বগলের ইট ও এক টুকরো ইলিশ

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

পাঁচ শতাধিক মানুষের বর্ণাঢ্য ও জমকালো আয়োজন। কসিম উদ্দিন চৌধুরী এবারের নববর্ষের উদ্যাপনটা করতে চান ব্যতিক্রমী। খরচের কোনো বালাই রাখতে চান না। দুহাতে পয়সা ঢালছেন পানির স্রোতের মতো। গরিব ছায়েদ মিয়াও একই গ্রামের। চৌধুরী বাড়িতে কাজ করছেন টানা দুদিন ধরে। হঠাৎ পেছন থেকে এসে জোরে হাঁক মারেন কসিম।

দাঁড়াও, ছায়েদ মিয়া।

আসসালামু আলাইকুম চৌধুরী সাব।

কাজের কতদূর? ঠিকঠাক এগোচ্ছে তো সব?

জ্বি। শামিয়ানার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। রান্নাবান্নাও সময়মতো হয়ে যাবে।

বাহ! ভালো। খুব ভালো

ওই দেখুন না, বাবুর্চিরাও সবাই এসে গেছে। সবাই রান্নাবান্নার জোগাড়ে ব্যস্ত।

ইলিশ মাছের প্যাডিগুলো খোলা হয়েছে?

জ্বি।

মাছগুলো দেখেছ, একেকটা কিন্তু বিশাল সাইজের! পদ্মা থেকে এনেছি। গুনে গুনে ১২০টি মাছ!

আত্মতৃপ্তি ও অহংকারে ফেটে পড়েন কসিম। খুশিতে চোখগুলো মোজাইক মার্বেলের মতো চিকচিক করে ওঠে।

জ্বি চৌধুরী সাব, সবগুলো মাছই বিশাল সাইজের। আপনার পছন্দ আছে বলতেই হবে।

হুম, কিন্তু সতর্ক দৃষ্টি রাখবা। বেড়া যেন কোনোভাবে ক্ষেত না খেতে পারে!

কন কি? বেড়া ক্ষেত খায় ক্যামনে?

খায় খায়, সুযোগ পেলে বেড়াও ক্ষেত খায়। গেরস্থের জবর ক্ষতি করে দেয়। যুগ পাল্টে গেছে। মানুষ এখন মনিষ্যি নেই। মুখের ভাষা আর অন্তরের ভাষা দুরকম। হগলের বগলের তলায় এখন ইট! সময় ও জুতসই মওকা খোঁজে।

কথা বলতে বলতে ঈষৎ উত্তেজিত হয়ে পড়েন কসিম। মুখে অদ্ভুত শব্দ করে জমিন থেকে ইঞ্চি দেড়েক শূন্যে লাফিয়ে ওঠেন। ছায়েদ কিছুটা ভড়কে যায়।

চৌধুরী সাব, ফাল মারেন ক্যান?

তুমি বুঝবা না ছায়েদ মিয়া। মানুষের মন আর আকাশের রং ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায়। এখানে বিশ্বাস ও অবিশ্বাস দুটোই পাশাপাশি চলে। মানুষের বগলের সবগুলো ইট একত্র করলে, বড়সড় একখান বিল্ডিং বানানো যায়!

বগলের ইট দিয়েও বিল্ডিং হয়?

হয় সবই হয়। বিশ্বাসকেও হত্যা করা যায়।

তাই নাকি!

হুম, যাকে বলে বিশ্বাসের বাতিঘরে চুরি। ধর, তোমাকে বিশ্বাস করে এই কাজের দায়িত্ব দিলাম, আর তুমি সুযোগ বুঝে আমার মাথায় বাড়ি মারলা। থাক গে ওসব কথা। আমাগো আর আজাইরা বিল্ডিং বানানোর কাম নেই। কী বলো?

