সোনারগাঁয়ের বেদে সম্প্রদায়

ভুতুড়ে অন্ধকারের জীবন শিশুর নেই লেখাপড়া

প্রকাশ : ২৮ মে ২০১৯, ০০:০০

আশরাফুল আলম, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)

ঝড়, তুফান, শীত, গরম উপক্ষো করে সারা বছর নদীর স্রোতে বেসে বেড়ানো জীবন বেদেদের, সমাজ সংসারের মূল ধারা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। নিয়তির ওপর ভর করে বেঁচে থাকাটাই এই আধা-যাযাবর জনগোষ্ঠীর কাছে কপালের লিখন। বেদেরা মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক হলেও বছরের বড় দুটি উৎসবÑ ঈদ আনন্দ নেই বেদে পল্লীর কারো মনে। জীবন-জীবিকায় ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বহ্মপুত্র ও মারীখালির তীরবর্তী লাঙ্গলবন্দ ও পিরোজপুর এলাকায় ২০ বছর ধরে বসবাস করছেন ঈদবঞ্চিত বেদে সম্প্রদায়ের ৩ শতাধিক মানুষ। তাদের নেই শিক্ষার সুযোগ। ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে লেখাপড়া ছাড়াই।

পিরোজপুর এলাকায় বসবাসরত বেদে বহরের সর্দার জিয়াউর রহমান জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে আসছেন তারা। বেদে বহরে ৫০টি পরিবারে প্রায় ৩ শতাধিক মানুষ রয়েছে। বর্তমান সময়ে দুনিয়াজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষের জীবন মানের অনেক উন্নতি হলেও বেদে সম্প্রদায়ের লোকের ওপর এসবের কোনো প্রভাব ফেলেনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন বঞ্চনা আর অবহেলাই বেদে সম্প্রদায়ের মানুষদের নিত্য সঙ্গী। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় ঝাঁড়, ফুক, তাবিজ-কবজে এখন আর তেমন বিশ্বাসী নয় মানুষ। সেজন্য আগের তুলনায় বেদেদের জীবন-জীবিকা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত নাগরিক জীবনে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি, স্বাস্থ্যসেবা, ভোটাধিকার, বিশুদ্ধ খাবার পানি, নেই বিদ্যুৎ সুবিধা, আয় রোজগার কমে যাওয়া সব মিলিয়ে আমাদের জীবন ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। তাছাড়া ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণের জন্য কোনো স্কুলে ভর্তি করতে চাইলে কেউ লেখাপড়া করার সুযোগ করে দেয় না। এখনো পর্যন্ত আমাদের বেদে বহরের ছেলেমেয়েদের কেউ অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন হয়নি। তাছাড়া কেউ মারা গেলে তাকে কবর দেওয়ার জন্য সাড়ে তিন হাত মাটিরও স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। বেদে বহরে বসবাসরত পরিবারের সদস্যদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। বেদে পরিবারের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় তাদের ভোটাধিকার পর্যন্ত ছিল না। সভ্যতার বিকাশে দেশের পাহাড়ি উপজাতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর শান্তির সুবাতাস লাগলেও বেদে পরিবারের সদস্যদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। ভাসমান (নৌকায় বসবাসরত) বেদে বহরের মানুষগুলো মেঘনা, বহ্মপুত্র, মারিখালি নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন। কেউ কেউ নদীর জোয়ারের পানি থেকে, ঝড়-তুফান বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে নদী তীরের পরিত্যক্ত জায়গায় পলিথিন কাগজে তৈরি খুপরি ঘরে অথবা খোলা আকাশের নিচে কোনো রকম এক একটি পরিবারের ৫-৬ জন সদস্য নিয়ে থাকেন। বেদে বহরের সর্দার জিয়াউর রহমান আরো জানান, সারা বছরে কষ্ট করে কোনো রকম বসবাস করলে ও বর্ষার সময়ে তাদের ভোগান্তির শেষ নেই। আগে সংসার পরিচালনায় পরিবারের শুধু নারী সদস্যরা অর্থ উপার্জনের জন্য ঝাঁড়, ফুক, সিঙ্গা লাগানো ও তাবিজ বিক্রিসহ বিভিন্ন রকম কাজ করত। বাজার মূল্য ঊর্ধ্ব গতি হওয়ায় এখন নারী-পুরুষ সবার কাজ করতে হয় সংসার চালানোর জন্য। আবার অনেক বেদে নারী নদীতে মাছ ধরার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করছে নিজ সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। পুরুষ লোক কেউ সাপের ঝুঁড়ি অথবা বানর নিয়ে, কেউবা আবার সাপ ও বেজি নিয়ে বের হয় দূরের গ্রামগুলোতে খেলা দেখিয়ে জীবিকার সন্ধানে। খেলা দেখিয়ে মানুষকে আনন্দ দিয়ে কিছু পয়সা রোজগার করে সন্ধ্যায় তারা নৌকায় ফিরে আসে। পুরুষদের মধ্যে আবার কেউ পাখি শিকার করে অথবা সাপ ধরে বিক্রি করে।

সরেজমিনে বেদে বহর ঘুরে দেখা গেছে, আধুনিক সমাজ ও জীবন যাত্রায় ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা এখানে নেই বললেই চলে। বেদে বহরটি একেবারে ঘোর অন্ধকারে রয়েছে বলে মনে করেন বেদে বাসিন্দারা। শিশুদের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নেই, নিজ সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে আয় রোজগারের দুই পয়সাও সঞ্চয় করার সুযোগ নেই। ভাসমান জীবনে নদীতীরের সংসারে নেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অধিকাংশ সময়ই শিশুরা খোলা জায়গায় খাবার খেয়ে নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত। তবে বেদেরা কষ্টে দিনযাপন করলেও নিজেদের মধ্যে তাদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেন মহাধুমধামের সঙ্গে।

বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেলে বেদে বহরে আনন্দের সীমা থাকে না। এই বেদে বহরে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও জন্ম নিয়ন্ত্রণের সচেতনতা নেই। তাছাড়া নিজেদের মধ্যে কারো কোনো সমস্যা হলে বেদে সর্দার তার সমাধান করে দেন। বেদেদের জীবন যাত্রা এখন আর আগের মতো নয়, অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। আগে সাপের খেলা দেখিয়ে এবং তাবিজ কবজ বিক্রি করে যে টাকা আয় হতো এখন আর ততটা আয় রোজগার হয় না। তাই বাধ্য হয়েই বেদেরা তাদের পেশা পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় দেশের মানুষের জীবন মানের উন্নতি হলেও এখন পর্যন্ত বেদে সম্প্রদায়ের ওপর এসবের কোনো প্রভাব পড়েনি।

 

"