যশোরে তীব্র তাপপ্রবাহে মাছের রেণু চাষে ক্ষতি

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৯, ০০:০০

এইচ আর তুহিন, যশোর

ফণীর প্রভাব কেটে যাবার পর যশোরে এক সপ্তাহ ধরে চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ। এতে শহরতলী চাঁচড়া মৎস্যপল্লীর হ্যাচারিগুলোতে রেণু উৎপাদনে সমস্যা দেখা দেয়। বন্ধ রয়েছে রেণু-পোনা বেচাকেনা। এতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন হ্যাচারি মালিকরা। গরমে চাঁচড়াসহ আশপাশের এলাকার হ্যাচারি মালিকরা বিপাকে পড়েছেন।

দেশের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ রেণু-পোনা যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়। চাঁচড়া মৎস্যপল্লীর ৩৮টি হ্যাচারিতে গত বছর প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার কেজি রেণু উৎপন্ন হয়। চৈত্র থেকে মধ্য আষাঢ় রেণু-পোনা উৎপাদনের ভরা মৌসুম। গত এক সপ্তাহ ধরে এ অঞ্চলের ওপর বয়ে যাচ্ছে তীব্র তাপমাত্রা। এতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে মৎস্য চাষে। রেণু-পোনা ও চারা মাছ উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে।

রেণু-পোনা উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর অতি খড়া, পোনার দাম কমে যাওয়া এবং বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাবার কারণে রেণু উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে লোকসানে পড়বেন পোনা ব্যবসায়ীরা।

যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ও ফাতিমা হ্যাচারির মালিক ফিরোজ খান জানান, যশোরে চলতি বছরের মে এবং এপ্রিল মাসের পুরোটা সময় ধরে বিরাজ করছে অসহ্য তাপপ্রবাহ। এতে তাদের হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেণু-পোনা মারা যাচ্ছে। এছাড়া খাদ্য ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সব হ্যাচারিতে রেণু উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তার হ্যাচারিতে প্রতি সপ্তাহে রেণু-পোনা উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২০০ কেজি।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, রেণু-পোনা উৎপাদনে যশোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জেলায় ৩৮টি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে কার্প জাতীয় রেণু-পোনা উৎপাদন ৬৪ দশমিক ৮৬ টন। জেলায় রেণু-পোনার চাহিদা ১৫ দশমিক ২৩ টন। উদ্ধৃত ৪৯ দশমিক ৬৩ টন দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। তেলাপিয়া পোনা ১০১ দশমিক ৪০ মিলিয়ন উৎপাদন হচ্ছে। জেলায় চাহিদা রয়েছে ৯৮ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন। তেলাপিয়ার উদ্ধৃত ৬ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন। পাঙ্গাস রেণু উৎপাদন ৩ দশমিক ৬২ টন এবং শিং মাগুর, পাবদা, গুলসা রেণু উৎপাদন শূন্য দশমিক ৮৫ টন।

যশোরের হ্যাচারিগুলো রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, বিগহেড, থাইসরপুটি, মিরর কার্প, জাপানি, চিতল, আইড়, তেলাপিয়া, মনোসেক্স তেলাপিয়া, শিং, কৈ, থাই কৈ, পাঙ্গাস প্রভৃতি মাছের পোনা উৎপাদন করে থাকে। হ্যাচারির পাশাপাশি যশোরে ৫ থেকে ৬ হাজার নার্সারি রয়েছে। জেলার ২ লাখ লোক মাছ উৎপাদন, চাষ এবং এ সংশ্লিষ্ট পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

মাছচাষিরা জানান, চলমান গ্রীষ্ম মৌসুমে মাছের সহনীয় তাপমাত্রার চেয়ে যশোরাঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় হাপাগুলোতে প্রতিদিন মাছ মারা যাচ্ছে বেশুমারভাবে। এজন্য মাছ সংগ্রহ অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছেন হাপা মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। যে কারণে রেণু-পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারিগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে ৫০ শতাংশের মতো। সব মিলিয়ে জেলার মৎস্য সেক্টর তথা হ্যাচারি ও হাপা ব্যবসায় সংশ্লিষ্টরা প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনছেন।

জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান গোলদার জানান, গত চার থেকে পাঁচ দিন ধরে যশোরাঞ্চলে তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলছে। ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে। যশোরাঞ্চলে এ তাপপ্রবাহ জনজীবনের পাশাপাশি এ অঞ্চলের জনগুরুত্বপূর্ণ মৎস্য সেক্টরেও প্রতিকূল প্রভাব ফেলেছে।

একই এলাকার মাছচাষি অহিদুল্লাহ লুলু বলেন, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় রেণু-পোনা উৎপাদনে ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না হ্যাচারি মালিকরা। কেননা হাপা মালিকরা রেণ-পোনা কেনা কমিয়ে দিয়েছে গরমের কারণে। হাপায় প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ না থাকায় গরম পানির তাপ নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। ডিম থেকে রেণু উৎপাদনেই গরম প্রভাব ফেলছে। তিনি জানান, দ্রুত বৃষ্টি না হলে হ্যাচারি ব্যবসায় চরম ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, যশোরাঞ্চলের ওপর দিয়ে কয়েক দিন ধরে যে তাপমাত্রা বয়ে যাচ্ছে তা মাছ চাষের জন্য খুবই প্রতিকূল আবহাওয়া। এমন তাপমাত্রায় রেণু উৎপাদন সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, প্রতি বছর এই সময়টা মাছচাষিদের জন্য খুবই খারাপ সময় যায়। এ সময়ে আমরা রেণু উৎপাদনকারীদের সতর্কতার সঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দিই। তিনি বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত হলে বা তাপমাত্রা কমে গেলে রেণু উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

"