আমনুরায় রেলের তেল চুরি সরকারি অর্থের লোপাট!

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রকাশ্যে ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে তেল চুরি হচ্ছে। আমনুরা জংশন ও বাইপাস স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন শত শত লিটার তেল চুরি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একাধিক চক্র তেল চুরি করে এলেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না রেল বিভাগ। এতে প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থের লোপাট হচ্ছে। তবে জিআরপি পুলিশের এক নি¤œ পদের কর্মকর্তা বলেছেন এ রেলস্টেশনে তেল চুরি হয় না। হলে তারা ধরতে পারতেন। জানা গেছে, সরকারের লাখ লাখ টাকার তেল চুরির সঙ্গে ট্রেনের চালক ও নিরাপত্তাকর্মীসহ রেল বিভাগের অনেকেই জড়িত। ট্রেন স্টেশনে প্রবেশের আগেই লাইনের ধারে ফেলে দেয়া হয় তেলভর্তি পলিথিনের বস্তা। প্রতিটি বস্তায় থাকে অন্তত ৩০-৩৫ লিটার তেল। আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা তেল চোর চক্রের সদস্যরা সবার সামনে দিয়েই মোটরচালিত ভ্যান ও ভটভটিতে নিয়ে যায় এসব তেল। প্রকাশ্যে রেলের তেল চুরি হলেও কিছুই বলে না জিআরপি পুলিশ ও ফাঁড়ি পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, রেলের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্তার পকেটে যায় চুরি করা এই তেল বিক্রির টাকা। তেল চোরদের ধরতে কোনো ভূমিকাই নেই রেলের নিরাপত্তা বাহিনী, জিআরপি পুলিশ ও আমনুরা পুলিশ ফাঁড়ির। তাদের ম্যানেজ করেই সংঘবদ্ধ তেল চোর চক্র প্রতিদিনই তেল চুরি করছে। ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে তেল চুরি হচ্ছে এটি স্বীকার করছেন রেল কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা রেল জংশন ও বাইপাস স্টেশনে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র প্রতিদিনই ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে তেল চুরি করছে। ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে চুরি হওয়া তেল বিক্রি হচ্ছে পাশের ঝিলিম বাজারের বেশ কয়েকেটি দোকানে। তেল চুরির ঘটনা এখন ওপেন সিক্রেট। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তেল চুরি করছে স্থানীয় চোররা। এ সংঘবদ্ধ তেল চোর চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছেন সোহেল নামে এক ব্যক্তি। আমনুরার মালেক, বাবু, আজিজুল, হারুন, রবিউল, কামাল, ফারুকসহ ৩০ চোরের তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রেলের তেল চুরি করছেন। এদের মধ্যে মালেক, বাবু ও রবিউল একেকটি গ্রুপের লিডার। সবকয়টি গ্রুপের পালের গোদা সোহেল। তেল চোরের সরদার সোহেল রেলের নিরাপত্তা বাহিনী, জিআরপি পুলিশ, ফাঁড়ির পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার নামে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এসব চাঁদার টাকা সোহেলের মাধ্যমে যাচ্ছে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পকেটে। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছেÑ বেশির ভাগ ট্রেনচালকই এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে চুরি হওয়া তেল ঝিলিম বাজারের সাহিন, মনিরুল ও মোক্তারের দোকানে বিক্রি হয়।

এ অভিযোগের সূত্র ধরে কথা হয় ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে চুরি হওয়া তেল বিক্রেতা সাহিনের সঙ্গে। ঝিলিম বাজারের ওই তেল বিক্রেতা জানান, তিনি প্রায় দেড় মাস আগে ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে চুরি হওয়া তেল বিক্রি করতেন। তবে এখন আর করেন না। তিনি কয়েকজন তেল বিক্রেতার তথ্য দেন। সরেজমিন তদন্তের সময় অভিযুক্ত তেল চোর সিন্ডিকেটের লিডার সোহেল প্রতিবেদকের কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণেরও চেষ্টা করেন।

