ার পর তিনি প্রচ- আঘাত পান, পরে তার মা-ও মারা যান। প্রিয় মানুষের মৃত্যুশোক ছোট্ট সুকান্তের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করতে থাকেন। এই নিঃসঙ্গতা দূর করতে তার হাতে উঠে আসে কলম। এই কলম দিয়েই একের পর এক কবিতা লিখে গেছেন। দীর্ঘ জীবন না পাওয়ায় তার কবিতার সংখ্যার দিক থেকে বেশি হয়নি ঠিকই কিন্তু এই সৃষ্টিগুলোর ব্যাপ্তি ছিল বহুদূর। যুগ থেকে যুগে কবি সুকান্তের কবিতার জয়গান চলেছে। জাগতিক জীবনে তিনি অল্প সময় ছিলেন। কিন্তু এই অল্প সময়ে তার ভেতরে প্রবলভাবে ছিল চেতনাবোধ। দেশাত্ববোধে ছিলেন উদ্দীপ্ত। সংক্ষিপ্ত জীবনেই তিনি ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতালসহ বহু সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন।

তিনি জীবনকে দেখেছেন বাস্তবতার নিরিখে। অস্ত্র ছিল কলম। কবিতায় লিখেছেন ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্তির কথা। হে মহাজীবন কবিতায় তিনি লিখেছেনÑ ‘হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়/এবার কঠিন কঠোর গদ্য আনো/পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক/গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!/প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতাÑ/কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি/ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’

এক হাতে তার কলম-কবিতা, অন্যহাতে মুক্তির গান। আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেমন ধনী দরিদ্রের বৈষম্য নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন, অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, বিদ্রোহী হয়েছেন আর তারুণ্যের জয়গান করেছেন কবি সুকান্তও তার কবিতায় ধনী দরিদ্রের বৈষম্য নিয়ে ছিলেন সোচ্চার। তার পুরনো ধাঁধাঁ কবিতায় সেই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন বৈষম্যে ভরা এই সমাজের কাছে। লিখেছেনÑ ‘বলতে পারো বড়মানুষ মোটর কেন চড়বে?/ গরিব কেন সেই মোটরের তলায় চাপা পড়বে?/বড় মানুষ ভোজের পাতে ফেলে লুচি-মিষ্টি/গরিবরা পায় খোলামকুচি, একি অনাসৃষ্টি?’ এই কবিতার শেষ লাইনে রয়েছে সেই বিখ্যাত লাইনÑ ‘বড়লোকের ঢাক তৈরি গরিব লোকের চামড়ায়’। যুগ যুগ ধরে মানুষে মানুষে যে ব্যবধান, যে বৈষম্য টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। আধুনিক গণতন্ত্রও যাকে ঢাকতে পারেনি সেই সত্য কিশোর কবি সুকান্তের মনকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই এই বৈষম্য যেমন কোনোদিন শেষ হওয়ার নয় ঠিক একই রকমভাবে সুকান্তের কবিতা নিপীড়িত মানুষের কথা বলে যাবে।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ সবসময় লক্ষ্য করা গেছে। ছাড়পত্র, দুর্মর কবিতায় কবির বলিষ্ঠ উচ্চারণ প্রতিবাদ, তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে। ছাড়পত্র কবিতায় বিশ্বকে শিশুর জন্য বাসযোগ্য করে যাওয়ার দৃপ্ত অঙ্গীকার করেছেন। পৃথিবীর সমস্ত জঞ্জাল সরিয়ে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ বিশ^ গড়তে চেয়েছিলেন। আজও যেখানে বিশে^ শিশুরাই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়। কবি সুকান্ত সেই কত বছর আগেই এসব শিশুকে একটি নিরাপদ বিশ^ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। তিনি ভয়হীন এক তারুণ্যদীপ্ত কবি ছিলেন। তিনি আঠারো বছর বয়স কবিতায় উদ্দীপ্ত করেছেন তারুণ্যকে। ‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ/স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি/আঠারো বছর বয়সেই অহরহ/বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।’ তারুণ্যকে প্রকাশ করার কি অদ্ভুত আলাদা ক্ষমতা। এখানেই তার বৈশিষ্ট্য অন্যদের থেকে ভিন্ন। গণমানুষের কবি বলার পেছনে কারণ হলো সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার অনুভূতি রচিত হতো তার চারপাশের মানুষকে নিয়ে। তাদের প্রতিদিনের হাসি কান্নার কথা, বঞ্চনার কথা, শ্রেণি সংগ্রামের কথা এসবই ক্ষোভ হয়ে উঠে আসতো তার কবিতায়।

সুকান্ত ভট্টাচার্য তার কবিতায় কেবল প্রতিবাদই করেননি। এই বাংলার প্রকৃতির প্রেমেও পরেছেন। তবে সেসব কবিতার ভেতরেও তিনি মুক্তির কথা বলেছেন, দেশের পরাধীনতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। মণিপুর কবিতায় লিখেছেনÑ ‘এ আকাশ, এ দিগন্ত, এই মাঠ, স্বপ্নের সবুজ ছোঁয়া মাটি/সহস্র বছর ধ’রে এসে আমি জানি পরিপাটি/জানি এ আমার দেশ অজস্র ঐতিহ্য দিয়ে ঘেরা/এখানে আমার রক্তে বেঁচে আছে পূর্বপুরুষেরা/যদিও দলিত দেশ, তবু মুক্তি কথা কয় কানে/যুগ যুগ আমরা যে বেঁচে থাকি পতনে উত্থানে!’ কবির এই মণিপুরি কবিতাটি একইসঙ্গে দেশপ্রেম, অন্যদিকে দেশের মানুষের অবস্থা সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দেয়। কবি সুকান্ত কখনো তার কবিতায় অগ্নুৎপাত ঘটানো এক আগ্নেয় পাহাড়। আবার কখনো সে শান্তির ছায়া-নিবিড় গুহায় ঘুমানো সিংহের মতো। কবি সুকান্ত এক দেশপ্রেমিক, বিদ্রোহী কবি। তার কবিতার প্রতিটি লাইনে উঠে এসেছে দেশের কথা, দেশের মানুষের কথা। তিনি এ দশা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজেছেন। এই সবুজ শ্যামল বাংলার মাঠ ঘাটকে তিনি ভালোবেসেছেন। তিনি ভালোবেসেছেন বাংলার মানুষকে। তিনি এসব শৃঙ্খল থেকে মুক্তি চেয়েছেন। বারবার তিনি সকল বাধা অতিক্রম করতে চেয়েছেন। অতি অল্প সময়ের জন্য এ পৃথিবীতে এলেও তিনি অনবদ্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

"