এখনো তালপাতার পাঠশালা

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৯, ০০:০০

টুঙ্গিপাড়া (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি

কাগজ প্রচলনের আগে লিখন উপকরণগুলোর মধ্যে তালপাতাই ছিল অন্যতম। বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও কলোম্বিয়াসহ দক্ষিণ এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে লিখন উপাদান হিসেবে তালপাতার ব্যবহার ছিল ব্যাপক। বিভিন্ন গ্রন্থাগার ও জাদুঘরে চতুর্থ, ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে রচিত তালপাতার পা-ুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে দশম ও দ্বাদশ শতকে লিখিত তালপাতার প্রচুর পা-ুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। এ থেকে ধারণা করা হয়, পাল ও সেন আমলে লেখনির অন্যতম মাধ্যম ছিল তালপাতা।

কিন্তু কালের বিবর্তনে তালপাতায় লেখনি যেন হারিয়ে গেছে। আধুনিক সময়ে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। সচরাচর তালপাতার ব্যবহার খুব একটা চোখে পরে না। কারণ সবক্ষেত্রেই এখন আধুনিকতার ছোঁয়া। তবে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়ার চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এখানে বেশ কয়েকটি গ্রামে শিশুদের বর্ণমালা শেখানোর জন্য এখনো তালপাতার পাঠশালা চালু রয়েছে। এসব গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, তালপাতায় হাতে খড়ি হলে হাতের লেখা সুন্দর হয়। তাই আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি সেখানে ওই তালপাতায় লেখার ব্যবস্থাও চালু রাখা হয়েছে।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের জামাইবাজার গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার বাজারের পাশে একটি দুর্গা মন্দিরে বস্তা ও মাদুর বিছিয়ে চলছে পাঠদান। প্রায় ৪০-৫০ জন শিশু শিক্ষার্থী বসে মনোযোগ সহকারে তালপাতায় বর্ণমালা লিখছে। শিক্ষকের এঁকে দেওয়া বর্ণের ওপর হাত ঘুরিয়ে বর্ণমালা লেখা শিখছে ছেলেমেয়েরা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডুমুরিয়া গ্রামের মানুষের শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রায় ৫০ বছর আগে একই গ্রামের শিক্ষানুরাগী ধীরেন্দ্রনাথ মালো ওই তালপাতার পাঠশালা গড়ে তোলেন। প্রথম দিকে বিভিন্ন গাছতলা ও বাড়িতে ঘুরে ঘুরে তিনি শিশুদের শিক্ষা দিতেন। এরপর তিনি দুর্গা মন্দিরে পাঠদান করার ব্যবস্থা করেন। তিনি মারা যাওয়ার পর পাঠশালাটির দায়িত্ব নেন মীরা কীর্তনিয়া। কিন্তু মীরা কীর্তনিয়া দুই বছর আগে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভারতে চলে যান। তারপর থেকে একমাত্র শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত থেকে পাঠশালাটি চালাচ্ছেন কাকলি কীর্তনিয়া। বর্তমানে এটাকে দুর্গা মন্দিরের পাঠশালাও বলা হয়।

এখানে ৩ বছর থেকে ৭ বছর পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে। প্রথমে ক, খ, পরে মাত্রাযুক্ত বানান, ফলা শেখার মাধ্যমে তালপাতায় লেখা হয়। এরপর শতকিয়ায় গেলে কাগজে লেখা শুরু হয়। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত তাদের লেখানো হয়। লেখা শেষে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে শিক্ষক কিছুক্ষণ তাদের মৌখিকভাবে পড়া নেন। আরো জানা যায়, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের প্রথমে এই পাঠশালায় পাঠান। সেখানে বর্ণমালার হাতে খড়ি হয় তাদের। বর্ণমালা শেখা হলে শিশুদের পাঠানো হয় পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মূলত শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির উপযোগী করে তৈরি করা হয় এই পাঠশালায়। সরকারি কোনো সাহায্য ছাড়াই স্থানীয়দের সহযোগিতায় চলছে এই পাঠশালা।

শিক্ষকের বেতন দেওয়া হয় ধানের মৌসুমে গ্রাম থেকে ধান তুলে অথবা গরিব শিক্ষার্থীরা মাসে ৫০-১০০ টাকা দিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী। তালপাতার পাঠশালা থেকে হাতে খড়ি হয়েছে এমন অনেকেই এখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছেন। এছাড়া টুঙ্গিপাড়ার ছোট ডুমুরিয়া ও বড় ডুমুরিয়া, ভৈরবনগর গ্রাম এবং কোটালীপাড়ার কাঠিগ্রাম, কানাই নগরসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে শিশুরা শিক্ষা নিতে আসে এখানে।

জামাইবাজার এলাকার কল্পনা বিশ্বাস বলেন, তিনি আগে গোপালগঞ্জ সদরে থাকতেন। কিন্তু তার মেয়ে হিমাদ্রী বিশ্বাসকে এই তালপাতায় শিক্ষা দেয়ার জন্য তিনি এখন গ্রামে থাকেন। মেয়ের এখান থেকে পূর্ণ শিক্ষার পর আবার গোপালগঞ্জ ফিরে যাবেন।

পাঠশালার শিক্ষিকা কাকলি কির্তনীয়া বলেন, তিনি তালপাতায় প্রথমে বর্ণ লিখে দেন। শিক্ষার্থীরা তার ওপর নিজেদের বানানো কালি দিয়ে হাত ঘুরিয়ে বর্ণমালা শিখে ফেলে। এতে করে হাতের লেখা সুন্দর হয়। এ ছাড়া অভিভাবকরা সন্তানদের প্রথমে এই পাঠশালায় পাঠান। এখানে শিশুদের ইংরেজি ও বাংলা বর্ণমালা ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয় এবং তাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হয়। তিনি আরো বলেন, বর্ষাকালে পড়াতে খুব অসুবিধা হয় এবং ছেলেমেয়েদের টিফিনের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বেশি আগ্রহী হবে।

এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি বা কোনো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা যদি এলাকার দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষের কথা বিবেচনা করে একটি স্থায়ী জায়গা বা ঘর করে দেয় এবং শিক্ষকের বেতনের ব্যবস্থা করে তাহলে পাঠশালাটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

 

"