শূন্য মন পূর্ণ শরীর

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

সৈয়দ নূরুল আলম

আকিব হাসান ছাড়া কলেজের সবাইকে স্যার বলে তাপসী। বয়সে সিনিয়র, তাছাড়া কলেজেও পুরনো সবাই। তাপসী লক্ষ করেছে এখানে কেউ কেউ আবার একজন আরেকজনকে ভাই বলে। তাপসী মনে করে ভাই বলার চেয়ে স্যার বলাই সম্মানের। দুজনের মধ্যে একটা সমীহের ভাব থাকে। কিন্তু আকিবকে কী বলবে এখনো ঠিক করতে পারেনি। আকিব ওর ব্যাচমেট, বয়সও প্রায় কাছাকাছি। দুজন দুজনকে এখনো আপনি বলে। নাম ধরে ডাকা বা ভাই বলা, এখনো সে পর্যায়ে আসেনি। আর আসতে পারবে বলেও মনে করে না তাপসী। কিন্তু আকিব তুমিতে চলে আসতে চায়, সেটা তাপসী বুঝতে পারে। এর মধ্যে একদিন কথার ফাঁকে একবার তাপসীকে তুমি বলে ফেলেছিল। তাপসী বুঝেও না বোঝার ভান করেছে। তুমির উত্তরে তুমি বলেনি। আকিব সেটা লক্ষ করে আবার আপনিতে ফিরে এসেছিল। সেই থেকে আপনিই চলছে। তাপসী কলেজ-ভার্সিটিতে পড়ার সময়ও ক্লাসের ছেলেদের তো বটেই, মেয়েদের সঙ্গেও আপনি আপনি করে কথা বলত। শুধু প্রাণের বন্ধু বিন্তীর সঙ্গে তুমি, কখনোবা তুই করে কথা বলত। কারণ, বিন্তীর সঙ্গে স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ-ভার্সিটি সব জায়গায় একইসঙ্গে পড়েছে। ভার্সিটিতে ভর্তির সময় ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট সবখানে দুজন একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছিল, কোথাও হয়নি। অবশেষে দুজনই জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে চান্স পায় এবং একই সাবজেক্ট ইংরেজিতে। তখন সবাই অবাক হয়েছিল। কেউ কেউ কাকতালীয় বলেছিল। কেউ আবার একটু আগিয়ে বলেছিলÑ দেখিস, তোদের দুজনের বিয়েও হবে একই বাড়িতে। দুই ভাইয়ের সঙ্গে দুজনের। সে সুযোগ অবশ্য এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তবে তাপসী একই বাড়িতে বিয়ের কথা না ভাবলেও, মনে মনে ভেবেছিল, বিন্তী আর ওর যদি একই অফিসে চাকরি হয়, তখন কী মজাই না হবে। সে ভাবনা থেকে চৌত্রিশতম বিসিএস পরীক্ষা দুই বান্ধবী এটে-বেঁধে দিয়েছিল, কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি। পরে পঁয়ত্রিশতম বিসিএস পরীক্ষাও দুজনে একত্রে দিয়েছে। এবার তাপসীরটা হয়ে যায়। অথচ, বিন্তী তাপসীর থেকে পড়ালেখায় বেশি সিরিয়াস। তাপসী ভেবেছিলÑ হলে বিন্তীরই হবে, ওর হবে না। কিন্তু ঘটে উল্টো। এতে বিন্তী খুব দুঃখ পায়। কিন্তু তাপসীকে বুঝতে দেয় না। রেজাল্ট দেখে বিন্তী হেসে হেসে বলে, দুজনের হয়নি তাতে কী, একজনের তো হয়েছে। তুই আয় করবি আর আমি তোর ওপর বসে খাব। যেমন স্ত্রী স্বামীর ওপর ভর করে চলে।

তুই কি আমার বউ নাকি?

হলে দোষ কী?

