জানালা

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

সানাউল্লাহ সাগর

বাঁ পাশের জানালাটা খোলা। জানালার বাইরে মশারা স্বাধীন মনে গান করছে। চোখের দূরত্বেই নির্মাণাধীন কয়েকটি দালান। জানালার পরই টিনের চালা। তার ওপর বসে আছে অচেনা একটি পাখি। পাখিটি ঠিক অচেনা না। এর আগেও বহুবার দেখেছি। কিন্তু এই মুহূর্তে নামটা মনে পড়ছে না। পাখিটি তার পায়ের সঙ্গে ঠোঁট রেখে এক ধরনের খেলা খেলছে। এই খেলাটার নামও জানি না। একটু পরপর সে যেভাবে ছোট্ট করে লাফ দিয়ে আবার দাঁড়িয়ে যাচ্ছে তা দেখে মনে হচ্ছে, পাখিদের ভাষায় এর ভালো একটা নাম আছে। সে নামটা জানতে পারলে ভালোই লাগত। আর যদি এই পাখিটার ভাষা জানা থাকতো আরো ভালো হতো। এই বিধাব বিকেলটা পাখিটার সঙ্গে গল্প করে কাটিয়ে দেওয়া যেত।

কয়েক দিন থেকে বিকেলগুলো সাদাকালো কাটছে। চেষ্টা করেও ঠিক রাঙাতে পারছি না। মনের মধ্যে আর চোখের কাছাকাছি সব রং দিয়ে একটু একটু করে রাঙাতে চেয়েছি। কিন্তু শেষমেষ সাদাকালোই থেকে যাচ্ছে সব দৃশ্য। হাল ছেড়ে দিয়ে সাদাকালো বিকেলের উরুতে খেলতে থাকি। ব্যর্থ মনকে বোঝাই, ‘আরে সাদাকালো তো কি হয়েছে! একসময় সবই সাদাকালো ছিল। তখন রঙের কৌটায় কত ভেঙচি কাটতো, কত টিপ্পনী। কই তখন তো বিকেলগুলো আমারই থাকত। আর এখন তা-ও মাঝেমধ্যে রঙিন হই। মাল্টিকালারের আইসক্রিম খাই। চোখকেও ঘুড়িয়ে প্যাঁচিয়ে ধরে রাখি আবার ছেড়ে দিই ঘুড়ির লেজে...’

আরেকটা পাখি এসে অন্য পাখিটির একটু দূরত্বে বসল। দেখে বুঝলাম, সে অনেক দূর থেকে এসেছে। দুই পাখির চোখাচোখি দেখতে দেখতে চোখ চলে যায় টিনের চালা সাঁতরে সবুজ মাঠ, খড়ের গাদা পেড়িয়ে দাঁড়ানো দালানে। তিন তলার ব্যালকনিতে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন একজন বয়স্ক পুরুষ।

মশা উড়ছে। তাদের দলটা আগের থেকে একটু বড় এখন।

তিন তলার ব্যালকনিতে টুলজাতীয় কিছু একটা দিয়ে গেল মধ্য বয়সী একজন মহিলা। সে টুলটি দিয়েই চলে গেল।

গলা বাড়িয়ে গাছের মাথায় তাকাই। আমের মুকুল নিয়ে মিছিলের প্রস্তুতিতে থাকা একজনকে দেখা যায়। সে কুয়াশা আর শীতের ভয়ে কেমন টিপটিপ চোখে তাকিয়ে দেখছে সব।

উঁচু থেকে কিছু পড়ার শব্দ হলো। কিছু কি ভাঙল! মনে হলো নিশ্চয়ই বিড়ালের কাজ। কিন্তু বাসায় তো বিড়াল নেই। আমি আর চুপ করে থাকা আসবাবপত্র ছাড়া কেউ নেই। ওহ, আর একজন আছেন। সে অবশ্য দর্শক। ছোটখাটো দর্শক নয়। এক্কেবারে খাঁটি দর্শক। তাকে অবহেলার সাধ্য আমার নেই। অবশ্য আমার কাউকে অবহেলা করার সাহসও নেই। অবহেলাই যখন আমাকে অবহেলা করতে ভুলে গেছে তখন তাকে ভালো না বেসে কই যাই।

যা-ই ভাঙে ভাঙুক। আমার উঠতে ইচ্ছে করছে না। ভেঙেই তো গেছে। শব্দটা অনেকটা গ্লাস ভাঙার মতন। এখন গেলে ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে একত্র করতে হবে। আবার হাত কাটার ভয়ে সতর্ক থাকতে হবে। মনে মনে বিড়ালের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে লাগলাম। কিন্তু আগেও দেখেছি শেষপর্যন্ত হাত কেটে যায়। সাবধানতাকে কাঁচ ভয় পায় না। সে তার মতো কেটে দেয়। জখম করে। তার দরদ উল্টেপাল্টে সীমাবদ্ধ চিৎকারকে ঢেলে দেয় চলমান বাতাসে।

মনে হলো, কেউ একজন পেছনে দাঁড়িয়ে! তার হাতে একটু আগে ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো। সে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছে। হয়তো এগুলো কুড়াতে গিয়ে তারও হাত কেটে গেছে। তার হাত থেকে রক্ত ঝরছে।

আমি পেছনে তাকাই না।

আমার মাথায় তখন রক্তমাখা কাঁচগুলো কিলবিল করে ঢুকে যায়। আমার মাথা তাকে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা তোমার হাঁটু থেকে উরুসন্ধির দূরত্ব কতটুকু, তুমি জানো?’

