রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতাল

ভুয়া রোগী দেখিয়ে লাখ লাখ টাকার ওষুধ চুরি

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

এস এইচ এম তরিকুল, রাজশাহী

রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর বিছানাগুলো প্রায় সারা বছরই থাকে ফাঁকা। তারপরও সেবিকা বা চিকিৎসকরা ব্যস্ততার মধ্যেই সময় অতিবাহিত করেন। তবে রোগীদের সেবায় নয়, ব্যস্ততা খাতাপত্রে রোগীদের নাম পরিচয় লিখে নথিজাতকরণে। আর এভাবে ভুয়া রোগীর নামে প্রতিদিনই সরিয়ে ফেলা হচ্ছে ওষুধ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য দিয়েছেন রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতালের কয়েকজন স্টাফ। তথ্য প্রদান কালে তাদের চোখে মুখে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষোভের হাওয়া ছড়িয়ে বলেন, ‘ভাই খুলুর (কুলুর) বলদ চেনেন, আমরা স্যারদের কাছে সেই খুলুর বলদ, শুধু খাটিয়েই নিবে, টাকা দেবার বেলায় নাই।’

এদিকে গত এক সপ্তাহ ধরে সরেজমিনে এই হাসপাতালে গিয়ে রোগীর তেমন আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়নি। জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য কোনো রোগী আসেন না এখানে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, জরুরি চিকিৎসাসেবা নিয়েই ওইসব রোগী ভর্তি না হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চলে যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য মতে, এখানে এক বছরে বরাদ্দ এসেছে ১৬ লাখ ৭৩ হাজার ১০৫ টাকার ওষুধ। যেগুলো রোগীদের নামেই বিতরণ করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, রোগীর আনাগোনা না থাকলেও এত ওষুধ গেল কাদের পেটে?

রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতাল সূত্রে বলছে, রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল হাসপাতালগুলোর জন্য ২০১৮-২০১৯ বছরে ৮৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫২৯ টাকার ওষুধ কেনা হয়। এর মধ্যে রাজশাহীকে দেওয়া হয় ২০ শতাংশ। সে হিসাবে পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৭৩ হাজার ১০৫ টাকা। এ বরাদ্দকৃত টাকার ওষুধ ক্রয়ের বিপরীতে রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতালে ২১ হাজার ৭৬৪ রোগী চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ২১৭ এবং আউটডোর থেকে ২১ হাজার ৫৪৭ জন।

এ বিষয়ে এক কর্মকর্তার স্বজন পরিচয়ে কথা বলার সময় রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট গোলাম কবির বলেন, অনেক সময় ডাক্তাররা ব্যস্ত থাকেন তখন আমরাই ওষুধ দিয়ে দিই। পরে সেটি ডাক্তারের কাছে স্লিপ করে নিই। তবে স্লিপ ছাড়া কোনো ওষুধ দেন না বলেও জানান তিনি।

এদিকে হাসপাতালের রেজিস্ট্রারে নাম না থাকলেও দেখানো হয়েছে ওষুধ বিতরণ। এ বিষয়ে দায়িত্বে থাকা ফার্মাসিস্ট আবদুল আজিজ বলেন, এখানকার হিসেবে দেখি, একজনের ওষুধ অন্যজন নিয়ে যান। কাকে কী বলব?

গতকাল রোববার দুপুরে এক স্টাফকে খোঁজার অজুহাতে গিয়ে দেখা যায়, রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতালের আউটডোরে একজন রোগীও নেই। ইনডোরেও কোনো রোগী নেই। ভেতরের একটি কক্ষে দেখা যায় দুজন ব্যক্তি রোগীর তালিকা নিয়ে কী যেন করছেন। বের হওয়ার সময় দেখা যায় এক নার্স টেলিভিশনের পর্দায় চলা সিরিয়ালের দিকে তাকিয়ে আছেন। এমন অবস্থা কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রোগীও নাই, স্যারও নাই, কাজও নাই, বৃষ্টিও হচ্ছে, কি আর করব, তাই একটু টিভি দেখছি।’