তা হলে চল আমরা বিয়ে করে ফেলি।

বিন্তী এ ধরনের খুনসুটি করলেও ওর ভেতরটা যে ভেঙে যাচ্ছিল, সেটা তাপসী টের পায়। দু-এক দিনের বন্ধুত্ব তো না। সেই ফ্রক পরা থেকে। ভার্সিটিতে বিন্তী হলে থাকত আর তাপসী ওদের মিরপুরের বাসায়। কিন্তু তাপসীর জন্য হলে একটা সিট বরাদ্দ ছিল। মাঝে মাঝে হলে থাকত। বিশেষ করে পরীক্ষায় আগ দিয়ে। বিন্তীর গ্রামের বাড়ি বরিশাল। পূজার ছুটি, ঈদের ছুটিÑ এ ধরনের বড় বড় ছুটি ছাড়া বিন্তী খুব একটা বাড়ি যেত না। মাঝেমধ্যে শুধু তাপসীর সঙ্গে মিরপুরে বেড়াতে যেত। তাপসীর মা ওকে আর তাপসীকে আলাদা করে দেখতেন না। বরং কিছু দিন যেতে গ্যাপ হলে তাপসীকে বলত, বিন্তী আসে না কেন? তোর সঙ্গে ঝগড়া হয়নি তো? মায়ের এ প্রশ্নের কী উত্তর দেবে তাপসী; বিন্তী কি ঝগড়া করতে পারে? এই এতগুলো বছর পার করল দুজনে। কেউ কারো সঙ্গে কী কখনো মুখ কালো করে কথা বলেছে? তাপসী মনে করতে পারে না।

তাপসী ডিবেটিং ক্লাব, কবিতার ক্লাস এসব করলেও, বিন্তী পড়াশোনা নিয়েই পড়ে থাকত বেশি সময়। ও সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পর থেকেই বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। তাই প্রথমবার যখন ভাইবা দেওয়ার পরও হলো না, তখন বেশ ভেঙে পড়েছিল। আর দ্বিতীয়বার যখন তাপসীর হলো, ওর হলো নাÑ তখন ওকে চরম হতাশা ঘিরে ধরে। বিন্তী পড়া ছেড়ে দেয়। খাওয়া-নাওয়া ছেড়ে দেয়। যত বদ অভ্যাস আছে, আস্তে আস্তে ওকে গ্রাস করে ফেলে। দেখার কেউ নেই, শাসন করার কেউ নেই। এক তাপসী। তাপসী চেষ্টা করেও ওকে ও সব থেকে ফেরাতে পারে না। বিন্তী এক সময় মিরপুর যাওয়াই ছেড়ে দেয়।

তাপসী যেদিন গোপালগঞ্জ জহুর আলী সরকারি কলেজে জয়েন করতে যাবে, তার কয়েক দিন আগে বিন্তীর সঙ্গে দেখা করতে হলে যায়। যেয়ে দেখে বিন্তী পাঁচ তলা হলের ছাদে উঠে সিগারেট খাচ্ছে। চুল উসকো খুসকো। চেহারা ভেঙে দাঁড়কাক। দুচোখের কোণে কালি জমেছে। পরনে জিন্সের প্যান্ট আর টি-শার্ট। পায়ে দুরঙা সেন্ডেল। বিন্তীকে ওই অবস্থায় দেখে তাপসীর খুব কান্না পায়। কান্নাকে কোনো রকম চেপে রেখে বলে, তুই নিজেকে এভাবে শেষ করে দিস না। তোর বাবা-মা’র কথা ভাব, তোর ভাই-বোনের কথা ভাব। তাদের কথা ভেবে তুই ঠিক হয়ে যা। তাছাড়া চাকরি এবার হয়নি তাতে কী, সামনে আরো ভালো কিছু হবে। বয়স তো শেষ হয়ে যায়নি। এখনো দুই বছর সরকারি চাকরির বয়স আছে। বিন্তী কোনো কথা বলে না। এসব কথা ওর কানে ঢুকছে কি না, তাপসী বুঝতে পারে না। একসময় সিগারেটে শেষ টান দিয়ে, সিগারেটের শেষ অংশটুকু কায়দা করে দুই আঙুল দিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তাপসীকে বলে, কলেজে কবে জয়েন করছিস?