জ্বি, জ্বি।

দেখবা আমার মানসম্মানটা যেন বজায় থাকে। বাড়িতে কাল বহু নামিদামি লোক আসছে।

ইনশাল্লাহ, তাই হবে চৌধুরী সাব। চিন্তা করবেন না।

সুবহানআল্লাহ! দিলটা বড্ড খোশ হইয়া গেল।

সিগারেটে ফুঁ দিয়ে ধূলি উড়িয়ে সামনের দিকে কদম বাড়ান কসিম। ধূলিকণার পেছনে আবছায়া মূর্তিমান দাঁড়িয়ে থাকে ছায়েদ। একটু এগিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে চৌধুরী সাহেব দাঁত কেলিয়ে হাসেন। যে হাসিতে লুকিয়ে আছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ ধরে আসা গরিবের প্রতি ধনীদের তীব্র অবিশ্বাস, ঘৃণা ও সন্দেহ। কসিম আর এক মুহূর্ত দাঁড়ান না। হন হন করে চলে যান। ছায়েদ সেদিকে রাজ্যের অবাক চোখে চেয়ে থাকে।

কসিম উদ্দিন চৌধুরী বড্ড অদ্ভুত এক মানুষ। জগতের কাউকে বিশ্বাস করেন না। বগলের ইট বলে কৌশলে ছায়েদকেও সতর্ক করতে ভুল করেননি। যদিও এটুকু বুঝবার মতো কিঞ্চিৎ জ্ঞান ছায়েদেরও আছে। না খেয়ে মরে যাবে তবুও কারো হক নষ্ট করবে না। বাম হাতের উল্টো পিঠে ঘর্মাক্ত কপাল মোছে ছায়েদ। চৌধুরী সাহেব টাকার কুমির। তার কাছে এসব ভাবাবেগের মূল্য নেই। সবাইকে এক পাল্লায় মাপেন। টাকা দিয়ে মানুষ বিচার করা তার স্বভাব। মাত্র কয়েক বছরে সম্পদের পাহাড় গড়ে ফেলেছেন। নামে-বেনামে রয়েছে বহু সম্পদ ও টাকাকড়ি। দুই ছেলে প্রবাসে থাকে। বিদেশেও রয়েছে বাড়ি-গাড়ি। লোকে জানে ঠিকাদারি ব্যবসা। সাধুমন্ত লোক হিসেবেও বাইরে কিছুটা পরিচিতি আছে। লোক দেখানো দান-খয়রাতও করেন। কিন্তু মানুষটা মোটেও জুতের নন। মুখোশের আড়ালে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তলে তলে দু-একখানা অবৈধ গোপন কারবারিও রয়েছে। তার বগলের ইট আরো শাণিত ও ভয়ঙ্কর। ভয়ে কেউ টু শব্দটিও পর্যন্ত করছে না। মান আর জানÑ এ দুটোতেই গরিবের যত ভয়। কয়েক বছর আগেও চৌধুরী সাহেবের আর্থিক অবস্থা মোটেও ভালো ছিল না। হঠাৎ কী থেকে যেন কী হয়ে গেল! রাতারাতি বদলে গেল সবকিছু। রীতিমতো আঙুল ফুলে কলা গাছ! ছায়েদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বেলা দেখে। মাথার ওপরে চান্দি বরাবর গনগনে সূর্যটা ফুঁসছে। এখনো দানাপানি পেটে পড়েনি। পেটে জ্বালা-পোড়া শুরু করে দিয়েছে। কাজের জায়গাটা আরো একচক্কর ঘুরে বাড়ির উদ্দেশে হাঁটা দেয়। দু’মুঠো খেয়ে আবার দ্রুত ফিরতে হবে। রাত পোহালেই চৌধুরী সাহেবের পান্তা উৎসব। কোনো খুঁত রাখা চলবে না। বড় লোকের বিরাট কারবার। একটু এদিক-ওদিক হলেই রক্ষা নেই। রান্না করা ভাত রাতভর পান্তা করে পরদিন সর্ষে ইলিশ দিয়ে মচ্ছব! ছায়েদের এসবের মাথামু-ু বুঝে আসে না। প্রায় সারা বছরই সে পান্তা খেয়ে অভ্যস্ত। সঙ্গে একটুকরো পেঁয়াজ কিংবা পোড়া মরিচ হলেই চলে, আর কিছু লাগে না। পয়সার অভাবে ভালোমন্দ কখনো জোটে কখনো জোটে না। পেটে ভাত নেই, লেবু কচলে লাভ কী? গরিবের ইলিশ খ্যাত পাঙাশ মাছও যেখানে ঠিকমতো জোটে না, সেখানে প্রকৃত ইলিশ মাছের কল্পনা করাও বিলাসিতা। হিমালয়সম দীর্ঘশ্বাসটা শেষপর্যন্ত নেমে আসে ছায়েদের বুক ফুঁড়ে। বুকের বাঁ-পাজরে ব্যথা অনুভূত হয় চিন চিন করে।

