এখনো থামছে না শোক

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

সাগরপথে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় নিহত ও নিখোঁজ বাংলাদেশিদের পরিবারে শোকের মাতম যেন থামছে না। প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টÑ

মাদারীপুর ও শিবচর প্রতিনিধি জানায়, দালালদের খপ্পরে জিম্মি হয়ে সাগরপথে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ট্রলার ডুবির ঘটনায় মাদারীপুরের নিহত জাকির হোসেন (২৮) ও সজীব হোসেনের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। নিহত জাকির হোসেন শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের ৮নং চর গ্রামের সেকান্দার হাওলাদারের ছেলে এবং সজীব হোসেন সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউনিয়নের উত্তর শিরখাড়া গ্রামের আজিজ শিকদারের ছেলে। নিখোঁজ রয়েছে সদর উপজেলার মনির হোসেন মাতুব্বর (২২), নাদিম মাতুব্বর (১৭), সাইফুল ইসলাম (২৪) ও রাজৈর উপজেলার নাঈম সিকদার (১৯) নামের ৪ যুবক। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নূর-নবী খলিফা ও নূর ইসলাম খলিফা নামের দুই দালালের হাত ধরে বিদেশে পাড়ি জমান জাকির। দালালচক্র লিবিয়ায় তাদের আটক রেখে পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন সময় টাকা হাতিয়ে নিত। প্রতি পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা দালালচক্র হাতিয়ে নিয়েছে। এদিকে, জাকির হোসেনকে হারিয়ে দিশাহারা স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের লোকজন। কান্না যেন থামছেই না স্ত্রী শান্তা আক্তারের। অবুঝ দুটি কন্যাসন্তানকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা নেই পরিবারের লোকজনের। নিহত হওয়ার ঘটনা যেন বিশ^াসই করতে পারছেন না জাকিরের বাবা-মা।

এদিকে সজীবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির চারপাশে মানুষের ভিড়। সজীবের মা ও বোন যেন একটু পর পরই সজীবের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে আহাজারি করছেন। সজীবের মা বিশ্বাসই করতে পারছেন না, তার ছেলে আর বেঁচে নেই।

সজীবের সঙ্গে একই নৌকায় ছিল একই ইউনিয়নের আরো দুজন। তারা হলেন সদর উপজেলার বল্লভদী গ্রামের আদেল উদ্দিন মাতুব্বরের ছেলে মনির হোসেন মাতুব্বর (২২) এবং শ্রীনদী এলাকার জোবায়ের মাতুব্বরের ছেলে নাদিম মাতুব্বর (১৭)। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে তারা নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়াও একই ঘটনায় সদর উপজেলার খোয়াজপুর মঠেরবাজার এলাকার মজিবুর রহমানের ছেলে সাইফুল ইসলাম (২৪), রাজৈর উপজেলার আলম দস্তার গ্রামের জাফর সিকদারের ছেলে নাইম সিকদার (১৯) নিখোঁজ রয়েছেন। লাশ দেশে আনার পাশাপাশি নিখোঁজদের ফিরে পেতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন স্বজনরা। এছাড়া দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, আসলে যারা বিদেশে যাচ্ছে তাদের উচিত দালালচক্রের ব্যাপারে সতর্ক থাকা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আইনগত সহায়তা চাইলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে।

সিলেট প্রতিনিধি জানায়, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, নৌকাডুবিতে নিহত ২৭ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনই সিলেটের। যাদের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম।