সাত তারিখ। আগামী শনিবার। শুক্রবার ঢাকা থেকে যাব।

টুঙ্গিপাড়া, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি তোর কলেজ থেকে কতদূর?

শুনেছি ত্রিশ কিলো হবে।

বঙ্গবন্ধুর মাজার ও তাঁর গ্রামের বাড়ি দেখার খুব ইচ্ছে ছিল।

ইচ্ছে ছিল, যাবি। তোকে তো কেউ না করেনি।

শুনেছি বঙ্গবন্ধুর মাজারকে ঘিরে একটা স্মৃতি কমপ্লেক্স করেছে। ওখানে বড় একটা লাইব্রেরিও আছে।

এক কাজ কর। শুক্রবার তুই আমার সঙ্গে চল। আমরা একসঙ্গে দেখতে যাব। পুরো একদিন আমরা ওখানে থাকব।

তুই আগে যেয়ে সেটেল হ। তারপর দেখি।

অবশ্যই আসবি। তোকে ছাড়া আমি টুঙ্গিপাড়া যাব না।

আচ্ছা তোর কলেজ কি গ্রামে, না থানা লেবেলে?

ইউনিয়ন লেবেলে। রাতইল ইউনিয়নে পড়েছে।

তুই গ্রামে যেয়ে থাকতে পারবি? অবশ্য তুই তো গ্রামপাগল মানুষ।

পরিস্থিতি বলে দেবে, কতটা পারব আর কতটা পারব না।

এভাবে দুই বন্ধু কথা বলতে বলতে অনেকটা সময় চলে যায়। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামে ছাদের কার্নিসে। ঝোপ জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে। বাতিবিহীন ল্যামপোস্টের গোড়ায়।

আগেই কথা ছিল, তাপসী আজ আর মিরপুরের বাসায় ফিরবে না। থেকে যাবে হলে। প্রিয় বান্ধবীর করতলে।

হলের মেয়েরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তাপসী বলে, অনেক রাত হয়েছে চল শুতে যাই।

আরেকটু থাকি? তোকে কি আর এভাবে পাব?

পাবি, পাবি। আগেও যেমন ছিলাম। এখনো আমরা দুজন তেমন থাকব। এই দেখ আমার পার্সের মধ্যে সেই যে কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে যে ছবি রেখেছিলাম, এখনো সে ছবিটা সেভাবে আছে। যখনই পার্সটা খুলি তোকে দেখি। এসব কথা বিন্তীর আবেগকে খোঁচা মারতে পারে। ও প্রসঙ্গ ঘোরাতে বলে, শরৎচন্দ্র তার শ্রীকান্ত উপন্যাসে বলেছিল আঁধারেরও একটি রূপ আছে। ছোট সময় উপন্যাসটা পড়ে, বিষয়টা সেভাবে বুঝিনি। চেয়ে দেখ। কথাটা ঠিক। এ বলে বিন্তী হাত উঁচু করে হলে সামনে বন জঙ্গল, ছোপ ছোপ অন্ধকারÑ সেটা তাপসীকে দেখায়। তাপসী তাকিয়ে অন্ধকারের যে আলাদা একটা রূপ আছে, সেটা খোঁজে।

জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটির চারদিকে এত গাছপালা, বনজঙ্গল। এ জন্যই ভার্সিটিটা তাপসীর কাছে এত প্রিয়। এই ভালো লাগার কারণে ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর ও চেয়েছিল পাকাপোক্তভাবে হলে থাকতে। কিন্তু মায়ের কথা চিন্তা করে থাকেনি। মায়ের তখন ব্রেস্টক্যানসার ধরা পড়ে, যে অসুখ সারার নয়। যত দিন বেঁচে থাকবেন নিয়মিত ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। তাপসী কাছে না থাকলে, কে করবে মায়ের সেবা। এটা ভেবে হলে থাকার কথা আর বাসায় তুলতে পারেনি। মাঝেমধ্যে হলে থেকে, দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছে। কিন্তু তাপসীর প্রকৃতির প্রতি যে মমতা, তা কখনো কমেনি।

