ব্রেকিং নিউজ

পহেলা বৈশাখ

বহুমাত্রিক চেতনার উন্মেষ

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

বীরেন মুখার্জী

মানুষের চিরায়ত আকাক্সক্ষা অদেখার প্রতি, নতুনের প্রতি। আর তাই পুরনোকে বিদায় জানিয়ে নতুনকে আবাহন করার আকাক্সক্ষা থেকেই পালিত হয়ে থাকে পহেলা বৈশাখ বা বর্ষবরণ উৎসব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন বলেন, ‘তাপস নিঃশ্বাস বায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে।’ অর্থাৎ, জীবনের সব জীর্ণতা-দীর্ণতা উড়িয়ে দিয়েই নতুনকে আহ্বান জানাতে হয়। কৃষিভিত্তিক বাংলার জনপদে বাংলা সন গণনার সময়পর্ব থেকেই এর শুভসূচনা। সভ্যতার উষালগ্নেও বাঙালি সমাজে বিচ্ছিন্নভাবে দিনটি পালিত হতো। তবে সম্রাট আকবরের শাসনামলে হিজরি সনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারিখ-ই-ইলাহির প্রচলন হলে তা বঙ্গাব্দরূপে গৃহীত ও সমাদৃত হয়। পহেলা বৈশাখ পালনের ক্ষেত্রে নানান রীতি ও নিয়মের নিগূঢ়ও লক্ষ্যণীয়। এ দিনটির পৌরাণিক ভিত্তি যেমন স্বীকৃত, তেমনিভাবে লৌকিকতা, জাতীয়তাবোধের জাগরণসহ বহুমাত্রিক চেতনারও উন্মেষের ক্ষেত্রেও দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।

পৌরাণিক চিত্রে

হিন্দু পুরাণে বৈশাখ নিয়ে নানা তথ্য বিবৃত রয়েছে। লোকগবেষক আতোয়ার রহমান বৈশাখ শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘বৈশাখ তার নামের জন্য বৈশাখ নক্ষত্রের কাছে ঋণী। পুরাণের মতে, বিশাখা চন্দ্রের সপ্তবিংশ পতœীর অন্যতম এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতে কেবল নক্ষত্র। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যের অবস্থানের সঙ্গে বিভিন্ন নক্ষত্রের অবস্থানের সম্পর্ক দেখে মাস ভাগ এবং মাসগুলোর নামকরণ করেছিলেন। বিশাখা উষ্ণতার সূচক।’ সঙ্গত কারণে বৈশাখের সঙ্গে যে উষ্ণতা বা খরতাপ সম্বন্ধযুক্ত, তা বলা বাহুল্য।

বৈশাখের পৌরাণিক প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ দেখা যায়, ‘মাস হিসেবে বৈশাখের একটা স্বতন্ত্র পরিচয় আছে, যা প্রকৃতিতে ও মানবজীবনে প্রত্যক্ষ করা যায়। খররৌদ্র, দাবদাহ, ধু-ধু মাঠ, জলাভাব, কালবৈশাখীর ঝড়, ঝরাপাতা, গাছে গাছে নতুন পাতার আবির্ভাব, আমের কলি ইত্যাদি প্রকৃতি-পরিবেশের রূপ-রূপান্তরের সঙ্গে বাংলার মানুষের মন-প্রাণ-আত্মার যোগ আছে।’ ফলে তৎকালীন সমাজে বৈশাখের প্রথম দিনটির জন্য কৃষিজীবীদের অন্যরকম অপেক্ষা কাজ করত। দিনটি আসার আগেই ঘরবাড়ি, ব্যবহৃত তৈজসপত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবসা ক্ষেত্র ধোয়ামোছা করা হতো। এ কাজগুলোর মধ্যে সামাজিক সফলতার আকাক্সক্ষা নিহিত থাকত। গোটা বছরটি ভালোভাবে অতিবাহিত হওয়ার বিশ্বাস থেকে প্রতিটি পরিবার এ দিনটিকে যথাসাধ্য আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করত। চৈত্রসংক্রান্তির দিনে তৈলবিহীন নিরামিষ ব্যঞ্জন রান্না করার রীতিরও প্রচলন আছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের।