এদিকে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা এখনো উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। অনেক পরিবারই ধরে নিয়েছেন তাদের সন্তান আর বেঁচে নেই। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন মৌলভীবাজরের বড়লেখা উপজেলার জুয়েল আহমদ (২৩), সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নাজিম উদ্দিন (২৫) ও আজিজুর রহমান রুকুল (২৬)।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (৮ মে) সকালে ইমোর মাধ্যমে একটি ভয়েস মেসেজ আসে নজিমের মা ছবিরুন নেছার মুঠোফোনে। এটিই ছিল নাজিমের শেষ বার্তা। নাজিম উদ্দিন বলছিলেন, ‘আম্মা আমি গেইমও উঠছি, আমার লাগি দোয়া কইরো।’ এরপর সোমবার ইতালি থেকে নাজিমের এক আত্মীয় ফোন করে জানান, সাগরে নৌকাডুবির ঘটনার সময় ওই নৌকায় নাজিমও ছিলেন। নাজিম উদ্দিন সিলেটের মদন মোহন কলেজে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

গত বছর ছাতকের উজিরপুর গ্রামের দালাল শামীম আহমদ নাজিমকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে ৭ লাখ টাকায় চুক্তি হয়।

মৌলভীবাজরের বড়লেখা উপজেলার জুয়েল আহমদের পরিবারও জানেন না তাদের সন্তান কী অদৌ বেঁচে আছে কিনা। জুয়েল বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের ছাতারখাই গ্রামের জামাল উদ্দিন বছরের ছেলে। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির পর থেকে জুয়েলের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৫ মার্চ মাসে এক দালালের মাধ্যমে লিবিয়া পাড়ি দেন জুয়েল। পরে এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয় হয় ইতালিতে বসবাসরত বিশ্বনাথ উপজেলার দালাল পারভেজের সঙ্গে। আড়াই লাখ টাকার চুক্তিতে জুয়েলকে ইতালিতে নেওয়ার কথা বলেন পারভেজ। চুক্তি অনুযায়ী জুয়েলের বাবা জামাল উদ্দিন গত বছরের ডিসেম্বর মাসে বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের দালাল পারভেজের বাবা রফিক উদ্দিনের কাছে নগদ আড়াই লাখ টাকা তুলে দেন। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির পর থেকে জুয়েলের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে আজিজুর রহমান রুকুল নামের মৌলভীবাজারের আরেকজন তরুণ নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি সদর উপজেলার সদর উপজেলার ১২নং গিয়াসনগর ইউনিয়নের কালিয়ারগাঁও গ্রামের মৃত সাদিকুর রহমানের ছেলে। ২০১৭ সালে মে মাসে ঢাকা ট্রাভেলস নামীয় এজেন্সির মাধ্যমে লিবিয়া গমন করেন রুকুল। সর্বশেষ ৮ মে মোবাইল ফোনে সে জানায় ইতালি যাওয়ার পথে এখন রওনা দিচ্ছি। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই। অবৈধ ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানে প্রশাসন : এদিকে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনার পর সিলেটের অবৈধ ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে প্রশাসন। এ লক্ষ্যে ৫টি টিম গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। গত সোম ও মঙ্গলবার নগরীতে অভিযানে নামে এসব টিম। অভিযানে ৩২টি ট্রাভেলস এজেন্সিকে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে প্রায় ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এছাড়া আটজনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদন্ড প্রদান করা হয়।

সূত্র জানায়, নিবন্ধন আছে সিলেটের প্রায় ২০০ প্রতিষ্ঠানের। তবে নিবন্ধন ছাড়াই আরো ৫০০ ট্রাভেল এজেন্সি আছে সিলেটে। এসব ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে মানব পাচার, অবৈধভাবে বিদেশ যেতে প্রলুব্ধ করা, টাকা নিয়ে বিদেশ না পাঠানোসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালে সিলেট নগরে এমন ৭৪টি অবৈধ এজেন্সির তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল আটাব। তবে এখন পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সিলেট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স শাখার কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর বলেন, সিলেট নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডের প্রায় ১৫০টির মতো ট্রাভেলস এজেন্সির লাইসেন্স রয়েছে। অনেকের লাইসেন্স করা আছে কিন্তু নবায়ন করা নেই।

এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বৈদিশক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩ অনুযায়ী প্রতি মাসেই অবৈধ ট্রাভেলস এজেন্সি ও মানব পাচারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়।

 

"