আমের রাজধানী নওগাঁ

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৯, ০০:০০

নওগাঁ প্রতিনিধি

আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে নওগাঁ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও নাটোর জেলাকে ছাড়িয়ে গেছে। শুকনা বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এক ফসলি জমিতে ধান চাষের চেয়ে আম চাষ লাভজনক। আর এ কারণেই প্রতি বছর আম বাগান বাড়ছে এ জেলায়। মাটির বৈশিষ্ট্যগত (এঁটেল মাটি) কারণে আম সুস্বাদু হওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে নওগাঁর আমের। জেলায় চলতি বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হবে। তবে আমের ভরা মৌসুমে আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও পাইকারি বাজার গড়ে না তোলায় আমচাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সূত্র মতে, এ বছর জেলায় ১৮ হাজার ৫২৭ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে। এর মধ্যে পোরশায় ৯ হাজার হেক্টর, সাপাহার উপজেলায় ৪ হাজার, নিয়ামতপুরে ৯৫০, পতœীতলায় ২ হাজার ২০০, ধামইরহাটে ৬১৫, মান্দায় ৪০০, নওগাঁ সদরে ৪০০, মহাদেবপুরে ৩৬০, বদলগাছীতে ৩৪০, রানীনগের ১৪৬ হেক্টর এবং আত্রাইয়ে ১১৬ হেক্টর। এ বছর আমের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টন। নওগাঁর আম সুস্বাদু হওয়ায় দুবছর থেকে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। গত সাত বছর আগে জেলায় মাত্র ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হতো। জেলায় গুটি, ল্যাংরা, ফজলি, ক্ষিরসাপতি, মোহনভোগ, আশ্বিনা, গোপালভোগ, হাঁড়িভাঙ্গা, আম্রপালি, বারি-৩, ৪ ও ১১, নাগফজলি, গৌড়মতি উন্নত জাতের আম চাষ হচ্ছে। এ ছাড়াও দেশীয় বিভিন্ন জাতের আম চাষ করা হয়ে থাকে।

জেলার সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর উপজেলা এবং পতœীতলা ও ধামইরহাট উপজেলার আংশিক বরেন্দ্র এলাকা হিসেবে খ্যাত। এলাকার জমিতে বছরের একটিমাত্র ফসল বৃষ্টিনির্ভর আমন ধান। পানিস্বল্পতার কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। এ ছাড়া ধানের আবাদে খরচও বেশি। অন্যদিকে আম চাষে লাভ বেশি। ফলে ধান উৎপাদনের খরচ বেশি হওয়ায় কৃষকরা এখন আম চাষে ঝুঁকেছেন। এতে করে প্রতি বছর প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে বাড়ছে আম বাগান। আম্রপালি, আশ্বিনা, ক্ষিরসা, মল্লিকা, হাঁড়িভাঙা, নাকফজলি, ন্যাংড়াসহ কয়েকটা জাতের আম চাষ করা হচ্ছে। এঁটেল মাটি হওয়ার কারণে এ এলাকার আম বেশ সুস্বাদু।

আমচাষিরা বলেন, এঁটেল মাটি হওয়ায় এ এলাকার আম বেশ সুস্বাদু। এ এলাকার আমকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বলে বিক্রি করা হয়ে থাকে। যখন আম পাকা শুরু হয়, তখন একসঙ্গে বাজারে উঠতে শুরু করে। আর এ সুযোগে আম ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে আমের দাম কমিয়ে দেয়। এতে করে চাষিরা দাম কম পান, কিন্তু ব্যবসায়ীরা লাভ ঠিকই পান। চাষিরা ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। আম মৌসুমে দামের ব্যাপারে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন আমচাষিরা।

এসব আমের বিশেষ জাতের মধ্যে আম ‘নাকফজলি’। এই নাকফজলি বিশেষ করে পতœীতলা, বদলগাছী, ধামইরহাট ও মহাদেবপুরে চাষ হয়ে থাকে। এই আম প্রথমে ১৪-১৫ বছর আগে বদলগাছীতে চাষ শুরু হলেও বর্তমানে পতœীতলায় বেশি চাষ হয়ে থাকে। অন্য আমের তুলনায় নাকফজলি আম কম পচনশীল, খেতে সুস্বাদু, ও বাজারে ব্যাপক চাহিদা এ আমে ক্ষতিকার ফরমালিন ব্যবহার করার প্রয়োজন না হওয়ায় উৎপাদন থেকে বাজার করতে খরচও কম লাগে। এই আমের বাজার দিন দিন রাজধানী ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তার করেছে।