লৌকিকতায়

বৈশাখের সঙ্গে বাঙালির বিশ্বাস, অভ্যাস এবং নানাবিধ সংস্কার জড়িত। দিনটি বাঙালির অন্তরে নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে। আবার ভূমিহীন বর্গাচাষিদের জন্যও যন্ত্রণাদায়ক দিন হিসেবে আবির্ভুত হয়। প্রচলনের শুরুতে বছরের প্রথম দিনে জমিদারের রাজস্বের হিসাব মেটানো হতো। প্রজারা বকেয়া খাজনা পরিশোধ করে মিষ্টি খেয়ে যেত। ব্যবসায়ীরা লাভ-ক্ষতির হিসাবের পুরনো খাতার পালা চুকিয়ে নতুন খাতার সূচনা করত; যার নাম হালখাতা। হাল মানে নতুন বা চলতি, তাই নতুন হিসেব সংরক্ষণের অনুষ্ঠানরূপেও গণ্য হতো বছরের প্রথম দিনটি।

বৈশাখের লৌকিকতা শুরু হয় পরিবার থেকে। আত্মীয়, বন্ধু, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবেশী সুহৃদজনকে শুভেচ্ছা জানানো ও কুশল বিনিময় চলে ছোট-বড়দের মধ্যে। নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত বৈশাখী মেলায় বহু মানুষের সমাগম হয়। বছর শুরুর আগের দিন বসে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা। পরবর্তীতে এই মেলা নববর্ষ-উৎসবের সঙ্গে একীভূত হয়। শিশু-কিশোররা চরকি, নাগরদোলা, বাঁশি, তালপাতার রকমারি আয়োজন নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। কিশোরীরা ব্যস্ত হয় চুড়ি, ফিতে, চুলের ক্লিপ, আলতা, কাজল ইত্যাদি কিনতে। এদের মেলায় নিয়ে আসা অভিভাবকদের ওপর বাড়ির গৃহিণীদের ফরমায়েশ থাকতÑ দা, বটি, চালুনি, কুলো, টুকরি ইত্যাদি গৃহস্থালি-কর্মের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনার। ভালোমন্দ খাওয়া-দাওয়া, কেনাকাটা, শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে পূর্ণ আনন্দের সঙ্গে দিনটি অতিবাহিত করার মধ্যে নিহিত থাকত বছরের সব দিনের শুভ প্রত্যয় এবং বিশ্বাস। মূলত, এসব কর্মকা-ের মাধ্যমে বাঙালি ঐতিহ্যের উন্মেষ ঘটে থাকে। বিবর্তিত জীবনধারায়ও লৌকিক এ ধারাটি প্রবাহমান। বাঙালির আত্মপরিচয়ের মূলমন্ত্র এখানেই নিহিত বলে মনে করা যেতে পারে।