বিন্তী তাপসী দুজনে মিলে অন্ধকার দেখতে থাকে। একসময় তাপসী বলে, শ্রীকান্ত বাবুর মতো অন্ধকার নিয়ে গবেষণা করতে হবে না। আমাদের জীবনটাই তো অন্ধকারময়।

আমাদের না। বল এই বিন্তীর।

আবার সেই কথা? আমার মায়ের কথা ভাব।

মা এখন কেমন আছেন? অনেক দিন দেখতে যাই না।

বিন্তী তাপসীর মাকে মা বলেই ডাকে।

একই অবস্থা। আমি থাকব না। তুই মাঝে মাঝে যেয়ে দেখে আসিস।

পৃথিবীটাই আমার আর ভালো লাগে না।

হয়েছে আর বলতে হবে না। চল শুতে যাই।

বিন্তী আর রা করে না। তাপসীর পিছ পিছ ছাদ থেকে নেমে ঘুমাতে যে যার রুমে চলে যায়। দুজনের রুমই পাশাপাশি। তাপসী বিছানায় শুয়ে পড়লে, বিন্তী ওর রুম থেকে বালিশ নিয়ে এসে বলে, আজ তোর সঙ্গে ঘুমাব। কোনো অসুবিধা নেই। বলে তাপসী একটু সরে বিন্তীকে শোবার জায়গা করে দেয়। এভাবে ওরা কতদিন একই বিছানায় ঘুমিয়েছে। কখনো বিন্তীর রুমে। কখনোবা তাপসীর রুমে। সুবিধা ছিল ওদের দুজনেরই সিংগেল রুম। তাই অন্য কারো, কোনো অসুবিধা হয়নি। দুজন নিজেদের মতো করে থেকেছে।

তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়। রাত অনেক হলো। তবে শোয়ার আগে মুখটা ভালো করে ধুয়ে আয়। মুখে ধোঁয়ার গন্ধ থাকলে আমি ঘুমোতে পারব না।

তুই ঘুমিয়ে পড়। আমি বাথরুম ঢুকে আরেকটা টান দিয়ে মুখ ধুইয়ে আসি।

এ কথা বলে বিন্তী বাথরুমের দিকে যায়।

তাপসী ক্লান্ত ছিল। যথারীতি শোয়ামাত্র দুচোখ বন্ধ হয়ে আসে।

বিন্তী কখন বাথরুম থেকে ফিরে এসেছে, তাপসী তা টের পায়নি। হঠাৎ তাপসীর ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ঘুম চোখে দেখে, বিন্তী ওর শরীর নিয়ে কী সব করছে। একটু ধাতস্থ হয়ে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তাপসী হিম হয়ে যায়। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। ও মরার মতো পড়ে থাকে। ও যে জেগে আছে বিন্তীকে বুঝতে দেয় না। অনেকটা সময় এভাবে যায়। একসময় বিন্তী ঠিকঠাক হয়ে আবারও বাথরুমে যায়। বাথরুম থেকে ফিরে এসে তাপসীর পিঠে পিঠ লাগিয়ে শুয়ে পড়ে। তাপসী আরো কিছু সময় ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকে। তারপর কিছু হয়নি এমন ভাব করে বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে যায় এবং সেখান থেকে ফিরে এসে ঘুমের চেষ্টা করে কিন্তু দুচোখে ঘুম আসে না। নানান কথা মনে আসে আর ও ভাবে, কলেজের চাকরিটা ওর না হয়ে বিন্তীর হলেই ভালো হতো।

"