দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা একটি পর্যবেক্ষণ

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

বীরেন মুখার্জী

প্রায় প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা, বিশেষ করে রাজধানী থেকে প্রকাশিত প্রথম শ্রেণির পত্রিকাগুলো প্রতি সপ্তাহে একটি ‘সাহিত্য সাময়িকী’ প্রকাশ করে থাকে। বোদ্ধারা বলেন, সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতার প্রভাব প্রান্তবিস্তারী। কিন্তু কী লেখা হচ্ছে দৈনিকের সাহিত্য পাতাগুলোয়? কারা লিখছেন? কেমন লিখছেন? বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যের চলমান ধারা এই সাময়িকীগুলোয় কতটুকু প্রতিফলিতÑএমন জিজ্ঞাসা বোধ করি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় থাকে না। একসময় সাহিত্যকর্মীরা গোষ্ঠীভিত্তিক ‘লিটলম্যাগ’ চর্চা করতেন। গোষ্ঠীচর্চাকারী এই সাহিত্যিকরা বিশেষ করে কবি যশোপ্রার্থীরা দৈনিকের সাহিত্য পাতার প্রতি ছিলেন উন্নাসিক। চল্লিশের দশকে এসে নানামুখী হাওয়ার দাপটে অস্থির সময়কে উপজীব্য করে বাংলা সাহিত্য আবারও নতুনভাবে জেগে ওঠে। একদিকে ভারতজুড়ে এক অসুস্থ রাজনীতির উন্মাদ তাল ঠোকাঠুকি এবং তার রক্তাক্ত প্রতিফলন; অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদবিরোধী আন্দোলন ও গণবিক্ষোভের মধ্য দিয়ে স্বদেশ ও সমাজচেতনার প্রকাশ। পাশাপাশি সংস্কৃতির নানামুখীচর্চায় স্বাদেশিকতা ও সামাজিক মুক্তির তীব্র আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও তখন প্রগতিবাদী মতাদর্শভিত্তিক শিল্প-সাহিত্যচর্চার উর্বর সময়। সংস্কৃতিচর্চার এমন এক সংঘবদ্ধ প্রগতিবাদী রূপ আর কোনো দশকে এতটা তীব্রতা ও ব্যাপকতা নিয়ে দেখা দেয়নি। এ সময়ের অন্যতম কবি আহসান হাবীব। সাহিত্য পাতা সম্পাদনার ক্ষেত্রে কলকাতার বুদ্ধদেব বসুর পরই আহসান হাবীবের নাম উল্লেখযোগ্য। আহসান হাবীবের ছিল জহুরী দৃষ্টির সম্পাদনা। তিনি তার উচ্চমানের সাহিত্য রুচির কষ্টিপাথরে যাচাই করেই লেখা ছাপতেন। আহসান হাবীবের সম্পাদনায় কবিতা প্রকাশিত হয়েছে আর তিনি পরে কবি হয়ে ওঠেননি, এমন দৃষ্টান্ত নেহাতই কম। কিন্তু সাম্প্রতিককালে আহসান হাবীবের মতো এমন নিষ্ঠাবান সুসম্পাদকের অভাব পরিলক্ষিত হওয়ার বিষয়টিও আলোচিত হয় বোদ্ধা পাঠক এবং সাহিত্যিক মহলে।