জাতীয়তাবোধের জাগরণে

অস্বীকারের সুযোগ নেই, বাঙালি জাতি বারংবার বিদেশি শক্তির শাসন-শোষণে, নিপীড়িত-নিগৃহীত হয়েছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-উৎসব পালনেও নানান বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। এরপরও বাঙালি তার আপন সত্তা, ঐতিহ্য ও আদর্শ বিচ্যুত হয়ে অথর্ব জাতিতে পরিণত হয়নি। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগোত্তর সময়ে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানভূমির অসাড়তা প্রমাণিত হওয়ার পর প্রগতিশীল ছাত্র-বুদ্ধিজীবীর চেতনায় পহেলা বৈশাখ নতুন রাজনৈতিক মাত্রায় বিকশিত হয়। বাংলা ভাষার প্রশ্নে শাসকের বিরুদ্ধে বাঙালির বিক্ষোভ এ জাতির মধ্যে যে চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল, তা প্রকারান্তরে বাঙালি জাতিসত্তারই উন্মেষ। তখন থেকে বাঙালি জাতি বাংলা নববর্ষ ভিন্নমাত্রায় উদ্যাপন করতে শুরু করে। তখন অনুষ্ঠান হতো পাকিস্তানি শাসনাধীনে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংসের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিবাদী চেতনায়। এর মধ্যে নববর্ষ বা বাংলা বর্ষবরণ উৎসবই হয়ে উঠেছিল বাঙালি চেতনার ধারক ও বাহক। এসব উৎসব প্রগতিশীল চেতনায় বিস্তার লাভ করে প্রতিবাদে, আন্দোলনে, সংগ্রামে অলক্ষ্যে স্বাধীনতার প্রেরণা জুগিয়েছে। বাঙালি জাতিগোষ্ঠী বর্তমান সময়ে ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে যে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করছে, তা ঔপনিবেশিক আমলে সহজ ছিল না। বাঙলা সংস্কৃতির ওপর বারবার যে আঘাত এসেছে সে সম্পর্কে গবেষক ওয়াকিল আহমদ বলেন, ‘আজকের প্রজন্ম নববর্ষকে যেভাবে পালন করে, স্বাধীনতার পূর্বকালে সেভাবে পালন করার সুযোগ ছিল না। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নয়, বরং রাখ-ঢাক করে কিছু লোক ছোটখাটো অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। তারা তা করতেন জাতীয়তাবোধের প্রণোদনা থেকে।... জাতীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরার পুলক আমাদের অন্তরে কাজ করেছিলÑ কথাটা সত্য। রবীন্দ্র সাহিত্য ও সংগীতচর্চা বন্ধ করার যে চক্রান্ত হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল একইÑ বাঙালি জাতীয়তাবোধকে ধ্বংস করা। ১৪ ডিসেম্বর ’৭১ বুদ্ধিজীবী হত্যার পেছনে এটা অন্যতম বড় কারণ ছিল। আমরা সেদিন অমর একুশের মতো বাংলা নববর্ষকে আনুষ্ঠানিক পালন করে আমাদের স্বাধিকার চেতনা, স্বাতন্ত্র্যবোধ ও জাতীয়তাবাদকে জাগ্রত রাখতে চেয়েছিলাম।’ এটা ঠিক যে, পাকিস্তানি শাসক পহেলা বৈশাখকে প্রকৃতি-পূজা বা হিন্দুদের আচার হিসেবে প্রচার চালিয়ে কৌশলে বাঙালি জাতিকে ঐতিহ্যহীন করার ষড়যন্ত্র করে। আর তাতে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ বিভ্রান্তির শিকার হন। এরপরও বাঙালি তরুণরা জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত হয়ে মৌলবাদী গোষ্ঠী ও শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই বৈশাখী অনুষ্ঠানমালা আয়োজন করত। এভাবে পহেলা বৈশাখ বাঙালির রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

পরিশেষে বলা যায়, নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশায় পহেলা বৈশাখকে বরণ করার এই রীতি বাঙালির সংস্কৃতি এবং জাতীয়তাবোধের ভিত্তিকে করেছে সুদৃঢ়। এদিন সবার আন্তরিকতায় বড় হয়ে ওঠে বাঙালিত্বের অনুভব। তবে পহেলা বৈশাখ নানানভাবে তাৎপর্যপূর্ণÑ কোথাও এর উপলক্ষ ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত, কোথাও আর্থসামাজিক অবস্থান থেকে। পহেলা বৈশাখের উৎসব আয়োজনের মধ্যে বাঙালির হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্যও প্রতিফলিত। সব মিলিয়ে পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতিসত্তায় বহুমাত্রিক চেতনার নবায়ন ও উন্মেষের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিন।

 

 

"