স্কুল থেকে বাসায় ফেরে ছোট্ট মেয়ে সুমি। বাবাকে দেখতে পেয়ে সোজা গলা জড়িয়ে ধরে। গেল মাসে মেয়েটি সাত বছরে পা দিয়েছে। দিন যত যাচ্ছে তত পাকামোও বাড়ছে। সুযোগ পেলে প্রশ্নের পর প্রশ্নবাণে বাবা-মাকে জর্জরিত করছে। সবেমাত্র প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। ছায়েদ ঘরের দেউড়িতে হোগলা বিছিয়ে একটু জিরিয়ে নেয়। দুপুরের এ সময়টা আজকাল বড্ড অলসতা পেয়ে বসে। একটু ভাত ঘুম না হলে শরীর-মনে কাজ করার মুরোদ আসে না। আজ অবশ্যি ঘুমানোরও জো নেই। মেলা কাজ পড়ে আসে চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে। বড়লোকি কারবার। রাত পোহালেই ধুমধাম পহেলা বৈশাখ উদযাপন। গানবাজনার সঙ্গে সঙ্গে ধুমসে খাওয়া-দাওয়া। এখানে গরিব-অসহায়দের ঢুকতে বারণ। কড়া সতর্কতা জারি রয়েছে। ছায়েদ দিনমুজুর কামলা। পই পই করে চৌধুরী সাহেব বলে দিয়েছেন, কাজের জোগাড় থেকে শুরু করে শেষ অব্দি কোনো ফাঁক যেন না থাকে। পাশাপাশি এ-ও বলেছেন, চতুর্দিকে খুব সতর্ক দৃষ্টি রাখতে। মেয়ের এই সময়ে গলাগলি-ঢলাঢলি দেখে ছায়েদ বুঝতে পারে কিছু একটা হয়েছে।

মা, কিছু বলবি?

হু।

জলদি বলে ফেল। তাড়া আছে।

ভরসা পেয়ে মেয়ের চোখগুলো আশায় ছল ছল করে ওঠে। বলে, আব্বু, কাল আমাদের জন্য একখানা ইলিশ মাছ আনবে?

চমকে ওঠে ছায়েদ। মেয়ের মুখেও আজ ইলিশের কথা! রাত পোহালেই বাংলা নববর্ষ। দেশব্যাপী ইলিশ ও পান্তা উৎসব। এসব ধনী পয়সাওয়ালাদের কাজ। আমাদের জন্য নয়। নিশ্চয়ই মেয়েটা স্কুল থেকে শুনে এসেছে। নিজে কবে ইলিশের স্বাদ পেয়েছে ঠিকমতো ঠাহর করতে পারছে না। সাত বছরের মেয়ে ইলিশের স্বাদ পাবে কোত্থেকে।

হ্যাঁরে মা। তুই খেতে চাস?

হুম, আমি খেতে চাই। ম্যাডামদের মুখে শুনেছি, নববর্ষে পান্তার সঙ্গে ইলিশ মাছ খেতে নাকি ভারি মজা! বইতেও আছে, ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ।

ছায়েদ মিয়ার ভ্রু কুঁচকে ওঠে একরত্তি মেয়ের কথা শুনে। বাচ্চাদের বইপত্রে ইলিশ যতটা দেখা যায়, বাস্তবে ততটা নয়। অথচ ইলিশ নাকি জাতীয় মাছ! শিক্ষিত মানুষগুলোর কাজকর্ম তার মাথায় ঢুকে না। যে জিনিস সবাই ঠিকমতো খেতে পারে না কিংবা সামান্যতম দাঁতে কাটতেও পারে না, সেটা জাতীয় হয় কীভাবে? অথচ, ছোটদের স্কুলে তাই শেখানো হচ্ছে।

আচ্ছা মা, ঠিক আছে। আব্বু তোকে কাল ইলিশ মাছ খাওয়াব, কথা দিলাম।

রানু বেগম পাশেই ছিল। বাপ-মেয়ের কথপোকথন শুনছিল। হঠাৎ ধমকে ওঠে মেয়েকে।

অ্যাই, তুই থামবি। ঘরে ভাত নেই, মাইয়ার ইলিশ খাওয়ার শখ কতো! ঢং দেখে বাঁচি না!