অনেকেই দৈনিকের সাহিত্য পাতাকে ‘বাজারি সাহিত্য’ আখ্যা দেন। এই খেদোক্তির পেছনে, তাদের হয়তো অকাট্য যুক্তি থাকতে পারে। তবে সাহিত্য পাতার দিকে চোখ রাখলে এটা স্পষ্ট হতে পারে, প্রায় প্রতিটি দৈনিকই গতানুগতিক ধারার সাহিত্যকর্ম প্রকাশ করে থাকে। সাপ্তাহিক সাময়িকীতে যেসব সাহিত্যকর্ম প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হয়, তার বেশির ভাগই সাহিত্যের মানদ-ে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা রাখে না, আলোচনার টেবিলে এমন কথাও শোনা যায়। প্রায় প্রতিটি দৈনিকের সাহিত্য পাতা নিরীক্ষা করলে দেখা যাবে ঘুরে-ফিরে একই লেখক বিচরণ করছেন সাহিত্যের নানা শাখায়। এমন অভিযোগও আছে, সাহিত্য সম্পাদকের কাছের মানুষের রচনা-ই সাহিত্য পাতা ধারণ করছে প্রতি সপ্তাহে। বর্তমানের সাহিত্য সম্পাদকরা সম্পাদনার চেয়ে সংকলক হিসেবেই বেশি আলোচিত। অভিযোগ আছে, নিজেদের মর্জিমাফিক পোষ্য কবি-সাহিত্যিকদের দিয়ে স্তূতিসর্বস্ব লেখা লিখিয়ে নিয়ে প্রকাশ করছেন সম্পাদক নামধারী এই সংকলকরা। এরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্বল্প পরিচিত লেখকের মানহীন লেখা প্রকাশ করে বাহবা কুড়ানোর পাশাপাশি নানা উপঢৌকন গ্রহণ করেন বলেও জনশ্রুতি আছে। অন্যদিকে প্রকাশিত লেখাগুলো পাঠকের চিন্তাবিশ্বে আলোড়ন তুলছে কি নাÑএমন চিন্তা বা আগ্রহ সাম্প্রতিক সময়ের সম্পাদকের আছে কিনা বোধগম্য হয় না। অন্যদিকে সাহিত্য সাময়িকীগুলো ঘিরে একে-অপরের পিঠ চাপড়ে দেওয়ার খেলাও অস্বীকার করা যাবে না। পত্রিকা দেখলেই স্পষ্ট হয়, এক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের লেখা প্রকাশিত হচ্ছে অন্য একটি পত্রিকায় আবার সেই পত্রিকার সম্পাদকের লেখা প্রকাশিত হচ্ছে এই পত্রিকায়। সাহিত্য সম্পাদক কখনো নিজের লেখা দিয়ে নিজের সম্পাদিত পত্রিকার পাতা ভরাচ্ছেন; কখনো লিখছেন নিজের আত্মীয়-স্বজন কিংবা একান্ত কোনো প্রিয়জনের নামে। বোদ্ধামহলে হরহামেশা এসব বিষয় আলোচিত হলেও, তাতে সাহিত্য সম্পাদকদের কিছুই আসে যায় না। দৈনিকের সাহিত্য পাতার সম্পাদকদের সম্পর্কে আলোচিত জনশ্রুতি, অভিযোগ ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হতে পারে, বর্তমান সাহিত্য সম্পাদনার মূল কাজ সাপ্তাহিক এই পাতাটি ভরানো। আবার ঢালাওভাবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকাও অসংগত নয়। মূলত সাহিত্য সম্পাদক এবং উপেক্ষিত লেখকদের অলিখিত এক দ্বন্দ্ব চলে আসছে দিনের পর দিন। সাহিত্য সম্পাদকরা বলেন, তাদের সীমাবদ্ধতার কথা, অন্যদিকে লেখকরা তুলে ধরেন তাদের প্রতি অবজ্ঞার বিষয়টি। এমন অভিযোগও আছে, নিয়মিত যোগাযোগ এবং তৈলমর্দন ছাড়া সাহিত্য সম্পাদকরা লেখা ছাপেন না। বিশেষ করে মফস্বলের লেখকের লেখা এলে সাহিত্য সম্পাদকরা তা খুলেও দেখেন না। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে লেখার প্রাপ্তি স্বীকার সহজ হলেও সম্পাদকরা সেদিকে যান না। ফলে লেখক প্রেরিত লেখাটি সম্পাদক পেলেন কি না, সে দ্বন্দ্বেও পড়তে হয় প্রেরককে।

দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রধানতম চিন্তা বাণিজ্য প্রসারের দিকে। যে কারণে, বিজ্ঞাপন প্রাপ্তিসাপেক্ষে অনেক সময় বিজ্ঞাপনদাতা প্রদত্ত নিম্নমানের লেখাটি দৈনিকের সাহিত্য পাতা প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। এ প্রক্রিয়ায় সাহিত্য সম্পাদক মূলত ঠুঁটো জগন্নাথ। কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করে মালিকপক্ষ বাণিজ্যের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেবে, এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে ধরে নেওয়া হলেও সাহিত্য সম্পাদকরা কী করছেন, তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। প্রকৃত প্রস্তাবে জবাবদিহিতার বিষয়টি না থাকায় সাহিত্য পাতার কনটেন্টের এই মানহীনতাÑএমনটি বলা বোধকরি অমূলক হয় না। আবার ‘সাহিত্য সাময়িকী’ সম্পাদনার সুযোগে কোনো কোনো সম্পাদক তার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানেরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটাচ্ছেনÑএমনও আলোচিত হয় সাহিত্যপাড়ায়। দ্বিতীয় শ্রেণির দৈনিকের ওই সাহিত্য সম্পাদক-প্রকাশকের প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব লেখক অর্থলগ্নি করে বই ছাপিয়ে নেন, অখ্যাত ওইসব লেখকের লেখা নিয়মিত সাহিত্য পাতায় প্রকাশ করে থাকেন তিনি। অন্যদিকে, সাহিত্য পাতার লেখকদের মধ্যে নিজেকে ক্রমাগত ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাও লক্ষণীয় নয়।

