সিন্ডিকেট করে সিদ্ধিরগঞ্জে বিমানের তেল চুরি!

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

আবদুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ

পদ্মা ও মেঘনা অয়েল ডিপোকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলের বার্মাশীলও এসওরোড এলাকায় গড়ে উঠেছে বিমানের চোরাই তেলের সিন্ডিকেট চক্র। বিমানের জ্বালানি তেল জেট-ওয়ান, অকটেন, পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন, ফার্নেশ ও জিওবি তেল প্রকাশ্য চুরি করে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। জানা গেছে, তেল চুরির কারবার করে বার্মাশীল ও এসওরোড এলাকার অর্ধশত লোক কোটিপতি হয়েছেন। কোম্পানির এজেন্টশিপ নিয়ে অনেকে বৈধ ব্যবসার আড়ালে করছেন চোরাই তেলের ব্যবসা। এ নিয়ে একাধিকবার সংঘাত-সংঘর্ষ ও অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। ডিপো গেট থেকে শুরু করে প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের দুপাশে শতাধিক তেল চোরদের ‘ঘুমটিঘর’ রয়েছে। সড়কটি পদ্মা ও মেঘনা ডিপোর নিজস্ব সড়ক। ওই ঘুমটিঘরে তেলবোঝাই লরি থামিয়ে তেল নামানো হয়। পুলিশ তেলচোরদের ঘুমটিঘরে চাপান, সিগারেটে আপ্যায়িত হয়। পরে ‘বকশিশ’ নিয়ে চলে যায়। সম্পূর্ণ বাইরে বিক্রি নিষিদ্ধ বিমানের তেল জেট-ওয়ান ও অবাধে বিক্রি হচ্ছে। রঙিন কেরোসিনের সঙ্গে একপ্রকার রাসায়নিক সাদা পাউডার মিশিয়ে কেরোসিনের রং সাদা করে অকটেন, পেট্রল ও জেট-ওয়ানের সঙ্গে মিশিয়ে ভেজাল করে বিভিন্ন পেট্রলপাম্পসহ বিভিন্ন জায়গায় বাজারজাত করার অভিযোগও রয়েছে।

পদ্মা ডিপোর ম্যানেজার আসিফ মালিক জানান, গড়ে দৈনিক ১২ লক্ষাধিক লিটার বিমানের জ্বালানি তেল জেট-ওয়ান সরবরাহ করা হয় এখান থেকে। এ ছাড়া এ ডিপো থেকে দৈনিক (শুক্রবার ছাড়া) ১৪-১৫ লাখ লিটার পেট্রল, অকটেন, ডিজেল, কেরোসিন, ফার্নেশ ও জেবিও সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি লরি থামিয়ে সর্বনিম্ন ৪টি (৮০ লিটার) করে দৈনিক ৮ হাজার লিটার, মাসে ২ লাখ ৮০ হাজার লিটার এবং বছরে ২৪ লাখ ৯৬ হাজার লিটার তেল নামানো হয়। মেঘনা ডিপোর ম্যানেজার লুৎফর রহমান জানান, এই ডিপো থেকে দৈনিক ১১-১২ লক্ষাধিক লিটার জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়, প্রচুর তেল মজুদ রয়েছে বলে তিনি জানান।

পদ্মা ডিপো থেকে ১২৭টি ট্যাংকলরির মাধ্যমে বিমানের তেল নিয়ে ডিপো থেকে বের হওয়ার পর ঘুমটিঘরের সামনে লরি থামিয়ে প্রতিটি লরি থেকে সর্বনিম্ন চার টিন করে (৮০ লিটার) করে তেল নামানো হয়। দৈনিক ১০ হাজার ১৬০ লিটার, যা বছরে দাঁড়ায় ৩৬ লাখ ৫৭ হাজার ৬০০ লিটার। যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা। প্রতিটি লরি থামিয়ে চার টিন (৮০ লিটার) করে (শুক্রবার ছাড়া) দৈনিক ১২ হাজার লিটার তেল চুরি করছে, যা বছরে দাঁড়ায় ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার লিটার। ট্যাংকলরির চালকদের তথ্য মতে, লরি থেকে চুরি করে তেল বিক্রির বিনিময়ে কুর্মিটোলা ডিপো কর্মকর্তাদের লরিপ্রতি ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং তেল পরিমাপককে ৫০০ করে টাকা দিতে হচ্ছে। তেল বিক্রি করে কুর্মিটোলা ডিপোতে টাকা না দিলে পরিমাপের সময় তেল সর্ট দেখানো হয়। যার কারণে বাধ্য হয়ে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে।

এলাকাবাসী জানায়, পদ্মা ও মেঘনা ডিপোর পেছনে শীতলক্ষ্যা নদীর ডিপোতে তেল খালাসের জন্য অপেক্ষারত তেলের জাহাজ থেকে গভীর রাতে এলাকার প্রভাবশালীরা তেল চুরিতে মেতে ওঠে। তেল চুরির বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও এসওরোড এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম (ম-ল) বলেন, অনেকেই মেঘনা ও পদ্মা ডিপো থেকে এজেন্টশিপ নিয়ে বৈধভাবে তেলের ব্যবসা করছেন। এরপরও যদি কেউ অবৈধ ব্যবসা করে থাকে, তাহলে তা প্রশাসন দেখবে বলে সিরাজুল ইসলাম জানান।

এদিকে মেঘনা ডিপোর ম্যানেজার লুৎফর রহমান বলেন, ডিপো থেকে তেল চুরির কোনো সুযোগ নেই। তবে বাইরে তেল চুরির বিষয় থানা-পুলিশ দেখবে।

পদ্মা ডিপোর ম্যানেজার আসিফ মালিক জানান, জাহাজ থেকে তেল পরিমাপ করে ডিপোতে ওঠানো হয়। তেলের মধ্যে শূন্য দশমিক ১৭ পারসেন্ট ট্রানজিট লস দেখানো নিয়ম রয়েছে। এর বেশি দেখালে আমরা জাহাজের ভাড়া টাকা থেকে তেলের টাকা কেটে রাখি, ডিপো থেকে তেল চুরির কোনো সুযোগ নেই বলে ম্যানেজার দাবি করেন।

বার্মাশীল এলাকার ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. জাহিদ জানান, পদ্মা ডিপো থেকে বিমানের জ্বালানি তেল কুর্মিটোলা নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে তেল পরিমাপ করে রাখে, তেল কম হলে তা লগ বইতে সর্ট লিখে দেয়, লরির ভাড়া টাকা থেকে তা পরিশোধ করতে হচ্ছে। জাহিদ স্বীকার করেন, অন্যান্য তেল পেট্রলপাম্পে সরবরাহ করার সময় লরিচালকরা পাম্পের লোকদের সঙ্গে আঁতাত করে কিছু তেল চুরি করে। তেল চুরি সিন্ডিকেটের ব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি কামরুল ফারুক বলেন, তেল চুরির ব্যাপারে কেউ অভিযোগ দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

 

"