আমনুরা রেল জংশন সূত্রে জানা গেছে, দুটি কমিউটার ট্রেন এই রুটে চলাচল করে। কমিউটার ৫৭ নম্বর ট্রেন সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে এসে রহনপুর অভিমুখে ছেড়ে যায়, ৫৮নং হয়ে রাজশাহী অভিমুখে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যায়। কমিউটার ৭৭নং ট্রেন বিকেল ৪টা ৪ মিনিটে এসে রহনপুর অভিমুখে ছেড়ে যায়, ৭৮নং হয়ে রাজশাহী অভিমুখে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ছেড়ে যায়। ৫৬৩নং ট্রেন সকাল ৭টা ১৭ মিনিটে এসে ৭টা ২১ মিনিটে রহনপুর অভিমুখে ছেড়ে যায়। ৫৮২নং ট্রেন সকাল ৯টা ৬ মিনিটে এসে ৯টা ১১ মিনিটে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অভিমুখে ছেড়ে যায়। ৫৮১নং ট্রেন বিকেল ৫টা ৩২ মিনিটে এসে ৫টা ৩৫ মিনিটে রহনপুর অভিমুখে ছেড়ে যায়। ৫৬৪নং ট্রেন সন্ধ্যা ৭টা ৫৭ মিনিটে এসে ৮টা ২ মিনিটে ঈশ্বরদী রুটে ছেড়ে যায়। অন্যদিকে সাটল ট্রেন রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাত্রা করে। এটি আমনুরা বাইপাশ স্টেশনে এসে পৌঁছায় ৫টা ৪৫ মিনিটে। রাজশাহী মেইল ৬ নম্বর পাওয়ার কার সকাল সাড়ে ৮টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

জানা গেছে, এসব ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে সংঘবদ্ধ তেল চোর চক্র তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তেল চুরি করে থাকে। প্রায় দুই বছর আগে র‌্যাব-৫ রাজশাহীর একটি অভিযানিক দল কয়েকশত লিটার তেলসহ তেল চোর চক্রের বেশ কয়েকজনকে আটক করে। আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে চক্রটি আবারো জড়িয়ে পড়েছে তেল চুরির কাজে।

আমনুরা রেল জংশনের স্টেশনমাস্টার খাইরুল আলম জানান, ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে তেল চুরির খবর তিনি শুনেছেন। তবে স্টেশন এলাকায় নয়, স্টেশন এলাকার বাইরে। স্টেশন এলাকার বাইরে তেল চুরি হওয়ায় তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না বলেও জানান তিনি।

ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে তেল চুরি হচ্ছে স্বীকার করে আমনুরা বাইপাশ রেলস্টেশন মাস্টার শহিদুল আলম বলেন, এটি নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনের বিষয়। আমি পরিবহন বিভাগে কর্মরত এ স্টেশনে আসা ট্রেন গ্রহণ করব এবং যথাসময়ে ছাড়ব এটিই আমার কাজ। তেল চুরির ঘটনা সরাসরি দেখলেও আমাদের কিছুই করার নেই। নিরাপত্তা বাহিনী, জিআরপি পুলিশ কোনোটিই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নয় বলে জানান তিনি।

আমনুরা রেল জংশনের জিআরপি পুলিশের উপপরিদর্শক শফিক আল রাজী তাদের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা প্ল্যাটফরমভিত্তিক ডিউটি করে থাকি। স্টেশন প্লø্যাটফরমের মধ্যে তেল চুরির ঘটনা ঘটে না। স্টেশনে তেল চুরির ঘটনা ঘটলে অবশ্যই তাদের আটক করা হবে।

আমনুরা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক জাহাঙ্গীর জানান, রেলের বিষয়টি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাদের আলাদা নিরাপত্তা বাহিনী রয়েছে। ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে চুরি হওয়া তেল আমনুরা পুলিশ ফাঁড়ি সংলগ্ন বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে বিষয়টি জানেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রেলের চুরি হওয়া তেল বাজারে বিক্রির খবরটি আমার জানা নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের এক কর্মকর্তা বলেন, রেলের প্রায় সব ধরনের উন্নয়ন ও অর্থ ব্যয়ে তদারকি থাকলেও জ্বালানি তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে তদারকি নেই। তেল চুরির সিন্ডিকেটটি শক্তিশালী হওয়ায় বিভিন্ন সময় তদন্ত কমিটি করেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। ইঞ্জিন ব্যবহারের দক্ষতা ও তদারকি বাড়ানোর মাধ্যমে জ্বালানি তেলের ব্যবহার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা গেলে প্রতি বছর রেলের শতকোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।

"