আহ্হা, তুমি চুপ কর। মেয়েটাকে অমন করে বকছ কেন?

বকব না তো মেয়েকে তোমার মতো লাই দিয়ে মাথায় তুলব?

যারে মা যা, কথা দিলাম। আমি তোকে খাওয়াব।

আব্বু সত্যিই?

খাওয়াবরে মা খাওয়াব, তিন সত্যি।

সুমির আনন্দ ধরে না। খুশিতে দৌড়াতে থাকে। আজ নিশ্চয়ই জনে জনের কাছে এই গল্প বলে বেড়াবে, আব্বু ইলিশ মাছ খাওয়াবে। ছায়েদ মিয়া আর বসে থাকে না। গামছাখানা কাঁধে ফেলে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে। মনে মনে একখানা বিশ্বাস পোক্ত রাখে, চৌধুরী সাহেবকে আগেভাগে বলেকয়ে নিশ্চয় একটুকরো ইলিশের ভাগিদার হওয়া যাবে। বলব, আমার ছোট্ট সুমি মাটা খেতে চেয়েছে। চৌধুরী সাব নিশ্চয় তাকে শূন্য হাতে ফেরাবে না। আশায় বুক বাঁধে ছায়েদ মিয়া। চোখগুলো ছল ছল করে ওঠে। দিনগুলো কেমন জানি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বর্তমানের সঙ্গে আগের দিনের অনেক ফারাক। নববর্ষ আসলে আগে কত আনন্দ হতো। ছায়েদের কাছে ফেলে আসা সেইসব দিনগুলো মুহূর্তে ভেসে ওঠে। দু’বেলা দু’মুঠো খেতে না পারলেও ঘরে ঘরে কত সুখ-আহ্লাদ ছিল। ঈদ-পার্বন ও নববর্ষের আনন্দগুলো সবাই মিলেমিশে ভাগাভাগি করে নিত। সালামি দেয়ারও চল ছিল। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আনন্দগুলো বড়দের মাঝেও দারুণভাবে সমান ছুঁঁয়ে যেত। ম-া, মিঠাই ও বাতাসা জনে জনে বিলি-বণ্টন হতো। হাট-বাজারগুলোতে শুভ হালখাতার নামে রীতিমতো উৎসবের পসরা বসে যেত। মানুষের মাঝে বিশ্বাস ও ভালোবাসা এতটুকুন কমতি ছিল না। ছিল না এখনকার মতো এত অবিশ্বাস ও হিংসা-বিদ্বেষ। একে-অপরের দুঃখ-কষ্ট হৃদয় দিয়ে অনুভব করত। পুরাতন বছরের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, ক্লেদ-খেদ, জরাজীর্ণ ও মান-অভিমান ভুলে নতুন বছরে পরস্পরে সম্প্রীতির মেলবন্ধনে আবদ্ধ হতো। ইলিশ আর পান্তা উৎসবের নামে এখনকার মতো অর্থের অপচয় হয়তো ছিল না ঠিকই, কিন্তু পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির কোনো কমতি ছিল না। গরিব-অসহায়দের নিয়ে প্রহসন বা ঠাট্টা-মশকরা ঘটা করে উদযাপন হতো না। বছরজুড়ে গরিবের খাওয়া পান্তাকে ধনীরা একদিন ঘটা করে পালন করার মাঝে কী আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে, ছায়েদের বুঝে আসে না। ভাবতে ভাবতে রাগে-ক্ষোভে তার দাঁতের চোয়ালগুলো ক্রমশ খিচ মেরে শক্ত হয়ে ওঠে।