এরপর দেখা গেল, আউটডোরের সামনে থাকা মেডিসিন কর্নারও ফাঁকা। পরে হাসপাতাল ফটকের সামনে দেখা গেল এক যুবকের দুই হাতেই ওষুধের বক্স। থামিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, ‘আমি এটিকার (এখানকার) স্টাফ না, আমাক মাজেমদ্যে (প্রায়) আইসতে (আসতে) কয়, আসি, লিয়া চইলি (নিয়ে চলে) যায়।’

এ সময় সাংবাদিক পরিচয় অনুমান করে যুবকটি বলেন, ‘আমার পরিচয় কি লিবেন, আইচি (এসেছি) হরিয়ান থাইকি (থেকে)। আর এসব জাইনি (জেনে) আপনের কোনো লাভ নাই ভাই, এই ওষুধের হিসাব না লিয়ে (নিয়ে) মোটা ফেটি দেন (বেশি টাকা), দিবেন কন, জাগা মুতোন লিয়া (গোপনীয় নির্দিষ্ট স্থান) যাচ্চি, তবে টেকা কিন্তু স্ট্যান্ড নাও দিয়া লাগবি। কতা কইচ্চেন না (বলছেন না) যে ভাই, বুননু না (বললাম না) লাভ নাই, খালি খালি আমার সময় নষ্ট করলেন।’ ধারাবাহিকভাবে কথাগুলো বলেই চলে গেলেন যুবকটি। আর ফিরেও তাকালেন না। এ সময় তার কাছে এগিয়ে যেতেই একটি অটোরিকশা থামিয়ে তাতে উঠে গেলেন।’ জানা গেছে, হাসপাতালের এমন দৃশ্য প্রতিদিনেরই।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, এখানে কোনো রোগী হয় না। এভাবে প্রতিদিনই ওষুধ চলে যাচ্ছে। তবে ওষুধ বিতরণের রেজিস্ট্রার ঠিকই মানা হয়। অনিয়ম দুর্নীতি সব জায়গাতেই আছে তাই বলে এমনটি মনে করার কারণ নাই যে, সব ওষুধই বিক্রি করে খাওয়া হয়। প্রতিদিনই হাসপাতালে কর্মরত বিভিন্ন স্টাফদের নিজের লোকদের ওষুধ দিতে হয়। অনিয়মের সঙ্গে কারা জড়িত জানতে চাইলে বলেন, ‘বোঝেন-ই তো, ওপর লেবেলের কর্মকর্তা ছাড়া সম্ভব নয়।’

এ বিষয়ে জানতে গতকাল দুপুরে রেলওয়ে হাসপাতালে প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা (সিএমও) ডা. এস এ এম এমতেয়াজকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনের মাধ্যমে তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আমি ঢাকায় আছি, এসে এ বিষয়ে কথা হবে।’

বিকালে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল, রাজশাহীর জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) হারুন-অর রশিদ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘বিষয়টি সাংবাদিক মারফত অবগত হয়ে আজই (রোববার) সকালে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞাসাবাদে সেখানকার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চিকিৎসা সেবাদানকারীদের তালিকা তারা সংরক্ষণ করেননি। আরো বেশকিছু অনিয়ম চোখে পড়েছে। তবে নিশ্চিত থাকুন অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহীর জিএম হিসেবে সম্প্রতি যোগদান করা এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি এখানে জয়েন্ট করার পরই অধীনস্থ সব কর্মকর্তাদের বলেছি এবং আজও ওই হাসপাতালে বলে এসেছি, আমি থাকাকালীন কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। এখন থেকে সবাই সজাগ হয়ে অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন। আর হাসপাতালের থাকা সিসি ফুটেজ মোতাবেক রোগীর সংখ্যা বা একই ব্যক্তি রোগীর বাহানায় ওষুধ নিচ্ছেন বা নিয়েছেন তা খতিয়ে দেখে প্রশাসনিকভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

 

"