বিভিন্ন দৈনিকের সাহিত্য পাতার সম্পাদকদের নিয়ে এরূপ অভিযোগ-অনুযোগ থাকলেও প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য-সম্পাদকদের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ তারা গোষ্ঠীর বাইরে কারো লেখা প্রকাশ করেন না। এ ক্ষেত্রে মফস্বলের লেখকদের লেখা তারা খুলেও দেখেন না। তবে সার্বিকভাবে প্রথম শ্রেণির দৈনিকের সাহিত্য পাতায় ব্যতিক্রমী কিছু সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয়ে আসছে। কয়েকটি দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক বিষয়ভিত্তিক নির্বাচিত লেখা প্রকাশ করে চলেছেন। এর মধ্যে সমকালের ‘কালের খেয়া’, ভোরের পাতার ‘চারুপাতা’, বণিক বার্তার ‘সিল্করুট’র নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এতে পাঠক বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের অতলান্তে ডুবে সহজেই ওই বিষয়ে পরিপূর্ণ স্বাদ আস্বাদন করতে পারছেন। এ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী ‘দৈনিক ইত্তেফাক’, ‘কালের কণ্ঠ’, ‘প্রথম আলো’ এবং ‘প্রতিদিনের সংবাদ’ পত্রিকার সাহিত্যপাতা প্রতি সপ্তাহের আয়োজনে ভিন্নমাত্রা যুক্ত করছে বলে প্রতীয়মান হয়। আবার কয়েকটি দৈনিক সাহিত্যিকের জন্ম ও মৃত্যুদিন ধরে ক্রোড়পত্র প্রকাশেও উৎসাহী। সেখানে বিশ্লেষণধর্মী বা অনুসন্ধানী লেখার বিপরীতে গতানুগতিক প্রবন্ধ-নিবন্ধই প্রকাশিত হয়ে থাকে।

অনেকে মনে করেন, দৈনিকের সাহিত্য পাতার কাছে প্রত্যাশার কিছু নেই। শুধু উপরি কাঠামোগত মন্তব্য বা আলোচনা করে সমস্যা আবিষ্কার করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হতে পারে, সমস্যাটি কোথায়? এ সমস্যা নানাভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। দৈনিকে যে সাহিত্য প্রচার করা হয়, একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে পত্রিকাটি কোনো ধরনের হুমকির মুখে পড়বে না এমন সাহিত্য প্রচার। দ্বিতীয়ত, নিজেদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে এমন সাহিত্যিক। ফলে দৈনিক পত্রিকার কাছে সাহিত্য নিয়ে প্রত্যাশা অযৌক্তিক। আবার কোনো কোনো সম্পাদক পত্রিকার মান রক্ষার্থে কিছু লেখা সংগ্রহ করেন। যাদের লেখা তিনি সংগ্রহ করেন, তারা পরীক্ষিত লেখক। তাই মান বিচারের প্রয়োজন হয় না। সম্পাদকরা মনে করেন, তরুণদের লেখা ছাপার সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে। কোনো একটা লেখার মান তেমন ভালো নয়, কিন্তু কিছুটা শুধরে সেটা সম্পাদক প্রকাশ করলে ওই লেখক নিজেকে বড় ভাবা শুরু করেন। সম্পাদক কেন তার লেখা সংশোধন করেছেন, এমন অভিযোগও ওঠে। এ বোধটা ইদানীং বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। যে কারণে ‘যথাযথ সম্পাদনা’ থেকেও বোধ করি সম্পাদকরা ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। সাহিত্য পাতাকে মানসম্মত করে প্রকাশ করার ক্ষেত্রেও এসব কারণ অন্যতম অন্তরায় বিবেচনা করা যেতে পারে।

"