ভোরে ঘুম থেকে ওঠতেই পূবের সূর্যটাকে অন্য দিনের মতোই মনে হয়েছে। নববর্ষ বলে এতে আলাদা বিশেষত্ব নেই। নববর্ষের সকালে এপাড়া যতটা শান্ত ওপাড়া ততটাই অশান্ত। চৌধুরী পাড়ায় গভীর রাতভর পর্যন্ত উচ্চস্বরে গানবাদ্য বেজেছে। ভোর হতে না হতে আবারো ঢাকে কাঠি পড়েছে। নববর্ষ এখন আর সবার জন্য সমানভাবে বলেকয়ে আসে না। ছায়েদ একটুকরো পোড়া বিস্কিট মুখে পুরে দ্রুত বেরিয়ে যায়। কেন জানি না, কসিম উদ্দিন চৌধুরী সকাল থেকে রেগে অগ্নিশর্মা। অন্যরকম লাগছে তাকে। গলার হাঁক-ডাকও আজ একটু বাজখাই, কর্কশ। ঠিক কী কারণে রেগে আছেন বোঝা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে মেহমান আসতে শুরু করেছে। হাত বাড়িয়ে চৌধুরী সাহেব সবাইকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। সতর্ক দৃষ্টিতে তদারকি করছেন খানাপিনাসহ সবকিছু। বাসনপত্র ধোয়ামোছায় ব্যস্ত ছায়েদ। বারকয়েক চেষ্টা করেও চৌধুরী

সাহেবের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি। সুযোগ পেলে মেয়েটার জন্য একটুকরো ইলিশ চেয়ে বসত। এই আশায় আজ ছোট্ট একখানা পলিথিনও কোমরে গুজে নিয়ে এসেছে। প্যান্ডেলের ভেতরে আজ তাকেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এক জায়গায় বসে শুধু ধোয়া-মোছার কাজ করছে। চোখের সামনে সে দেখতে পাচ্ছে বহু খাবার নষ্ট হতে। নষ্ট করা ইলিশের টুকরোগুলো বাইরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। কেউ খেতে পাচ্ছে না, আর কেউ হেলায় নষ্ট করছে। চোখের সামনে এমন নিদারুণ বৈষম্য ছায়েদ মেনে নিতে পারছে না। বেলা গড়িয়ে বিকেল হতে চলল ছায়েদের পেটে একফোঁটা দানাপানিও পড়েনি। অভুক্ত পেট মোচড় দিয়ে উঠছে। অথচ, ধনীদের বিলাসিতায় ভুরি ভুরি খাদ্য অপচয় হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের এদিকটা আর ওদিকটায় কত ফারাক, কত বৈষম্য। এখানে ভদ্দরলোকেরা থাকে আর ওখানে অভাবীরা। দিনের শেষলগ্নে এসে চৌধুরী সাহেবের চরিত্র আরো একবার ফুটে ওঠে। বেরিয়ে আসে তার বগলের তলার শাণিত ইটগুলোও। এরইমধ্যে খবর আসে চৌধুরী সাহেব বড্ড ক্লান্ত। আজ আর কারো মজুরি দেওয়া হবে না। সারাদিনে অক্লান্ত খাটুনিতে বিধ্বস্ত ও অভুক্ত ছায়েদের মাথার ওপর মুহূর্তে আকাশ ভেঙে পড়ে। কোমরে গুজে রাখা লুঙ্গির কাছা থেকে খালি পলিথিনখানা বের করে নিয়ে আসে। দুই হাতে টান টান করে মেলে ধরে চোখের সামনে। তাতে ভেসে ওঠে তার অসহায় মেয়ের নিষ্পাপ একরত্তি কচিপানা মুখখানা। সে তুলনায় চৌধুরী পাড়ার কুকুরগুলোও কত ভাগ্যবান। অথচ, মেয়েটার ভাগ্যে একটুকরো ইলিশ জোটেনি। এক বুক আশা ও বিশ্বাস নিয়ে মেয়েটা নিশ্চয়ই দিনভর বাপের পথপানে চেয়ে বসে আছে। চোরের মতো বাড়িমুখো হয় ছায়েদ। তার অবশ পা জোড়া যেন চলে না। তবুও কোনো রকমে পা টেনে টেনে হাঁটে। অক্ষম পিতার বগলের ইটখানাও মেয়ের চোখের সামনে খসে পড়ে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার মারে ছায়েদÑ মারে পারলাম না আমি তোর সাধ পূরণ করতে, আমারে তুই ক্ষমা করিস। এই বুড়ো বাপকে অবিশ্বাস করিস না। বগলের ইট চৌধুরী পাড়ায় থাকে, আমাদের পাড়ায় না। এই অক্ষম বাপটারে তুই ক্ষমা করিস।

 

"