পতœীতলার নজিপুর মহল্লার ধরনীকান্ত ও শান্ত কুমার বলেন, পতœীতলায় ১০ থেকে ১২ বছর আগে কলম পদ্ধতির মাধ্যমে এই নাকফজলি আম গাছ তৈরি করা হয়। খেতে সুস্বাদু, আঁশ কম, অন্য আমের তুলনায় কম পচনশীল ও বাজারে চাহিদা থাকায় ও মাটির গুণাগুণের কারণে পতœীতলায় আমচাষিরা দিন দিন নাকফজলি আমের চাষ ঝুঁকে পড়েছেন। এরই মধ্যে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই পতœীতলায় ছোট ছোট আমের বাগান গড়ে উঠেছে। এ আম চাষে ঝুঁকি কম ও লাভ বেশি হওয়ায় অনেক সফল আমচাষিদের কাছ থেকে বাগান তৈরির পরামর্শ নিতে আসেন অনেক এলাকার আমচাষি।পতœীতলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা প্রকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, নাকফজলি আমের গুণাগুণের কারণে এ আম চাষে কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এ আম পচনশীল কম হওয়ায় ফরমালিন ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকেও সহযোগিতা করা হয়। এ কারণে এ উপজেলায় প্রায় ৬০০ হেক্টর জমিতে নাগফজলি আম চাষ করা হচ্ছে। আগামীতে এই আম চাষের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।

জেলার সাপাহার উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের তছলিম উদ্দীন বলেন, গত বছরের শেষ দিকে ৭ একর জমির ওপর আম বাগান গড়ে তুলেছেন। এই বাগানে প্রায় আড়াই হাজার আমগাছ রয়েছে। এর অধিকাংশ আম্রপালি জাতের। আগামী দুই বছর এই গাছগুলো থেকে আম সংগ্রহ করা হবে না। পরে বছরগুলো থেকে আমের উৎপাদন বেড়ে যাবে।

সাপাহার পোস্ট অফিস পাড়ার গোলাপ খন্দকার বলেন, প্রতি বছর ২ লাখ টাকা শর্তে ১০ বিঘা জমি ১২ বছরের জন্য ২৪ লাখ টাকা দিয়ে লিজ নিয়েছেন। সেই জমিতে বারি-৪ জাতের আম লাগিয়েছেন। দেড় বছর থেকে দুই বছরের মধ্যে আম সংগ্রহ শুরু হবে। ১২ বছরে এই জমি থেকে ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার আম বিক্রি হবে।সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বলেন, এই উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান গড়ে উঠেছে। এই আম বাগানে শত শত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

পোরশা উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের নুরুজ্জামান বলেন, আগে জেলায় ল্যাংরা, ফজলি, ক্ষিরসাপতি, মোহনভোগ, আশ্বিনা, গোপালভোগ জাতের আম চাষ করত এলাকাবাসী।

তবে বর্তমানে উন্নত জাতের আম্রপালি, বারি-৩, ৪ ও ১১ জাতের আম চাষ করা হচ্ছে। সাধারণ জাতের চেয়ে আ¤্রপালি ও বারি-৪ জাতের আম দ্বিগুণ উৎপাদন ও দাম বেশি পাওয়ায় উন্নত জাতের এ আম চাষে ঝুঁকে পগেছেন। পোরশার আম রাজধানীসহ সারা দেশে রফতানি করা হয়ে থাকে। কোনো ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য ছাড়াই আম বাজারজাত করা হয়ে থাকে।

পোরশা উপজেলা আম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুস সামাদ শাহ্ বলেন, আমের ভালো দাম পেতে হলে সবাই সরকারের বিভিন্ন বিভাগকে এগিয়ে আসতে হবে। চলতি বছরে পোরশায় ৬০-৭৫ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হবে।

পোরশা কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজ আলম বলেন, পোরশায় প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর জমি হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ করা হয়। আর ইরি-বোরো মৌসুমে মাত্র ৫ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা সম্ভব হয়। খরা এই মৌসুমে পানির অভাবে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি পতিত থাকে। এরই মধ্যে উপজেলায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে আম গড়ে উঠেছে।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক রঞ্জিত কুমার মল্লিক বলেন, জেলায় প্রতি বছর শত শত টন আম উৎপাদন হলেও পাইকারি বাজার না থাকায় কমমূল্যে বিক্রি করে দেন আমচাষিরা। গত কয়েক বছর আগে জেলা মাত্র ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হতো। আমচাষিদের কৃষি বিভাগ থেকে সব সময় পরামর্শ দেওয়ায় চলতি বছর জেলায় প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ২ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আম বাগান গড়ে উঠছে। আম সুস্বাদু হওয়ায় গত দুবছর থেকে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। যেভাবে আম বাগান গড়ে উঠছে, তাতে নওগাঁয় আম চাষে বিপ্লব ঘটতে চলছে।

 

"