কেউ জবাব দেয়, না। অথবা কেউ কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব আস্তে করে বলে যায়, ‘আমি ছায়া থেকে যতটুকু দূরত্বে থাকি।’ তার কণ্ঠে নির্মোহভাব।

আমি অস্থির হই। ভেতরটাও কেমন ফুলেফেঁপে ওঠে।

আমি সেই ছায়া থেকে ভাঙা কাঁচ কুড়াতে থাকি!

প্রশ্ন শেষ হতেই সে বলে, ‘না কাঁচই তোমাকে কুড়িয়ে একত্রিত করছে।’ যেন জবাবটা তৈরি করেই সে আমার মাথায় ঢুকেছে।

আমার চোখে ঘুরতে থাকে দেয়ালের বড় আয়নায়। এলোমেলো বিছানায়। ফ্লোরে পড়ে থাকা খড়িমাটির টুকরোয়। চোখ যেন আরো কিছু খুঁজতে থাকে। আমি মাথার মধ্যে ঢুকে যাই। আমার মাথায় এখন দুটা আমি। প্রথম আমি দ্বিতীয় আমিকে প্রশ্ন করে, ‘তুমি কি খুঁজছ, জানো?’

দ্বিতীয় আমি চোখ বড় বড় করে জবাব দেয়, না। আমি সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই তোমার কাছে এসেছি।

প্রথম আমি হাসে। তার চোখে কোনো বিস্ময়ের ভয় নেই। পবিত্রতার লোভ নেই। এমনকি খরগোস তাড়া করার মতো কোনো উৎসুকতাও নেই। দ্বিতীয় আমি বলে, ‘আসলে তোমার একটা শ্লেট দরকার। তোমার চোখ একটা শ্লেট খুঁজছে।’

আমি অনুভব করি পেছনের সেই মালটা এখন ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। হয়তো তার চোখের মধ্যেও বিকেলের প্রজাপতিরা ঢুকে পড়েছে। আমার তাকে বিব্রত করতে ইচ্ছে হলো না। আমি মাথার ময়ূরগুলোকে জানালা দিয়ে উড়িয়ে দিলাম। বাতাসের সঙ্গে হাত রেখে তাদের বললাম, ‘যা তোরা বিব্রতকর কিছু খুঁজে নিয়ে আয়...’

তারপর চুপিচুপি ভাবতে থাকলাম, এখন তো আমার মাথা প্রজাপতিহীন। এখনই তাকে শ্লেট করে ফেলি। শূন্যে প্রশ্ন ছুঁড়লাম, ‘আচ্ছা, তোমার চোখ ভর্তি বিকেলগুলো কি কাঁচ কিনে রেখেছে?’

শূন্য জবাব দেয়, আরে না। তোমার মতো বিজ্ঞান পড়–য়া গণিতের জন্য এত বিকেল সে কই পাবে! তার তো কোনো কাঁচ নেই। হুম বলতে পারো, তার হাত ভর্তি পাখি আছে। আচ্ছা তুমি কি পাখি নিতে চাও? একেবারেই বিনা বাক্যে পেয়ে যাবে। ওহ তোমাকে বলে রাখি, তারা কিন্তু সবাই বোবা। তুমি যদি শেখাতে পারো তবেই তারা কথা বলবে।’

কাছাকাছি কোনো মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের শব্দ উড়ে আসছে। মশাগুলো আর উড়ছে না। হয়তো তারা জানালা গলিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে এখন। অথবা দ্বিতীয় আমির মাথায়। দুই জাতের জোড়া পাখিও নেই। টিনের চালাটা মধ্য রাতের অন্ধকারের মতো স্থির। আর তিন তলার ব্যালকেিনত বসে থাকা বয়সী পুরুষ? সে দাঁড়িয়ে আছে এখনো। এতো দূর থেকে তার চোখের ভাষা বোঝা যাচ্ছে না। তবে আমার চোখ বলছে তার চোখ আকাশ পরিমাপ করছে। নিজের অতীত নিয়ে সে আকাশের সঙ্গে বিনিময় করার চেষ্টা করছে!

ঘরের মধ্য থেকে তাকে কেউ সন্ধ্যার অজুহাতে ডাকলো মনে হচ্ছে। ডাকের চোখে সাড়া দিতে পেছনের দরজায় তাকিয়ে আবার সে এক মুহূর্ত দাঁড়াল। হয়তো আকাশের কাছ থেকে অথবা শূন্যতার কাছ থেকে সাময়িক বিদায় নিল। তারপর চলে গেল। ডাকের উৎসের দিকে। দূরত্বের কারণে যাকে ঠিক মাপতে পারিনি।

আমি হাত দিয়ে জানালার কাঁচটা টেনে দিই।

রক্তমাখা হাত, ভাঙা কাঁচ, বয়সী পুরুষ আর উদাস পাখি সব যেন আমার রুমের মধ্যে! তাদের সঙ্গে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটির বেশ সখ্য। আমি চোখ বন্ধ করে সব দেখছি।

সে গাইছে। কে গাইছে? যাকে আমি দেখিনি। দেখতে চাই না, হয়তো কখনোই না। সে গাইছে, ‘আমার হাত বান্ধিবি পা বান্ধিবি মন বান্ধিবি কেমনে...’

"